পার্থিব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও যিনি নিজেকে রাখতে পেরেছেন মোহের ঊর্ধ্বে, ইতিহাসে তাঁর নাম অনন্য উচ্চতায় আসীন থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও যিনি নিজের জন্য এক চিলতে জমিও ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেননি—যাঁর একমাত্র ঠিকানা এই বাংলার মাটি, নির্ভরতার ছাদ এই বাংলার আকাশ, আর পরমাত্মীয় এই দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ—তাঁর এই জীবনাবস্থা বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক বিরল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
ক্ষমতার অলিন্দে কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের শীর্ষে থেকে অনেকেই বিত্তবৈভবের পাহাড় গড়তে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু শেখ হাসিনার জীবন প্রমাণ করে—প্রকৃত নেতৃত্ব কেবল ইট-পাথরের প্রাসাদে সীমাবদ্ধ নয়।
যাঁর শেকড় প্রোথিত রয়েছে এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের হৃদয়ে, ব্যক্তিগত অর্জনের হিসাব তাঁর কাছে সবসময়ই ছিল তুচ্ছ। ক্ষমতার মসনদ বা রাজপ্রাসাদ তাঁর কাছে কখনোই জীবনের মোক্ষ ছিল না; বরং, তাঁর আসল অর্জন ছিল বাংলার মানুষের ভালোবাসা আর আস্থা।
ঘাতকচক্র বারবার নৃশংস ষড়যন্ত্র ও গ্রেনেড হামলার রক্তস্নাত পথ তৈরি করলেও, তিনি মৃত্যুভয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জয় করেছেন। বাংলার মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসাকে সাথি করে, এক প্রদীপ্ত আলোকবর্তিকার মতো তিনি সর্বদা এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বিপর্যয়ের পর, বর্তমান অবৈধ সরকারের আমলে দেশের গণতান্ত্রিক পথ আজ সম্পূর্ণ কলুষিত। আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীর ওপর চলছে চরম নির্যাতন, নির্বিচারে হত্যা, গায়েবি মামলা ও জেল-জুলুমের স্টিম রোলার। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে চরম দুর্বিষহ; খুন, ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন আজ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে আইনের শাসন ও মানুষের মৌলিক অধিকার আজ বিপন্ন।
আর ঠিক এই চরম ক্রান্তিলগ্নে, দেশের মানুষের এই দুর্দিন ও আর্তনাদ তাঁকে শান্ত থাকতে দেয়নি। সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে, লুণ্ঠিত গণতান্ত্রিক অধিকার ও মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে এবং এই অরাজকতার অবসান ঘটাতে তিনি আগামী ডিসেম্বরেই দেশে ফিরে আসার অদম্য প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
আজ যখন তিনি প্রবাসের সব গণ্ডি পেরিয়ে বাংলার মানুষের টানে ফিরে আসার ঘোষণা দিচ্ছেন, তখন তাঁর এই অপ্রতিরোধ্য ও নির্মোহ সত্তাটি আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত অর্জনের লোভ যাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি, তাঁর জন্য এই বাংলার মাটি আর আকাশই তো সবচেয়ে নিরাপদ ও পরম আশ্রয়।
পাঁচবারের সফল এই রাষ্ট্রনায়কের সরল, নির্মোহ ও শেকড়সংলগ্ন জীবনদর্শন আমাদের শেখায় যে—প্রকৃত শক্তি ব্যাংকের হিসাব বা ক্ষমতার চেয়ারে নয়, বরং মানুষের ভালোবাসায়। সমস্ত প্রতিকূলতা, মৃত্যুভয় ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে, বাংলার মানুষের মুক্তির টানে তাঁর ডিসেম্বরে ফিরে আসার ঘোষণা তাই কেবল একটি রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়; এটি বাংলার আকাশ ও মাটির সাথে তাঁর এক চিরন্তন, অবিচ্ছেদ্য ও অটুট বন্ধনের দুর্নিবার জয়গান।
লেখাঃ রৌদ্র রুদ্র, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
