কবির য়াহমদ
জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে ঘিরে প্রবাসীদের প্রতিবাদ, দুয়োধ্বনি এবং প্রশ্নবাণ নিয়ে বিতর্ক চলছে। এটিকে চিরাচরিত ‘মব’ বা সহিংস জনতা বলা কঠিন; কারণ সেখানে কোনো শারীরিক আক্রমণ দেখা যায়নি। ছিল কেবল ক্ষোভ, অভিযোগ এবং সরাসরি জবাবদিহি চাওয়ার একটি ব্যাকুল প্রয়াস। ইউনূসের সঙ্গে ছিলেন গ্রামীণের কর্মকর্তা ও তার সরকারের অংশ লামিয়া মোরশেদ নামের একজন নারী। তিনিও আলোচিত, কিন্তু তাকে লক্ষ্য করে কেউ কটূক্তি করেনি।
উত্তেজিত প্রবাসী ইউনূসের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে ধমকের সুরে প্রশ্ন করছিলেন। জবাব চেয়েছিলেন। জবাব দেননি ইউনূস। ভয় পেয়ে গেছেন। ভয়টা তার স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দুরবস্থার জন্য ইউনূস দায়ী নিঃসন্দেহে। হাজারও শিশু মৃত্যু, দেশে বিভাজন সৃষ্টি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ–সম্ভব সকল অপকর্ম করেছেন তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে। এর জবাবদিহি দরকার ছিল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য তিনি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে।
তিনি অশীতিপর। এই বয়সে যে কেউই অন্যের থেকে সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রত্যাশা করে। আমিও চাই সম্মান পাক বয়োবৃদ্ধরা, কিন্তু দুর্ভাগ্য যে দেড় বছরে যে সংস্কৃতি গড়েছেন দেশে এই প্রফেসর, সেটা এখন ‘ব্যাকফায়ার’ করতে শুরু করেছে।
যারা ইউনূসের অপকর্ম ও তার প্রতিষ্ঠিত অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ, আমিও তাদের একজন। এদের মধ্যে অনেকের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে; আমার যায়নি। আমি দেয়ালে লেপটে যেতে চাওয়া মানুষ, তবু প্রত্যাঘাতের পক্ষে থাকি না। সদা সর্বদা সতত শান্তির বাণী উচ্চারণে প্রত্যয়ী। এখানেও তাই প্রত্যাঘাতকে সমর্থন না করে, প্রকৃতির জবাব বলে ধরে নিয়েছি। এসব ব্যাপারে আমি কোনো পক্ষ নই, আমি শুধু চাই জবাবদিহি ও বিচারের।
ইউনূসের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আনিত অভিযোগ একটাও মিথ্যা ছিল না। তিনি আদালতের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী। ক্ষমতায় এসে এই দণ্ড খারিজ করে দিয়েছেন কৌশলে। তার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগ ছিল; আওয়ামী লীগের আমলে রায় ছিল। ক্ষমতায় গিয়ে সেগুলো তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সেই কর ফাঁকির অভিযোগে এক বর্ণও মিথ্যা নেই। তিনি শ্রমিক ঠকিয়ে দণ্ডিত হয়েছিলেন, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই দণ্ড মুছে দিয়েছেন। ইউনূসের আমলে নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকারের আমলে আদালতও বলছে– কর ফাঁকি দিয়েছেন ইউনূস, কর ফাঁকির সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন ইউনূস, অনাদায়ী কর আদায় করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব!
অনেকেই তাকে ত্রাতা ভাবেন, কিন্তু তিনি আসলে সমাজসংস্কৃতির-হন্তা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার স্মারক পদ্মা সেতুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী দেশের স্বার্থবিরোধী ‘সত্তা’ তিনি। এখানে তাকে ‘ব্যক্তি’ না বলে ‘সত্তা’ বলছি, কারণ এই কাজে তার অনুসারী ছিল অনেক। স্রেফ রাজনৈতিক কারণে তার সকল ষড়যন্ত্রকে জায়েজ করতে চেয়েছে অনেকেই। তিনি দেশকে তুলে দিয়েছেন বিদেশিদের হাতে। ফলে ক্ষমতায় এলেও বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত-পা বান্ধা। চাইলেও তিনি অগ্রাহ্য করতে পারছেন না আমেরিকার প্রভাবকে। ফলে কৃষকের জন্য আর সার, দেশবাসীর জন্য বিদ্যুৎ-গ্যাস দিতে না পারলেও হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে লোকসানি প্রতিষ্ঠান বিমানের জন্য উড়োজাহাজ কিনতে হচ্ছে সরকারকে। আমেরিকা থেকে উড়োজাহাজ কিনেছ তাহলে আমাদের ইউরোপ থেকেও কিনতে হবে—এমন চাপে নত হতে হচ্ছে সরকারকে।
বাংলাদেশের জন্মপ্রক্রিয়ায় তিনি বিরোধী না থাকলেও, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাতন্ত্র্য এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধ্বংসে উন্মত্ত এক সত্তা ছিলেন তিনি। হিউমেনেটোরিয়ান গ্রাউন্ডে অথবা বয়স বিবেচনায় তাকে অসম্মান সমর্থন করতে পারি না, তবু বলছি দেশে-দেশে অপমান তার কর্মফল।
আর কতদিন বাঁচবেন উনি– স্বাভাবিকভাবেই এটা জানে না কেউ। কিন্তু তিনি যা করেছেন তাতে মৃত্যু-পর্যন্ত গণমানুষের তাড়া খেয়ে বাঁচতে হবে তাকে।
‘এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন…’ এই লাইন শুনে আসছি আমরা ছোটবেলা থেকে। এটা প্রবাদবাক্য। এই বাক্য শোনা সত্ত্বেও অনেকেই হাঁটে উল্টাপথে। তিনিও তেমন। আশির্ধো জীবনের প্রাপ্তি তার একবাক্যে বর্ণনা করা যায় এভাবে– ‘এমন জীবন তুমি করিলে গঠন, বাঁচিলে-মরিলেও চলিবে শুধু রোদন আর পীড়ন।’
