৩০ বছরে ন্যূনতম মজুরি বেড়েছে প্রায় ১৩ গুণ; একেক দফায় মজুরি বাড়লেও মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না শ্রমিকরা
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি গত তিন দশকে কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে। ১৯৯৪ সালে একজন পোশাক শ্রমিকের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ছিল ৯৩০ টাকা। ২০২৩ সালে সর্বশেষ ঘোষিত মজুরি কাঠামোয় তা বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। অর্থাৎ ৩০ বছরে টাকার অঙ্কে ন্যূনতম মজুরি বেড়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ৪৪ গুণ। তবে এই বৃদ্ধি শ্রমিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়িয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে বড় প্রশ্ন।
পোশাকশিল্পে মজুরি বৃদ্ধির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের আন্দোলন, অসন্তোষ, কর্মবিরতি এবং বিভিন্ন সময়ে সংঘাতের পর সরকার নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করেছে। এক দফা থেকে আরেক দফা মজুরি বৃদ্ধির মধ্যবর্তী সময়ে কখনো ১২ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে শ্রমিকদের।
তিন দশকে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি বৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিকতা হলো:
| সাল | সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি | আগের কাঠামোর তুলনায় বৃদ্ধি |
| —- | ——————— | ————————– |
| ১৯৯৪ | ৯৩০ টাকা | — |
| ২০০৬ | ১,৬৬২.৫০ টাকা | ৭৮.৭১% |
| ২০১০ | ৩,০০০ টাকা | ৮০.৫১% |
| ২০১৩ | ৫,৩০০ টাকা | ৭৬.৬৭% |
| ২০১৮ | ৮,০০০ টাকা | ৫০.৯৪% |
| ২০২৩ | ১২,৫০০ টাকা | ৫৬.২৫% |
তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন ও টিবিএসের প্রকাশিত মজুরি কাঠামোর ইতিহাস।
মজুরি বৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহ
১৯৯৪: ৯৩০ টাকা
১৯৯৪ সালে পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয় ৯৩০ টাকা। এর আগে ১৯৮৪ সালে প্রথম মজুরি কাঠামো নির্ধারণের সময় সর্বনিম্ন মজুরি ছিল ৫৬০ টাকা; পরবর্তী সময়ে ১৯৮৬ সালে তা ৬২৭ টাকা করা হয়।
২০০৬: ১,৬৬২.৫০ টাকা
দীর্ঘ ১২ বছর পর ২০০৬ সালে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা হয়। এতে সর্বনিম্ন মজুরি ৯৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়। বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৭৮.৭১ শতাংশ।
২০১০: ৩,০০০ টাকা
২০১০ সালে আবারও মজুরি বৃদ্ধি করা হয়। সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। পেশাগত শ্রেণিভেদে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৬৭ থেকে ৮১ শতাংশ।
২০১৩: ৫,৩০০ টাকা
তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড এবং রানা প্লাজা ধসের পর পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মজুরি নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা ও চাপ তৈরি হয়। ২০১৩ সালের নভেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়। সর্বনিম্ন মজুরি ৩ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করা হয়। নতুন কাঠামো ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়।
২০১৮: ৮,০০০ টাকা
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করে। আগের ৫ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৫০.৯৪ শতাংশ। নতুন কাঠামো ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। তবে নতুন মজুরি কাঠামোর বিভিন্ন গ্রেডে অসংগতি নিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনের পর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে কয়েকটি গ্রেডের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। সর্বনিম্ন মজুরি ৮ হাজার টাকাই রাখা হয়।
২০২৩: ১২,৫০০ টাকা
২০২৩ সালের নভেম্বরে পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। বৃদ্ধির হার ছিল ৫৬.২৫ শতাংশ। ১ ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকর হয়।
তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ২৩ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি জানানো হয়েছিল। ফলে ঘোষিত ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ অব্যাহত থাকে।
৩০ বছরে মজুরি বেড়েছে ১৩ গুণ, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়?
মজুরির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে একজন পোশাক শ্রমিকের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ছিল ৯৩০ টাকা। ২০২৩ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ номিনাল বা টাকার অঙ্কে মজুরি বেড়েছে প্রায় ১,২৪৪ শতাংশ।
কিন্তু শুধু টাকার অঙ্কে মজুরি বৃদ্ধিকে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। কারণ একই সময়ে খাদ্যপণ্য, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির কারণে মজুরির একটি বড় অংশ বাসস্থানেই ব্যয় হয়ে যায়।
২০২৩ সালের নতুন মজুরি কাঠামো নিয়েও শ্রমিকদের আপত্তি ছিল। শ্রমিকদের দাবি ছিল, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে, মালিকপক্ষ উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের মূল্য এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতার যুক্তি তুলে ধরে।
নতুন মজুরি বোর্ড, আবারও অপেক্ষায় শ্রমিকরা
২০২৬ সালের ২ নভেম্বর প্রকাশিত ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য আবারও মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৩ সালের পর নতুন করে মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে নতুন মজুরির পরিমাণ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল লাখ লাখ শ্রমিকের শ্রমেই দেশের রপ্তানি আয় ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। অথচ তাঁদের ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের জন্য কত টাকা প্রয়োজন, সেই প্রশ্নটি প্রতিবারই নতুন মজুরি নির্ধারণের সময় সামনে আসে।
তিন দশকের মজুরি বৃদ্ধির ইতিহাস দেখাচ্ছে, শ্রমিকদের আয় বাড়লেও প্রতিটি নতুন মজুরি কাঠামোর পর আবারও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। তাই এবারের মজুরি নির্ধারণে শুধু মালিকপক্ষের উৎপাদন ব্যয় কিংবা শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নয়, শ্রমিকদের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণের সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠছে।
