এই ছবিটি নিয়ে লেখার কোন ইচ্ছেই ছিল না। এরকম ধর্মান্ধ মহিলাদের বিশ্ববিদ্যালয়েও দেখা যায়। পথেঘাটে সব শ্রেণীর মধ্যেই দেখা যায়। আমি ছোটবেলায় এই রকমই পর্দাশীন প্রতিবেশী মহিলার কথা জানতাম যিনি বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন। তার মসজিদের ইমাম স্বামী বারবার ডাক্তার ডাকতে চেয়েছেন কিন্তু মহিলা কোন পুরুষ ডাক্তারের হাতে বেপর্দা হতে চাননি। অত্যন্ত করুণ মৃত্যু হয়েছিল তার। ইসলাম বিশ্বাসের এরকম নির্মম উদাহরণ দেখার দু্ভাগ্য আমার খুব ছোটবেলাতেই হয়েছিল। কাজেই এসব ছবি আজকাল ফেইসবুকে দেখে গা করি না। এই রকম নিনজাঅলি মেয়েরা যখন গ্রুপ ফটো তুলে ফেইসবুকে আপলোড দেয়া সেটাও হাস্যরস হয়ে উঠে। এ যেন বধিরের হেডফোন দিয়ে গান শোনার মত। মুখই যদি দেখা না যায় তাহলে ফটো তোলা কেন! সে যাকগে। তাহলে এই ছবিটি নিয়ে শেষ পর্যন্ত আমি কেন লিখতে বাধ্য হলাম?
এই ছবিটি দিয়ে পোস্ট করেছিলেন তসলিমা নাসরিন। তাঁর পোস্ট কপি করে নাজমা আক্তার নামের একজন রিপোস্ট দিয়েছিলেন। সেখানে কমেন্ট সেকশনে শাকুর মজিদ নামের একজনের কমেন্ট চোখে পড়ল। ভদ্রলোকের নামটি চেনা চেনা মনে হতে পারে। কারণ হুমায়ুন আহমদকে নিয়ে বই লিখেছিলেন, বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এছাড়া আলোচিত্রী স্থপতি হিসেবে পরিচিত। রমজান মাসে টেভিভিশনে ‘মুসলিম স্থাপত্য’ নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। একবার তার পোস্টে কমেন্ট করেছিলাম, ‘মুসলিম স্থাপত্য’ এই রকম পরিচয় সাম্প্রদায়িক কিনা? তা না বলে মুঘল আফগান এভাবে বলা যায় কিনা? হিন্দুত্ববাদ খারাপ জিনিস হলে এই রকম মুসলিমবাদ ভালো কিনা? কি জবাব দিয়েছিল হুবহু আর মনে নেই। তবে ত্যানা প্যাঁচিয়েছিল। যাক অনেকদিন আগের কথা। তো শাকুর মজিদ সাহেবের কমেন্টেটা আগে তুলে দেই। কি লিখেছেন দেখি-
“ছবিটা কোথাকার? আমার মনে হয় এটা কেউ বানিয়েছে উজবুকদের জন্য। কারো পোস্টে কিছু দেখলেই কপি করে শেয়ার দিতে হবে কেন? এই ছবিটা কার, কে তুলেছে, ঘটনা কোন দেশের? এসব জানানোর দ্বায়িত্বও আপনার”
লালসালুর মজিদ আর ইঞ্জিনিয়ার মজিদদের মধ্যে আমি কোনদিনই বেসমেন্টে পার্থক্য পাইনি। এই ছবি যারাই পোস্ট দিয়েছেন সেখানেই মুসলিম নামের আইডিগুলো থেকে দাবী করা হয়েছে এই ছবি দিয়ে মুসলিমদের হেয় করা হচ্ছে। এই ছবি এআই দিয়ে তৈরি। পোশাক যার যার ব্যক্তিগত বিষয়, এভাবে উপস্থাপন করে মানুষের স্বাধীনতাকে হরণ করা হচ্ছে…। মজিদ সাহেবের কেমন্টটাই দেখুন- ছবিটা কার, কে তুলেছে, কোন দেশের এটা প্রমাণ করার দায়িত্ব পোস্টকারীর, এই থ্রেট দিয়ে বসেছেন। অথচ বাংলাদেশের পথে বের হলে এই রকম পোশাকের ছড়াছড়ি। হ্যাঁ, এই রকম হাতমোজা পরে কেউ খায় কিনা সে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। কিন্তু রেগে যাওয়াটা অস্বাভাবিক! মুসলমান হিসেবে গায়ে লাগাটা মানে পর্দা নিয়ে কেউ মজা করলে মেজাজ ঠিক না থাকাটা বেশ কিন্তুকর!
এই রকম পর্দায় বিশ্বাসীরা যেদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাবে সেদিন তারা সাধারণ সেলোয়ার কামিজ পরা মেয়েদের কোন স্কুল কলেজ অফিস কোথাও ঢুকতে দিবে না! তাদের পোশাক নিয়ে, তাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। তখন আর কেউ পোশাকের স্বাধীনতার দোহাই দিবে না। সমাজে এ্ই রকম কঠিন পর্দায় বিশ্বাসীদের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া যে কোন উদার লিবারেল মানুষের জন্যই সমাজ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কথা। কিন্তু যখন সোশাল মিডিয়ায় এরকম ছবি পোস্ট করলে কেউ মেজাজ হারান, তখন তাদের মনের গভীরে সুপ্ত থাকা লাল সালুর মজিদের জেগে উঠা দেখি!
প্যান্ট শার্ট পরা, কবিতা আবৃত্তি করা, নাটক সিনেমা করা, বিজ্ঞাপনচিত্রের নির্মাতা, ছবি আঁকা, ছবি তোলা, আধুনিক, উত্তরাধুনিক, নারীবাদী, সাম্যবাদী… যত বাদীই হোক- মুসলিম হলেই একটা সংশয় থেকেই যায়- মনের গহীনে সবার অজান্তে একটা হুজুর ঘুমিয়ে থাকে! কখনো কখনো হুজুরটি ঝিলিক দিয়েই মিলিয়ে যায়! বিশ্বাস করেন, পোশাকে পেশায় বাস্তবের হুজুরদের চেয়ে এই সুপ্ত হুজুরগুলিই মুসলিম সমাজের জন্য ভাইরাসের মতই ভয়ানক। এদের মত মুসলিম জাতীয়তাবাদীও দ্বিতীয়টি নেই। এই ছবিটি যারাই পোস্ট করেছেন তাদের পোস্টে সেই সুপ্ত হুজুররা কেউ পোশাকের স্বাধীনতাবাদী, কেউ এআই বিশেষজ্ঞ, কেউ ষড়যন্ত্রবাদী কেউ হেয়বাদী সেজে আসলেও হুজুর চিনতে ভুল হয়নি মোটেও!
-সুষুপ্ত পাঠক
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
