নির্বাচনের অনিশ্চয়তা আর নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতায় দেশের পুঁজিবাজারে ফের বড়ো দরপতন ঘটেছে। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এমন এক পতন হয়েছে, যা বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা আস্থাহীনতা ও গুঞ্জনের বাস্তব প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দিনভর লেনদেন শেষে দেখা গেছে—যে কয়টি শেয়ারের দাম বেড়েছে, তার চেয়ে প্রায় দশগুণ বেশি শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। বাজারের সব সূচকই ১ শতাংশ বা তার বেশি পড়ে গেছে। লেনদেনও নেমে এসেছে ৯ কার্যদিবসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি শুধু সংখ্যার পতন নয়, বরং আস্থার পতন। তারা বলছেন, নির্বাচনের সময় আসলেই পুঁজিবাজারে আতঙ্কের ছায়া নেমে আসে—এমন বাস্তবতা বছর বছর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। অথচ বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং নীতিনির্ধারকরা এখনো নিরব দর্শক। এই বাজারের দায় কে নেবে সেই প্রশ্ন উঠছে বিনিয়োগকারীদের কণ্ঠে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনের আগে একই দৃশ্য দেখা গেলেও এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। নির্বাচনের তারিখ ঘিরে অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অচলাবস্থা, এবং সরকারি দপ্তরের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্জিন ঋণ নীতিমালা নিয়ে একের পর এক গুঞ্জন।
মিডওয়ে সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশেকুর রহমান বলেন, “নির্বাচনী অনিশ্চয়তার একটি প্রভাব পুঁজিবাজারে দেখা যাচ্ছে। অতীতে হওয়া জাতীয় নির্বাচনের আগেও এমন প্রভাব দেখা গেছে। এর সঙ্গে মার্জিন বিধিমালার গেজেট নিয়েও অনেক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে… আতঙ্কিত এক শ্রেণির বিনিয়োগকারী এটি নিয়েও গুঞ্জন ছড়াচ্ছে, যা বাজার পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে ভূমিকা রেখেছে আজ।”
অন্যদিকে পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন আরও সরাসরি বলেন, “মার্জিন ঋণ বিধিমালায় পুরোনোদের জন্য সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে… মূলত বাজারের পতনে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টি বেশি নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকার কারণে, বাজারে নতুন করে বিনিয়োগও আসছে না, আর বাজারও তার নিজস্ব গতি ফিরে পাচ্ছে না।”
অর্থাৎ সরকারি নীতিনির্ধারকরা যতই বিষয়টি লঘু করে দেখাতে চান না কেন, বাস্তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়ছে—আর বাজার প্রতিদিন সেই আতঙ্কের মূল্য দিচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএসইতে মোট ৩৯০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৪টির দাম বেড়েছে, অথচ ৩২৯টির দাম পড়েছে—প্রায় ৯.৬৮ গুণ বেশি পতন। এমন ভারসাম্যহীন বাজারে স্থিতিশীলতার কোনো চিহ্নই দেখা যাচ্ছে না।
ফলে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৬৮ পয়েন্ট বা ১.৩৭ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৯০০ পয়েন্টে নেমে এসেছে। শরিয়াহ সূচক কমেছে ১.৬০ শতাংশ, আর ডিএসই-৩০ সূচক প্রায় ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। লেনদেনও কমে এসেছে ৪০২ কোটি টাকায়—যা ২৭ অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন। অথচ বাজারে তারল্য সংকট নিরসনের নামে নানা আশ্বাস ও বৈঠকের পরও বাস্তবে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে না।
পুঁজিবাজারের অচলাবস্থা নিয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “নির্বাচনী অনিশ্চয়তা বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
পাশাপাশি পাঁচ ব্যাংকের মার্জ হলে বিনিয়োগকারীরা কিছু পাবেন কিনা, বিষয়টি এখনো পরিষ্কার না হওয়ায় এটি সার্বিকভাবে বাজারে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে… মার্জিন ঋণ নিয়ে এক শ্রেণির বিনিয়োগকারীর বাজারে অস্থিরতা ছড়াচ্ছে।”
