রাজধানীর প্রতিটি পেট্রল পাম্প এখন একেকটা যুদ্ধক্ষেত্র। সকালের রোদ চড়ার আগেই লাইন শুরু হয়ে যায়, গড়িয়ে চলে গভীর রাত পর্যন্ত। যে মানুষটা সারাদিন খেটে সংসারের চালানোর তেলটা কিনতে এসেছেন, তাকে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। আর যিনি কোনোভাবে তেল পেয়েও যাচ্ছেন, তার অবস্থাও শোচনীয়। তেল পেতে পেতে নাওয়া খাওয়া ঘুম সব লাটে উঠেছে এ দেশের লাখো মানুষের।
শুধু দাম বাড়িয়ে কিংবা ভর্তুকির অংক কষে এ সমস্যার সমাধান হবে না। সমাধান চাইলে আগে বুঝতে হবে সংকটের আসল চরিত্র। পাম্পে পাম্পে কথা বলে যে চিত্রটা উঠে আসছে, তা আরও গভীর এক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভিআইপি সংস্কৃতি। পাম্পে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ সদস্য জানালেন, প্রভাবশালী পরিচয় দিয়ে, জরুরি কাজের অজুহাতে লাইন ভেঙে আগে তেল নেওয়ার চেষ্টা চলছেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ যখন এসব দেখেন, তখন তাদের মেজাজ বিগড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। সেখান থেকেই শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি, হট্টগোল, মারামারি।
একজন ফিলিং স্টেশনকর্মী তো বলেই ফেললেন, সারাদিন শুধু গালি খেতে খেতে অজ্ঞান হয়ে যাই আমরা। নিজেদের ভুল নেই, তবু আমরাই যেন কালপ্রিট। এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর ক্লান্তি, অবসাদ আর অবর্ণনীয় মানসিক চাপ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। অথচ এদের দিয়েই চলছে পাম্প।
পারভেজের মতো অনেকেই বলছেন, আসল প্রয়োজন বিশ্রামের, নির্দিষ্ট একটি রুটিনের। কেননা যে মানুষটার জীবনে কোনো স্থিরতা নেই, যে জানে না কাল সে তেল পাবে কিনা, তার পুরো জীবনটাই তছনছ হয়ে যায়। কিছু এলাকায় ইউএনও সাহেবরা নিজ উদ্যোগে নির্দিষ্ট সময়সূচি বেঁধে দিয়েছেন, আর সেসব জায়গায় কর্মীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে কাজ করছেন। কিন্তু এটা তো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ। সারাদেশের চিত্র পাল্টাতে গেলে চাই কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত, কার্যকর পরিকল্পনা আর মাঠপ্রশাসনের তৎপরতা।
আর সেটা করতে গেলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, দেশের এই ক্রান্তিকালে যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় বসে আছেন, তারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়েও বসেননি, আবার এ সংকট সমাধানের নৈতিক কর্তৃত্বও তাদের নেই। জিয়াউর রহমানের সেনানিবাসকেন্দ্রিক রাজনীতির উত্তরসূরিরা যখন দুর্নীতি আর অযোগ্যতার মহড়া চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন জনগণের দুর্ভোগ যে কাগুজে হিসেবনিকেশে মিটবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। কোনো পাতানো ভোটের সরকার কখনোই জনগণের বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে না। এর প্রমাণ আজকের এই জ্বালানি সংকট, প্রমাণ পথে পথে লাইন, প্রমাণ হাহাকার করা লাখো মানুষের অনিদ্রা আর অনাহার।
পাম্পের কর্মী থেকে শুরু করে মোটরসাইকেল চালক, রিকশাওয়ালা থেকে অফিস ফেরত মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সবাই এখন এক কাতারে। সবার একটাই প্রশ্ন, কবে স্বাভাবিক হবে জীবন? যতদিন পর্যন্ত নির্দিষ্ট রুটিন নিশ্চিত না হবে, যতদিন পাম্পে পাম্পে স্বজনপ্রীতি আর দুর্বৃত্তায়ন চলতেই থাকবে, ততদিন শুধু তেলের লাইনই লম্বা হবে না, মানুষের ধৈর্যের বাঁধটাও ভেঙে পড়বে বারবার।
