–কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে ইতিহাসের অবিরাম অগ্নিশিখা
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর—বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত ও অন্ধকারের দিন। এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুর্ভেদ্য প্রাচীরের আড়ালে ঘটেছিল এক পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাত্র আড়াই মাসের মাথায় সংঘটিত হয় এই নৃশংসতা। বন্দিদশায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান এবং এম মনসুর আলীকে। কারাগারের মতো সুরক্ষিত স্থানে এ ধরনের বর্বরতা সদ্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রকে নেতৃত্বশূন্য করার এক গভীর ষড়যন্ত্রের নগ্ন রূপ ছিল।
এই শোকাবহ ঘটনার শিকড় প্রোথিত পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রিতে। সেদিন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে ঘাতকদের বুলেটে সপরিবারে প্রাণ হারিয়েছিলেন বাঙালি জাতির মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারাকে কবর দেওয়ার অপচেষ্টা শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর কারাগারের ভেতর স্তব্ধ করে দেওয়া হয় জাতীয় চার নেতার কণ্ঠ, যেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ পুনরুজ্জীবিত করার মতো কোনো নেতৃত্ব অবশিষ্ট না থাকে।
বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে মসনদে বসা খন্দকার মোশতাক তাঁর অবৈধ সরকারকে বৈধতার মুখোশ পরাতে চেয়েছিলেন জাতীয় চার নেতার সমর্থনে। এসেছিল মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব, ক্ষমতার প্রলোভন। কিন্তু যাঁরা একাত্তরে একটি জাতিকে স্বাধীনতার বন্দরে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তাঁরা পিতার খুনিদের সঙ্গে আপস করেননি। সেই দৃঢ় “না”-এর মূল্য তাঁরা দিয়েছেন জীবন দিয়ে।
৩ নভেম্বরের ভোররাতে সশস্ত্র ঘাতকদল এসে দাঁড়ায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে। বঙ্গভবন থেকে টেলিফোনে আসা নির্দেশে খুলে যায় লৌহকপাট। চার নেতাকে এক কক্ষে জড়ো করে চালানো হয় ব্রাশফায়ার। গুলির পরও যাঁদের দেহে প্রাণের স্পন্দন ছিল, ঘাতকেরা ফিরে এসে বেয়নেটে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিশ্চিত করে তাঁদের মৃত্যু। রাষ্ট্রের হেফাজতের প্রতীক কারাগার সে রাতে পরিণত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট বধ্যভূমিতে।
পঁচাত্তরে কারাগারের দেয়াল নেতাদের রক্ষা করতে পারেনি; অর্ধশতাব্দী পর আবারও সেই কারাগারে বন্দি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসংখ্য সৈনিক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর দেশ এক গভীর সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চরম দুরবস্থা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত চক্রের প্রতিহিংসায় হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর ওপর নেমে এসেছে জেল-জুলুম, দমন-পীড়ন ও নির্বিচার হত্যার খড়্গ। ইতিহাস বিকৃতি ও রাজনৈতিক মেরুকরণের এই ক্রান্তিলগ্নে জেল হত্যা দিবসের তাৎপর্য দাঁড়িয়েছে এক ভিন্ন ও বেদনাবিধুর বাস্তবতায়—যেখানে ন্যায়বিচার আজ বড় বেশি প্রশ্নবিদ্ধ।
যে প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, পঁচাত্তর দেখেনি, তাদের সামনেই চলছে ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার সংঘবদ্ধ অপচেষ্টা। তরুণদের জানতে হবে, এই স্বাধীনতা কারও দয়ার দান নয়; এর পেছনে আছে লাখো শহীদের রক্ত, আর সেই স্বাধীনতার আদর্শ রক্ষা করতে গিয়েই কারাগারের অন্ধকারে প্রাণ দিয়েছেন জাতীয় চার নেতা। তাঁরা শিখিয়ে গেছেন, ক্ষমতার লোভ আর মৃত্যুর ভয় উপেক্ষা করেও আদর্শে অবিচল থাকা যায়। সত্য ইতিহাস চর্চা করার দায় আজ তরুণদেরই। কারণ যে জাতি নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, ইতিহাস তাকে ক্ষমা করে না।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় জেল হত্যা দিবস কেবল কোনো গতানুগতিক শোক পালনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি চরম অন্যায় ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক ইস্পাতকঠিন প্রতিবাদের দিন!
রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র ধ্বংসকারী, মানবাধিকার হরণকারী এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার এই উন্মত্ত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এখনই জেগে ওঠার সময়। বারবার রক্তে ভেজা এই বাংলায় বিএনপি-জামায়াত চক্রের অন্যায়, প্রতিহিংসা বা অস্থিতিশীলতার বীজ আর রোপণ করতে দেওয়া হবে না। জাতীয় চার নেতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা আর রক্তের ঋণ শোধের অঙ্গীকারে আজ আমাদের একটাই বজ্রকঠিন প্রতিজ্ঞা: এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে চলবে অবিরাম প্রতিরোধ!
লেখা: রৌদ্র রুদ্র, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
