আবু মকসুদ
গরু বড় নিরীহ প্রাণী। সে জানে না মানচিত্রের সীমানা, বোঝে না রাষ্ট্রের সংবিধান, সংসদের বিতর্ক কিংবা নির্বাচনের ইশতেহার। সে জানে ঘাসের গন্ধ, জাবর কাটার ক্লান্তিহীন অভ্যাস, খড়ের গাদায় মুখ ডুবিয়ে দেওয়ার আনন্দ। পৃথিবীর এত রাজনীতি, এত ধর্ম, এত মতাদর্শের ভিড়ে গরুর নিজের কোনো বক্তব্য নেই। অথচ মানুষ তাকে দিয়ে কত কথা বলিয়ে নেয়! যে কথা মানুষ মুখে বলতে সাহস পায় না, যে ঘৃণা নিজের নামে চালাতে লজ্জা পায়, যে আধিপত্যকে ন্যায়বিচারের পোশাক পরাতে চায়, তার সবটুকু গরুর কাঁধে চাপিয়ে দেয়। তারপর গরুকে সামনে রেখে নিজে দাঁড়ায় ধর্মের মঞ্চে, জাতীয়তাবাদের ব্যালকনিতে, সংখ্যাগরিষ্ঠের উঁচু বারান্দায়। গরু তখন আর গরু থাকে না, হয়ে ওঠে পতাকা। পতাকারও ওপরে উঠে যায় তার গুরুত্ব। কারণ পতাকা অন্তত মানুষের হাতে ওড়ে, আর গরু মানুষের বিবেকের ভেতরেও ঢুকে পড়ে।
কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পূজার সময় গরু জবাইয়ের দাবি উঠেছে, এমন খবর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভেতর থেকে মানুষ সরে যেতে থাকে, বেরিয়ে আসে তার ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক আনুগত্য, বংশপরিচয়ের অহংকার। কেউ বলে, এটা আমার খাদ্যস্বাধীনতা। কেউ বলে, এটা আমার ধর্মীয় অনুভূতির ওপর আঘাত। কেউ বলে, সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার। কেউ আবার সংখ্যালঘুর চোখের জল মাপতে বসে, যেন কান্নারও জনসংখ্যা আছে, যেন সংখ্যায় কম হলে মানুষের দুঃখের ওজনও কমে যায়। অথচ যে চোখে জল আসে, তার কোনো ধর্মীয় পরিচয় থাকে না। অশ্রু হিন্দু হয় না, মুসলমান হয় না, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিষ্টান হয় না। অশ্রু কেবল চোখ থেকে পড়ে, আর মাটিতে পড়ার পর সব অশ্রুরই রং এক।
তবু মানুষ মাটির এই সহজ সত্যটুকু মানতে চায় না।
আমরা এমন এক সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যখন গরুর মাংসের এক টুকরো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত তরুণেরাও নিজেদের সমস্ত শিক্ষা ভুলে যেতে পারে। যে তরুণের হাতে থাকার কথা বই, যে তরুণের চোখে থাকার কথা নতুন পৃথিবীর নকশা, যে তরুণ প্রশ্ন করবে রাষ্ট্র কেন দরিদ্র, বিচার কেন বিলম্বিত, শ্রমিক কেন বঞ্চিত, কৃষক কেন ঋণে ডুবে থাকে, সেই তরুণ কখনো কখনো গরুর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সমস্ত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বিসর্জন দেয়। তার মনে থাকে না, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো গোয়ালঘর নয়, আবার কোনো ধর্মের ব্যক্তিগত উঠানও নয়। বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক মুক্ত পরিসর, যেখানে মানুষ নিজের বিশ্বাস নিয়ে আসবে, অন্যের বিশ্বাসের মুখোমুখি হবে, তর্ক করবে, প্রশ্ন করবে, প্রয়োজনে প্রতিবাদ করবে, কিন্তু কাউকে তার বিশ্বাসের কারণে মানুষ হিসেবে ছোট করবে না।
এই সহজ কথাটি বোঝার জন্য এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, এতগুলো বই, এতগুলো দর্শন, এতগুলো বিপ্লবের কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল?
গরু যখন রাজনীতি হয়ে ওঠে, তখন রাজনীতি তার আসল কাজ ভুলে যায়। হাসপাতালের শয্যা কম থাকলেও তার মাথাব্যথা হয় না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞানের বদলে দলীয় আনুগত্য বিক্রি হলেও তার ঘুম ভাঙে না, বাজারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে গেলেও তার বুক কাঁপে না। কিন্তু গরু জবাই হবে কি হবে না, গরুর মাংস কোথায় রান্না হবে, কার সামনে হবে, কোন দিনে হবে, এই প্রশ্নগুলো তাকে রাতারাতি বিপ্লবী বানিয়ে দেয়। সে ভুলে যায়, স্বাধীনতা কেবল নিজের পছন্দের দরজা খুলে দেওয়ার নাম নয়, অন্যের ভয়হীনভাবে বেঁচে থাকার দরজাটিও খোলা রাখার নাম।
সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া একটি জনতাত্ত্বিক সত্য, নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের সনদ নয়। সংখ্যায় বেশি হলেই কেউ বেশি দেশপ্রেমিক হয় না, বেশি ধর্মপ্রাণ হয় না, বেশি ন্যায়পরায়ণও হয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সংখ্যালঘুর নিরাপত্তায়। সংখ্যালঘুরা কতটা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে, কতটা নির্ভয়ে উপাসনালয়ে যেতে পারে, কতটা স্বাভাবিকভাবে নিজেদের উৎসব উদ্যাপন করতে পারে, কতটা নির্ভয়ে নিজের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করতে পারে, তার মধ্যেই রাষ্ট্রের সভ্যতার পরিচয় লুকিয়ে থাকে। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ অনেক, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাই বেশি।
এ কথা বললে কেউ কেউ সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যস্বাধীনতার কথা তুলবেন। তুলুন। খাদ্যস্বাধীনতা মানুষের অধিকার। গরুর মাংস খাওয়া কোনো অপরাধ নয়, কোনো ধর্মের অনুসারী না হওয়াও অপরাধ নয়। কিন্তু অধিকার আর আধিপত্য এক জিনিস নয়। আমি যা করতে পারি, তা-ই যে যেকোনো জায়গায়, যেকোনো সময়, যেকোনো ভঙ্গিতে করে দেখাতে হবে, এমন কোনো কথা স্বাধীনতার সংজ্ঞায় লেখা নেই। একটি বাড়িতে শোক চললে পাশের বাড়ির মানুষ গান শুনতে পারেন, কিন্তু শোকাহত মানুষকে অপমান করার জন্য জানালার কাছে দাঁড়িয়ে গান বাজানো আর নিজের বাড়িতে গান শোনা এক ব্যাপার নয়। কাজের বাহ্যিক রূপ কখনো কখনো এক হলেও তার সামাজিক অর্থ এক থাকে না। স্থান, কাল, উদ্দেশ্য এবং অন্য মানুষের ওপর তার প্রভাব, সবকিছু মিলিয়েই আচরণের নৈতিকতা তৈরি হয়।
পূজার সময় পূজামণ্ডপের পাশে গরু জবাইয়ের দাবি যদি সত্যিই তোলা হয়ে থাকে, তবে তার উদ্দেশ্য কী ছিল, সেটিও জানতে হবে। খাদ্যস্বাধীনতার দাবি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ, নাকি অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার সচেতন চেষ্টা? উদ্দেশ্য না জেনে কাউকে অপরাধী বানানো অন্যায়। কিন্তু উদ্দেশ্য যদি হয় অন্যকে আহত করা, তবে স্বাধীনতার নাম দিয়ে সেই আঘাতকে মহিমান্বিত করারও কোনো কারণ নেই। একইভাবে, পূজার অজুহাতে কারও বৈধ খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্বিচারে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের কাজ মানুষের বিবেকের ওপর পাহারা বসানো নয়; তার কাজ এমন নিয়ম তৈরি করা, যাতে কারও অধিকার অন্যের নিরাপত্তা ও মর্যাদা ধ্বংস না করে।
অথচ আমাদের রাজনীতি এই ভারসাম্য শেখায় না। সে শেখায়, তোমার পরিচয় আগে, মানুষ হওয়া পরে। সে শেখায়, তোমার ধর্মের অপমান মানে তোমার অস্তিত্বের অপমান, কিন্তু অন্যের ধর্মের অপমান নিয়ে তোমার ভাবনার দরকার নেই। সে শেখায়, নিজের ক্ষতকে পাহাড় বানাও, অন্যের ক্ষতকে ধুলো বলো। নিজের ইতিহাসের বেদনা বুকের মধ্যে আগুনের মতো জ্বালিয়ে রাখো, অন্যের ইতিহাসের বেদনা শুনলে বলো, পুরোনো কথা ভুলে যাও। এভাবেই মানুষ নিজের স্মৃতির জন্য স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে, অন্যের স্মৃতির ওপর নির্মাণ করে বাজার।
গরু তখন সেই বাজারের সবচেয়ে সস্তা অথচ সবচেয়ে লাভজনক পণ্য। তাকে ঘিরে উত্তেজনা বিক্রি হয়, রাজনৈতিক আনুগত্য বিক্রি হয়, ধর্মীয় আবেগ বিক্রি হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাতারাতি বীর হয়ে ওঠার সুযোগ বিক্রি হয়। গরুর নিজের কোনো লাভ হয় না। যে মানুষ তার নামে চিৎকার করে, সে হয়তো পরদিন নতুন কোনো স্লোগান খুঁজে নেয়। যে মানুষ তার মাংস নিয়ে বিতর্ক করে, সে হয়তো সন্ধ্যায় নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়। কিন্তু যে সংখ্যালঘু পরিবারটি প্রতিটি উৎসবের আগে ভাবে, এবার কোনো অপমানের মুখোমুখি হতে হবে কি না, তাদের উদ্বেগ এত সহজে শেষ হয় না। তাদের কাছে ধর্মীয় স্বাধীনতা কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, প্রতিদিনের জীবনযাপনের প্রশ্ন। তাদের কাছে উৎসবের আনন্দের পাশে কখনো কখনো দাঁড়িয়ে থাকে অদৃশ্য এক প্রহরী, যার হাতে অস্ত্র নেই, আছে সংখ্যার অহংকার।
এই প্রহরীকে সব সময় ইউনিফর্ম পরে আসতে হয় না। সে আসে কৌতুকের ভেতর, অবজ্ঞার ভেতর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যে, বন্ধুর মুখে বলা একটি বাক্যে। সে বোঝায়, তুমি এখানে আছ ঠিকই, কিন্তু তোমার উপস্থিতি আমাদের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল। তুমি উৎসব করবে, তবে কতটা আনন্দিত হওয়া যায়, তার সীমা আমরা ঠিক করব। তুমি নিজের ধর্ম পালন করবে, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভূতিতে যেন কোনো আঁচ না লাগে। তুমি নাগরিক, কিন্তু তোমার নাগরিকত্বের সঙ্গে একটি অদৃশ্য শর্ত জুড়ে দেওয়া আছে। আর সেই শর্তটি হলো, তোমাকে সব সময় প্রমাণ করতে হবে যে তুমি বিপজ্জনক নও।
কী অদ্ভুত এই দেশ! যেখানে জন্মানোর জন্য কারও অনুমতি লাগে না, সেখানে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার জন্য কাউকে কাউকে প্রতিদিন অনুমতি চাইতে হয়।
কিন্তু সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা কেবল সংখ্যালঘুর সমস্যা নয়। আজ যে মানুষ অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিকে উপহাস করে নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি পরীক্ষা করছে, কাল তার নিজের বিশ্বাস, ভাষা কিংবা মতাদর্শও অন্য কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠের সামনে অসহায় হয়ে পড়তে পারে। আধিপত্যের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। আজ যে দরজা তোমার জন্য খোলা, কাল সেই দরজার সামনে অন্য কেউ দাঁড়িয়ে বলতে পারে, তোমার প্রবেশাধিকার নেই। যে সমাজ নিজের সুবিধার জন্য ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা বদলায়, একদিন সেই বদলে দেওয়া সংজ্ঞাই তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়।
তাই গরুর সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের মুখ একবার দেখা দরকার। আমরা আসলে কী রক্ষা করছি? খাদ্যস্বাধীনতা, না অন্যকে অপমান করার স্বাধীনতা? ধর্মীয় অনুভূতি, না নিজের ধর্মকে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার বাসনা? প্রতিবাদ, না প্রতিবাদের নামে একটুখানি ক্ষমতার স্বাদ? আমরা কি সত্যিই গরুর জন্য লড়ছি, নাকি গরুকে সামনে রেখে নিজেদের ভেতরের ক্ষুদ্রতাকে আড়াল করছি?
যে মানুষ গরুর মাংসের অধিকারের কথা বলে, তাকে মানুষের মর্যাদার অধিকারও বুঝতে হবে। যে মানুষ ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষার কথা বলে, তাকে অন্যের ধর্মীয় স্বাধীনতাও মানতে হবে। যে মানুষ সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা চায়, তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠের বৈধ অধিকার অস্বীকার করতে হবে না। আর যে মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার চায়, তাকে বুঝতে হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার অর্থ এই নয় যে পৃথিবীটা তার একার জন্য তৈরি হয়েছে।
একটি সভ্য সমাজে গরু ঘাস খাবে, মানুষ তার খাদ্য বেছে নেবে, কেউ পূজা করবে, কেউ নামাজ পড়বে, কেউ গির্জায় যাবে, কেউ কোনো উপাসনালয়েই যাবে না। কেউ ঈদের সকালে নতুন পোশাক পরে আনন্দ করবে, কেউ দুর্গাপূজার সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালাবে। এই সমস্ত ভিন্নতা নিয়ে পাশাপাশি বেঁচে থাকার নামই সমাজ। সবাইকে এক রকম করে ফেলার নাম ঐক্য নয়, আর ভিন্নতাকে ভয় দেখিয়ে নিশ্চুপ করে রাখার নাম শান্তি নয়।
আমি এমন এক বাংলাদেশের কথা ভাবি, যেখানে পূজার মণ্ডপের পাশে গরুর মাংস রান্না হচ্ছে কি না, সেটিই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হবে না। যেখানে মুসলমান তরুণের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বিচার করা হবে তার প্রশ্ন করার ক্ষমতা দিয়ে, হিন্দু তরুণের দেশপ্রেম বিচার করা হবে না তার ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে, আর কোনো নাগরিককে নিজের জন্মপরিচয়ের জন্য বারবার কৈফিয়ত দিতে হবে না। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে দাঁড়িয়ে তরুণেরা গরুর মাংসের চেয়েও জরুরি প্রশ্ন তুলবে। কেন একজন কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পান না, কেন একজন শ্রমিকের ঘাম তার সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে পারে না, কেন একজন নারীকে নিজের নিরাপত্তার জন্য এত হিসাব করতে হয়, কেন সত্য বলার জন্য একজন মানুষকে এত ভয় পেতে হয়, কেন স্বাধীনতার এত বছর পরেও মানুষের মর্যাদা তার পরিচয়ের কাছে জিম্মি থাকে।
সেদিন হয়তো গরু আবার গরু হয়ে উঠবে। তার পিঠ থেকে নেমে আসবে রাজনীতির ভার, তার শিং থেকে খুলে নেওয়া হবে বিদ্বেষের পতাকা। সে মাঠে ঘাস খাবে, মানুষ তার নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। ধর্ম থাকবে, খাদ্যাভ্যাস থাকবে, মতভেদ থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে। থাকবে না শুধু অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় প্রমাণ করার এই নিরন্তর প্রতিযোগিতা।
মানুষের চিন্তা গরুর ওপরে উঠতে পারে না, কথাটা আসলে গরুকে ছোট করা নয়। গরু তো তার স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। সে মানুষ হতে চায়নি, রাজনীতিবিদ হতে চায়নি, কোনো ধর্মের প্রতিনিধি হতে চায়নি। তাকে এসব বানিয়েছে মানুষই। তাই ব্যর্থতাটা গরুর নয়, মানুষের। মানুষ নিজের সমস্ত জ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান নিয়ে এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একটি প্রাণীর নাম উচ্চারণ করলেই তার ভেতরের সভ্যতা আর অসভ্যতার সীমারেখা প্রকাশ পেয়ে যায়।
গরু ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকে। মানুষ বেঁচে থাকে খাদ্যে, বিশ্বাসে, ভালোবাসায়, মর্যাদায়। কিন্তু মানুষ যখন অন্য মানুষের মর্যাদা কেড়ে নিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়, তখন তার সমস্ত শিক্ষার ওপর ঘাস গজিয়ে ওঠে।
আর রাজনীতি সেই ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেয়।
গরু নির্বিকার চোখে জাবর কাটে।
মানুষ তখনও মানুষ হতে শেখেনি।
