দ্য ওয়াল ব্যুরোর রির্পোটে প্রকাশ বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) তাঁর দল আওয়ামী লিগের কার্যক্রমের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রসংঘের দ্বারস্থ হয়েছেন। চলমান নিষেধাজ্ঞা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টারদের কাছে একটি চিঠি জমা দিয়েছেন তিনি। দেশে ফেরার আগে হাসিনার এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক বৈঠকে দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে হাসিনা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের প্রস্তাব দেন। তিনি এমন কি রিকনসলেশন বা পুনর্মিলনের কথাও বলেছেন। অর্থাৎ বিবদমান গোষ্ঠীগুলির মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে সমস্যা মিটিয়ে ফেলার সূত্র তুলে ধরেছেন তিনি। আওয়ামী লিগ এবং সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য, সেই প্রক্রিয়ায় এগতে হলে সবচেয়ে আগে জরুরি হল দলটির কার্যক্রমের উপর বলবৎ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা।
গত বছর ১২ মে তৎকালীন মহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লিগের কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করে সন্ত্রাস দমন আইনে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে বলে বিভিন্ন মহল থেকে আশা প্রকাশ করা হলেও বাস্তবে হয়েছে উল্টোটি। ইউনুস সরকার আওয়ামী লিগের উপর নিষেধাজ্ঞা বহালে যে অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল তারেক রহমানের সরকার সংসদের বিল এনে সেটিকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য রাষ্ট্রসংঘের হস্তক্ষেপ চাইলেন হাসিনা।
রাষ্ট্রসংঘ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলিতে ‘র্যাপোটার’-রা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের বিষয়গুলি বিচার-বিশ্লেষণ করে রিপোর্ট তৈরি করে থাকেন। তারা জাতিসংঘের স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন। তারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং অবৈতনিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। সংশ্লিষ্ট দেশে গিয়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করেন এবং প্রতি বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও মানবাধিকার কাউন্সিলে তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেন।
হাসিনার তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, কীভাবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন কর্তৃক আরোপিত এই নিষেধাজ্ঞা শুধু বজায় রাখা হয়নি, বরং তারেক রহমানের বিএনপি সরকার এটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লিগকে অংশগ্রহণের অনুমতি না দেওয়ায় বিএনপি ক্ষমতায় আসে। হাসিনার দাবি দেশে তাঁর দলকে নির্বাচনে অংশ অংশগ্রহণ করতে দেওয়ার পক্ষে ব্যাপক সমর্থন ছিল। কিন্তু আওয়ামী লিগকে অংশ নিতে না দেওয়ায় নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু বা সর্বজনীন ছিল না এবং এর ফলাফলের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে যে, কীভাবে চলমান নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশকে একটি সাংবিধানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য অবস্থানে ফেলেছে। যেখানে একটি প্রধান রাজনৈতিক দল ও তার সহযোগী সংগঠনগুলি নির্বাচনে অংশগ্রহণে আইনত নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন আয়োজন এবং গণতান্ত্রিক সরকার সুসংহত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা কার্যকরভাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। এতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, কীভাবে এই নিষেধাজ্ঞা এবং আওয়ামী লিগের সমর্থকদের ওপর চলমান হামলার কারণে আইনজীবী নিয়োগ এবং এ ধরনের অভিযোগ দায়ের করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যার ফলে বাংলাদেশের আদালতে আওয়ামী লিগের পক্ষে এই নিষেধাজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বলা হয়েছে যে, চলমান এই নিষেধাজ্ঞাটি সংবিধানের ১৯ (মত প্রকাশের স্বাধীনতা), ২১ (শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা), ২২ (সংগঠনের স্বাধীনতা) এবং ২৫ (যা ‘রাজনৈতিক অধিকার’ নিশ্চিত করে) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। বিজ্ঞপ্তিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, এই নিষেধাজ্ঞাটি আইন দ্বারা নির্ধারিত নয়, কারণ এটি ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় থাকা একটি সরকার কর্তৃকই আরোপ করা হয়েছে। এর কোনও বৈধ উদ্দেশ্য নেই এবং এটি নিজেই আওয়ামী লিগের সদস্য ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে চলমান আক্রমণের একটি অংশ। এটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এতে সুরক্ষার অভাব রয়েছে।
চিঠিতে রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টারদের (সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় মানবাধিকারের উন্নয়ন ও সুরক্ষা বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার অধিকার বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টার এবং গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা উন্নয়ন বিষয়ক স্বাধীন বিশেষজ্ঞ) জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রকাশ্য বিবৃতি জারির জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।
