গ্রীষ্মের পোশাকে ২০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় চলছে। পাশাপাশি, দোকানে উঠেছে শীতের নতুন পোশাক। কিন্তু দুর্গাপূজা আর ঋতু বদলের সময়েও বিক্রি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতানের পোশাক ব্যবসায়ীরা।
নিউমার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, এলিফ্যান্ট রোড, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, নূরজাহান মার্কেট ও গ্লোব শপিং সেন্টার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে বিক্রির এই পরিস্থিতি জানা গেছে।
এক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, তার দোকানে এখন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে একটা চিত্র পরিস্কার, গত দুই বছরের পরিক্রমায় সাধারণ মানুষ চরম অর্থ সংকটের মধ্যে পড়েছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অর্থনৈতিক মন্দার পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক কারখানা-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হওয়া- সব মিলে পরিস্থিতি অনুকূলে নয়। মানুষ চিন্তিত পেটে ভাত যোগানো নিয়ে। জামা-কাপড় কেনার কথা ভাবার ফুরসৎ নেই বেশিরভাগ মানুষেরই।
মেনস ওয়ার্ল্ডে গ্রীষ্মের পোশাকে দেওয়া হচ্ছে সরাসরি ২০ শতাংশ ছাড়। ফ্যাশন হাউস অঞ্জন’স ও লাইভ শপিংয়ে ছাড়ের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ। তবে মেনস ওয়ার্ল্ড ও অঞ্জন’সের বিক্রয়কর্মীদের দাবি, ছাড় দিয়েও বিক্রি প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ানো যায়নি।
মেনস ওয়ার্ল্ডের বিক্রয়কর্মী মারুফ হাসান জানান, ছাড় চললেও ক্রেতাদের কাছ থেকে তেমন সাড়া মিলছে না।
তিনি বলেন, “ছাড় দেওয়ার পরও বিক্রি প্রত্যাশার চেয়ে কম। গত কয়েক দিন ধরে পূজা উপলক্ষে মানুষ কেনাকাটা করছেন, কিন্তু ক্রেতাদের সাড়া প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। এখন আমাদের স্বাভাবিক সময়ের মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ বিক্রি হচ্ছে।”
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন অঞ্জন’সের বিক্রয়কর্মী ইমরান হোসেন।
তিনি বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছি। পণ্যভেদে ছাড়ের হার ভিন্ন। তবে এই ছাড়ের কারণে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, এমনটা বলা যাচ্ছে না। এ বছর পূজার সময় ব্যবসা আশানুরূপ হয়নি।”
বসুন্ধরা সিটিতে কেনাকাটা করতে আসা ব্যাংকার হাবিবুর রহমানের মতে, বিজ্ঞাপনে যেসব ছাড়ের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো তার প্রত্যাশা পূরণ করছে না।
তিনি বলেন, “বড় ধরনের মূল্যছাড়ের কথা শুনে এসেছি। শুনেছিলাম, ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমার পছন্দের পোশাকগুলোতে, বিশেষ করে চলতি ফ্যাশনের পোশাকে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ছাড় রয়েছে। আবার যেসব পোশাকে বেশি ছাড় দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর অনেকগুলোতেই আমার সাইজ নেই। অন্যগুলো পুরোনো ডিজাইনের। তাই শুধু ছাড়ের কথা শুনে কেনাকাটা করতে এসে খুব একটা লাভ হচ্ছে না।”
ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ীরাও বলছেন, এবারের দুর্গাপূজায় তাদের বিক্রি প্রত্যাশার ধারেকাছেও যায়নি। অথচ প্রতি বছর পূজার সময় এই বাজারে কেনাকাটার চাপ থাকে, আর সেটি ব্যস্ত মৌসুমগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
ধানমন্ডি হকার্স মার্কেটে শাড়ি ও থ্রিপিস বিক্রি করেন আরিফ। তার হিসাবে, গত বছরের তুলনায় এবারের পূজায় বিক্রি নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে।
তিনি বলেন, “পূজা আমাদের ব্যবসার অন্যতম ব্যস্ত সময়। আগের বছরগুলোতে এত ক্রেতা থাকত যে দম ফেলারও সময় পেতাম না। এমনও দিন গেছে, যখন ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার পোশাক বিক্রি করেছি। কিন্তু এবার বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ক্রেতারা আসছেন ঠিকই, তবে অনেকেই ঘুরে ঘুরে দেখে কিছু না কিনেই চলে যাচ্ছেন।”
এদিকে নিউমার্কেটের আশপাশের দোকান ও ফুটপাতের স্টলে শীতের পোশাক তোলা শুরু হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এসব পণ্যের চাহিদা এখনো উল্লেখযোগ্য নয়।
দোকানের সামনে এবং ফুটপাতের স্টলে সাজানো আছে সোয়েটার, জ্যাকেট, হুডি, কার্ডিগান, ফুলহাতা টি-শার্ট ও শাল। ক্রেতারা মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে পোশাক দেখছেন, দাম জানতে চাইছেন, দরদামও করছেন। কিন্তু কেনাকাটা হচ্ছে তুলনামূলকভাবে কম।
নিউমার্কেটের ফুটপাতের পোশাক বিক্রেতা বিপ্লব বলেন, শীতের পোশাক বিক্রির জন্য তিনি মাত্র কয়েক দিন আগে দোকানে তুলেছেন।
তিনি বলেন, “এখনো শীত না পড়ায় বিক্রি কম। মানুষ পোশাক দেখছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন। অনেকেই বলছেন, শীত একটু বাড়লে কিনবেন।”
নূরজাহান মার্কেটের অরণ্য ফ্যাশনের মালিক জাহিদ জানান, সাধারণত শীতের মৌসুমের শুরুতে হালকা গরম পোশাকের চাহিদা আগে বাড়ে। তাপমাত্রা আরও কমলে জ্যাকেট, সোয়েটার ও হুডি বিক্রিও বাড়তে থাকে।
তিনি বলেন, “তরুণেরা সাধারণত হুডি ও জ্যাকেট বেশি পছন্দ করেন। অন্যদিকে, পরিবারের সদস্যরা শিশু ও বয়স্কদের জন্য সোয়েটারসহ অন্যান্য গরম পোশাক কেনেন। তবে আমরা শীতের পোশাক দোকানে সাজিয়ে রাখা শুরু করলেও এখনো বিক্রি বাড়েনি।”
নিউমার্কেটের পোশাক ব্যবসায়ী মোসাদ্দেকের আশা, শীত বাড়লে দোকানে ক্রেতার আনাগোনাও বাড়বে।
তিনি বলেন, “এখন আমাদের শেষ ভরসা শীত। ঠান্ডা বাড়লে হয়তো ব্যবসা ভালো হবে। বড় ধরনের ছাড় দিয়েও গ্রীষ্মের পোশাকের মজুত শেষ করতে পারিনি। এখন নতুন শীতের পোশাক আনার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছি।”
