শামসুর রাহমান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। জীবদ্দশাতেই তিনি বাংলাদেশের প্রধান কবি হিসেবে মর্যাদা লাভ করেন। পঞ্চাশের দশকে আধুনিক কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে অল্প সময়ের মধ্যেই দুই বাংলায় পরিচিতি অর্জন করেন। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায় তাঁর ‘রূপালি স্নান’ কবিতা প্রকাশিত হলে সাহিত্যাঙ্গনে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। নাগরিক জীবনের অভিজ্ঞতা, প্রকৃতির সৌন্দর্য, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও মানবিক চেতনা তাঁর কবিতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ‘মজলুম আদিব’ ছদ্মনামে কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় কবিতা লিখতেন।
কবি শামসুর রাহমানের জন্ম পুরান ঢাকার মাহুতটুলিতে, নানাবাড়িতে। তাঁর বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী এবং মা আমেনা বেগম। তাঁদের পৈতৃক নিবাস নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পাড়াতলী গ্রামে। তাঁর ডাকনাম ছিল বাচ্চু। ১৩ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। ১৯৪৫ সালে পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করেন। ১৯৫৩ সালে পাস কোর্সে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ইংরেজি সাহিত্যে এমএ প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন।
সাংবাদিকতা ছিল তাঁর পেশাগত জীবনের প্রধান পরিচয়। ১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজ-এ সহসম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। পরে মর্নিং নিউজ-এ সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে দৈনিক পাকিস্তান-এ যোগ দিয়ে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রা-র সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে স্বৈরশাসনের প্রতিবাদী পরিবেশে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। পরবর্তীকালে তিনি মাসিক সাহিত্যপত্রিকা অধুনা-র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শামসুর রাহমান ছিলেন স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা ও সাংস্কৃতিক দমননীতির বিরুদ্ধে আপসহীন কণ্ঠস্বর। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের শাসনকে বিদ্রূপ করে লেখেন ‘হাতির শুঁড়’। কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে রচনা করেন ‘টেলেমেকাস’। ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে তিনি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। পাকিস্তানের সব ভাষায় রোমান হরফ চালুর প্রস্তাবের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানান। ভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকে রচনা করেন কালজয়ী কবিতা ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’।
১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট দেখে গভীরভাবে আলোড়িত হয়ে তিনি লেখেন ‘আসাদের শার্ট’। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে ‘আসুন আমরা আজ ও একজন জেলে’ কবিতা রচনায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পরিবারসহ পৈতৃক গ্রাম পাড়াতলীতে আশ্রয় নেন। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত তাঁর অমর কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও আত্মত্যাগের অনন্য প্রতীক হয়ে আছে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও কবি ছিলেন সোচ্চার। ১৯৮৭ সালে এরশাদের শাসনের প্রতিবাদে পদত্যাগের পর তিনি শৃঙ্খলমুক্তি, স্বৈরাচার- বিরোধিতা, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী চেতনা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কবিতা রচনা করেন। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রের পক্ষে লেখেন কবিতা। অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর দরদ ছিল তাঁর সাহিত্য ও জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি। মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরোধিতা ও তাঁর বাসভবনে হামলার মতো প্রতিকূলতার মুখেও তিনি নিজের আদর্শে অবিচল ছিলেন।
বাংলা কবিতায় স্বাধীনতা, মানবতা অসাম্প্রদায়িকতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার যে অনন্য উত্তরাধিকার তিনি রেখে গেছেন, তা তাঁকে বাঙালির সাহিত্য-ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
কবি ১৭ আগস্ট ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ঢাকার বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
কবি শামসুর রাহমান (জন্ম: ২৩ অক্টোবর ১৯২৯ – মৃত্যু: ১৭ আগস্ট ২০০৬)
