রজত কান্তি রায়
সৃজনশীল কাজের মালিক কে—একটা সময় এই প্রশ্নের সরল উত্তর ছিল, যিনি তৈরি করেছেন, তিনি। কিন্তু ডিজিটাল যুগে, বিশেষত এআই যখন সৃজনশীল বহু বিষয় উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে, সেই সময় এই প্রশ্নের উত্তর আর সহজ থাকছে না—বিভিন্ন কারণে। এখন প্রম্পট আপনার, প্ল্যাটফর্ম কোনো জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানের। সেসব প্ল্যাটফর্ম আপনি সাবস্ক্রাইব করে বা ফ্রি ব্যবহার করছেন। ফলে আপনি ক্রিয়েটর হিসেবে প্রম্পটের মালিক, নাকি তৈরি হওয়া সৃজনশীল সম্পদের মালিক, তা নির্ণয় করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
মানুষের সৃজনশীলতার জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অনুপ্রবেশ নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি তৈরি করেছে একগুচ্ছ জটিল প্রশ্ন। যন্ত্রের তৈরি ছবির শিল্পী কে? এআই দিয়ে লেখা উপন্যাসের লেখক কে? কোনো গায়কের কণ্ঠ নকল করে গান তৈরি করলে সেই গানের অধিকার কার? আর এআইকে প্রশিক্ষণ দিতে যদি লাখ লাখ মানুষের লেখা, ছবি ও গান ব্যবহার করা হয়, তাঁদের অনুমতি নেওয়া হচ্ছে কি?
কয়েকটি নির্দেশনা, তারপরই শিল্পকর্ম!
ছবি তৈরির ক্ষেত্রে মিডজার্নি, ডাল-ই এবং গুগলের ইমাজেন উল্লেখযোগ্য। লেখার ক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটি ও জেমিনি, আর সংগীত তৈরিতে সুনো ও উদিওর মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে।
এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী কয়েকটি বাক্য বা প্রম্পট লিখে ছবিসহ বিভিন্ন সৃজনশীল জিনিস তৈরি বা সম্পাদনা করতে পারেন। এখানেই তৈরি হয়েছে সৃজনশীলতার নতুন সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক। আগে শিল্পকর্ম তৈরিতে শিল্পীর দক্ষতা, সময়, অভিজ্ঞতা ও শ্রম ছিল মুখ্য; এখন একটি অংশের কাজ করে দিচ্ছে অ্যালগরিদম। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যিনি শুধু নির্দেশনা দিয়েছেন, তিনি কি শিল্পী? নাকি যিনি এআই মডেল তৈরি করেছেন, তিনিই সৃষ্টির প্রকৃত মালিক?
কপিরাইট মানুষের, নাকি যন্ত্রের?
কপিরাইট বা মেধাস্বত্বের প্রচলিত ধারণায় কোনো মৌলিক সাহিত্য, সংগীত, আলোকচিত্র কিংবা শিল্পকর্মের স্রষ্টা তার ওপর নির্দিষ্ট অধিকার ভোগ করেন। কিন্তু এআই দিয়ে তৈরি কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে, এখানে সৃষ্টির পেছনে মানুষের ভূমিকা কতটা, তা নির্ধারণ করা সব সময় সহজ নয়।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট অফিস ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, এআই দিয়ে তৈরি কোনো কাজের প্রকাশভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো নির্ধারণে মানুষের যথেষ্ট সৃজনশীল ভূমিকা থাকলেই শুধু সেগুলো কপিরাইট সুরক্ষা পেতে পারে। মাত্র একটি নির্দেশনা বা প্রম্পট লিখে এআইয়ের কাছ থেকে ছবি কিংবা লেখা তৈরি করিয়ে নিলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কপিরাইট পাওয়ার যোগ্য হবে না।
অন্যদিকে, কোনো মানুষ যদি এআইয়ের তৈরি ছবিকে নিজের সৃজনশীল সিদ্ধান্তে সম্পাদনা করেন, একাধিক উপাদান নতুনভাবে সাজান কিংবা নিজের মৌলিক শিল্পকর্মের সঙ্গে এআইয়ের তৈরি উপাদান যুক্ত করে নতুন কাজ তৈরি করেন, তাহলে সেই মানবিক অবদান কপিরাইট সুরক্ষার যোগ্য হতে পারে।
বাংলাদেশে আইনের অবস্থান কী
বাংলাদেশেও এআইয়ের তৈরি শিল্পকর্মের মালিকানা নিয়ে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেশে বর্তমানে কার্যকর কপিরাইট আইন, ২০২৩-এর ১৫ ধারায় সাধারণভাবে বলা হয়েছে, কোনো কর্মের প্রণেতা তার কপিরাইটের প্রথম স্বত্বাধিকারী হবেন।
আইনের ২ ধারায় প্রণেতার সংজ্ঞায় সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্রে লেখক, সংগীতের ক্ষেত্রে রচয়িতা ও সুরকার, আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে আলোকচিত্রী এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে প্রণয়নকারী ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে।
তবে এআই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো ছবি, গান বা সাহিত্যকর্ম তৈরি করলে তার কপিরাইট কার হবে, সে বিষয়ে আইনে আলাদা ও সুস্পষ্ট বিধান আছে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই শুধু এআইয়ের নির্দেশদাতা, সফটওয়্যার নির্মাতা কিংবা প্ল্যাটফর্মের মালিককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কপিরাইটের মালিক বলা যাবে না। নির্দিষ্ট ঘটনার ক্ষেত্রে মানুষের সৃজনশীল অবদান, চুক্তি এবং প্রযোজ্য আইনের ব্যাখ্যা বিবেচনা করতে হবে।
গুগল ও মেটা কি আপনার কনটেন্টের মালিক
গুগলের টার্মস অব সার্ভিস ঠিকমতো পড়লে দেখবেন, সেখানে লেখা আছে, ইওর কনটেন্ট রিমেইনস ইয়োরস। অর্থাৎ আপনার কনটেন্টের মালিকানা আপনার হাতেই।
ফলে কোনো ব্যক্তি নিজের তৈরি ছবি, ভিডিও, সংগীত, গল্প, উপন্যাস বা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজ গুগলের যেকোনো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করলে সাধারণভাবে তার মালিকানা ওই স্রষ্টার কাছেই থাকে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। মালিকানা বা ওনার্সশিপ আর ব্যবহারের অনুমতি বা লাইসেন্স এক বিষয় নয়। আপনি গুগলের কোনো প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট প্রকাশ করলে, সেবাটি পরিচালনা ও উন্নত করার জন্য গুগল নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমতি পায়। যেমন গুগল ফটোসে ছবি আপলোড করলে সেটি সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করে।
ইউটিউবের টার্মস অব সার্ভিসে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারী তাঁর আপলোড করা কনটেন্টের মালিকানা ধরে রাখেন। তবে ইউটিউবকে একটি বিশ্বব্যাপী, নন-এক্সক্লুসিভ, রয়্যালটিমুক্ত, হস্তান্তরযোগ্য ও সাব-লাইসেন্সযোগ্য ব্যবহারের লাইসেন্স দিতে হয়।
তবে এই লাইসেন্স অন্য কাউকে ভিডিওটি নিয়ে স্বাধীনভাবে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি দেয় না।
ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম কনটেন্ট
সাধারণভাবে বলা যায়, মেটার যেকোনো প্ল্যাটফর্মে সৃজনশীল কিছু প্রকাশ করা মানে তার কপিরাইট মেটার হয়ে যাবে না, তা আপনারই থাকবে। তবে প্ল্যাটফর্মের শর্তাবলি এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি কনটেন্ট হোস্ট, প্রদর্শন কিংবা নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত কাজে ব্যবহারের লাইসেন্স পেতে পারে। সেই লাইসেন্স এবং এআই প্রশিক্ষণের অনুমতি এক নয়।
সাম্প্রতিক বিতর্ক
এআইয়ের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া নিয়ে চলছে বড় বিতর্ক। একটি ছবি তৈরির মডেলকে প্রশিক্ষণ দিতে লাখ লাখ ছবি বিশ্লেষণ করা হতে পারে। একইভাবে ভাষাভিত্তিক মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে বই, সংবাদপত্র, গবেষণাপত্র, ব্লগ ও অনলাইন আলোচনার বিপুল সংগ্রহ। কিন্তু এসব কনটেন্টের অনেকগুলোই কপিরাইট সুরক্ষিত। মূল স্রষ্টার অনুমতি ছাড়া প্রশিক্ষণের কাজে সেসব ব্যবহার করা যাবে কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক চলছে।
ছবি, গান ও সাহিত্য—বিতর্কের ধরন আলাদা
এআইয়ের তৈরি সব ধরনের শিল্পকর্মের কপিরাইট নিয়ে একই ধরনের সমস্যা তৈরি হয় না।
এআই ফটোগ্রাফি: বাস্তব কোনো আলোকচিত্রীর ছবির মতো করে এআই দিয়ে ছবি তৈরি করা হলে প্রশ্ন ওঠে, মূল ছবির বৈশিষ্ট্য বা স্বতন্ত্র উপাদান কতটা ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কোনো বাস্তব ব্যক্তির মুখ বা পরিচয় অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলেও গোপনীয়তা ও ব্যক্তি স্বত্বের প্রশ্ন তৈরি হয়।
এআই সংগীত: এআই দিয়ে নতুন সুর, গান ও কণ্ঠ তৈরি করা যাচ্ছে। কিন্তু কোনো জীবিত শিল্পীর কণ্ঠ হুবহু নকল করে গান বানালে তাঁর কণ্ঠস্বরের অধিকার, পরিচিতি ও বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রশ্ন উঠবে। গানের কথা, সুর এবং মূল রেকর্ডিংয়ের কপিরাইটও আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।
এআই সাহিত্য: উপন্যাস, কবিতা, সংবাদ প্রতিবেদন কিংবা গবেষণার খসড়া তৈরি করতে পারে এআই। কিন্তু কোনো লেখকের স্বতন্ত্র বাক্য, চরিত্র, কাহিনি বা প্রকাশভঙ্গি অননুমোদিতভাবে ব্যবহার করলে মৌলিকত্ব ও কপিরাইট লঙ্ঘনের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এআই চিত্রকলা: বিখ্যাত শিল্পীর আঁকার ধরন অনুকরণ করে ছবি তৈরি করা যায়। কিন্তু কোনো শিল্পীর স্টাইল বা সামগ্রিক নান্দনিকতা অনুকরণ করা এবং তাঁর নির্দিষ্ট শিল্পকর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নকল করলে কপিরাইট লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—কপিরাইট, ব্যক্তি স্বত্ব এবং কণ্ঠস্বর বা পরিচয়ের বাণিজ্যিক অধিকার এক জিনিস নয়। কোনো কাজ কপিরাইট লঙ্ঘন না করলেও বাস্তব মানুষের পরিচয় বা কণ্ঠস্বরের অননুমোদিত ব্যবহার অন্য আইনি সমস্যার জন্ম দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: ইউএস কপিরাইট অফিস, গুগল, মেটা, বাংলাদেশ কপিরাইট আইন, ২০২৩
