প্রবাসী নজরুল আর স্মৃতির কফিন দেশের পথে। চুমু খাওয়ার অভিযোগে, কথিত জিনার দায়ে, সৌদি আদালত তাঁদের মাথা কেটে ফেলার রায় দিয়েছে। এই খবরে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রতিক্রিয়া কী ছিল জানেন? শোক নয়, ক্ষোভ নয়, এমনকি একটা কূটনৈতিক চিঠিও নয়। প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল লাশের চরিত্র বিচার।
ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্য টকশোতে বসে বলে দিলেন, তিনি মানবতা দেখবেন না। সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ‘পাপের লাশ’ বাংলাদেশে আসুক, এটা তিনি চান না। একবার ভেবে দেখুন। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের নাম দিল ‘পাপের লাশ’, সেই রাষ্ট্রের সংসদে বসে আছেন তিনি, জনগণের কাঁধে ভর করে, জনগণের টাকায়। আর লাশ আসবে কি আসবে না, এটা কারও চাওয়া-না-চাওয়ার বিষয়ও নয়। মৃত মানুষের পরিবার আছে, কবর পাওয়ার অধিকার আছে। একজন আইনপ্রণেতা এই সাধারণ কথাটা না জানলে আইন বানাবেন কীভাবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য আরও চমৎকার। তাঁর মতে এটা নাকি ‘শিক্ষা’ হইছে। শিক্ষা কথাটার একটা মানে আছে। শিক্ষা দেওয়া হয় জীবিতকে, যাতে সে ভুল না করে। এখানে যে মানুষ দুটি শিক্ষা পেলেন, তাঁরা আর কোনোদিন কিছু শিখবেন না। তাহলে শিক্ষাটা কার জন্য? বিদেশে যাওয়া বাকি শ্রমিকদের জন্য, যাতে তাঁরা চুমু খেলে ভয় পান? একজন মন্ত্রী যখন একটা শিরশ্ছেদকে ‘শিক্ষা’ বলেন, তিনি আসলে ওই শাস্তিটাকেই সমর্থন করেন। রাষ্ট্র যাঁর পক্ষে থাকার কথা, তিনিই তখন অন্য রাষ্ট্রের জল্লাদের পক্ষে সাফাই গাইছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, কষ্ট করে টাকা খরচ করে যাঁরা বিদেশে চাকরি নেন, তাঁদের সবসময় মনে রাখা উচিত সেসব দেশের আইনকানুন মেনে চলতে হবে। কথাটা শুনতে নিরীহ মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলেই দেখা যায়, এটা আসলে সরকারের নিজের গালেই নিজের বসানো জুতোর বারি। শ্রমিকরা যদি সৌদি আইন না জেনে যান, সেটা কার দায়? বিদেশে পাঠানোর আগে প্রশিক্ষণ, প্রি-ডিপারচার ব্রিফিং, গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, এসব রাষ্ট্রের কাজ। শ্রমিক টাকা খরচ করে যান, রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই যান। এখন সেই শ্রমিক মরলে তাঁকেই বলা হচ্ছে সাবধান থাকতে। যেন ট্রেন দুর্ঘটনায় যাত্রী মারা গেলে রেলমন্ত্রী বলছেন, লাইনের ওপর বসাই ভুল ছিল।
আর আইন মানার যুক্তিটাই যদি শেষ কথা হয়, তাহলে ২০১০ সালে আরব আমিরাতে ছয় বাংলাদেশি শ্রমিকের কী হওয়া উচিত ছিল? তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল এক পাকিস্তানিকে খুনের। সেখানকার আদালত মৃত্যুদণ্ডই দিয়েছিল। আইন তো মানা হয়েছিল, রায় তো হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সেই ‘আইন’ মেনে নেয়নি। রক্তপণ হিসেবে চার লাখ দিরহাম, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮৪ লাখ, সরকারি উদ্যোগে মিটিয়ে ছয়জনকে ফিরিয়ে এনেছিল। খুনের অভিযোগেও যে রাষ্ট্র নাগরিকের পাশে দাঁড়িয়েছিল, একটা চুমুর অভিযোগে আজ তার উত্তরসূরি লাশের চরিত্র নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। আজকের মন্ত্রীদের যুক্তি মানলে তখনকার ওই ছয়জনকেও ‘শিক্ষা’ নিতে ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।
প্রশ্ন আরও আছে, আর সেগুলোর কোনোটার উত্তর সরকার দেয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষ কি এই মামলা, এই রায়, এই দণ্ড কার্যকর করার আগে বাংলাদেশকে কিছু জানিয়েছিল? না জানিয়ে থাকলে ঢাকা সেটা নিয়ে কোনো আপত্তি তুলেছে? সৌদি রাষ্ট্রদূতকে কি একবারও তলব করা হয়েছে? বিচারের সময় নজরুল আর স্মৃতির পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন কি? দোভাষী ছিলেন কি? দূতাবাস কি কোনো পর্যায়ে কনস্যুলার সহায়তা দিয়েছিল? নিজের নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁর সঙ্গে দেখা করার অধিকার আর তাঁর দেশকে জানানোর বাধ্যবাধকতা আন্তর্জাতিক কনস্যুলার নিয়মেই আছে। এই প্রশ্নগুলোর একটারও জবাব ছাড়াই মন্ত্রী-এমপিরা মত দিয়ে দিচ্ছেন, দোষ ছিল ভিকটিমেরই। দূতাবাসের ব্যর্থতা স্বীকার করা তো অনেক দূরের কথা, ব্যর্থতার প্রসঙ্গটাই উঠতে দেওয়া হচ্ছে না।
এবার মজার জায়গাটায় আসি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটা কাদের? ‘মেরুদণ্ড সোজা করার’ কথা কারা বলেছিল? চোখে চোখ রেখে কূটনীতি, নতজানু পররাষ্ট্রনীতির দিন শেষ, এই বুলিগুলো কানের পর্দা ফাটিয়ে শোনানো হয়েছে এতদিন। অথচ সীমান্তে একটা গরু চোর গুলি খেলে যেসব মহল দেশপ্রেমে ফেটে পড়ে, সৌদির বেলায় তাদের কণ্ঠ নেই। মেরুদণ্ড সোজা করার ওই আওয়াজ কি শুধু ভারতের জন্য বরাদ্দ ছিল? ভারতের সামনে বুক ফোলানো যায়, কারণ সেটা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। সৌদির সামনে চুপ থাকাই নিরাপদ, কারণ ওখানে কর্মসংস্থান আছে, রেমিট্যান্স আছে, আর আছে সেই ভয়, কিছু বললে যদি সম্পর্ক নষ্ট হয়। তাহলে বলুন, এই মেরুদণ্ডের শক্তিটা কাদের সামনে কতটা কাজ করে, সেটা কি নীতি, নাকি সুবিধা?
যাঁরা প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলে ডাকেন, মঞ্চে গিয়ে তাঁদের অবদানের কথা বলতে বলতে গলা ভিজিয়ে ফেলেন, তাঁদের জন্য একটা সহজ হিসাব রেখে যাই। যতক্ষণ একজন শ্রমিক ডলার পাঠান, তিনি ‘যোদ্ধা’। যে মুহূর্তে তিনি বিপদে পড়েন, তিনি হয়ে যান ‘আইন না মানা লোক’। আর মরে গেলে তিনি ‘পাপের লাশ’। নাগরিকের এই তিন রকম পরিচয় রাষ্ট্র নিজেই বানিয়ে রেখেছে, দরকার মতো যেটা সুবিধা সেটা ব্যবহার করবে বলে।
নজরুল আর স্মৃতির শেষ কয়েক মিনিটের যে ভিডিও ছড়িয়েছে, তার একটা অংশ সবাই শুনেছে। মেয়েটি বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিল। সেই আকুতি কোনো দূতাবাসের ফাইলে পৌঁছায়নি, কোনো মন্ত্রীর কানে ঢোকেনি। ঢুকলে মন্ত্রী বলতেন না, এটা শিক্ষা। এমপি বলতেন না, লাশ চাই না।
এই সরকার ঠিক কার? নজরুলের, স্মৃতির, তাঁদের পরিবারের, নাকি সেই সব মন্ত্রী-এমপির, যাঁরা কফিন দেখে নাক সিঁটকান?( আওয়ামীলীগ পেইজ)
