আফজাল হোসেন
আমার আব্বা আম্মা উভয়ের জন্ম অবিভক্ত ভারতবর্ষে। তারপর দেশভাগ হলো। দাগ কেটে দিয়ে বলা হলো এইটা ভারত, ঐটা পাকিস্তান। এক ভাগে পড়ে গেলো নানাবাড়ি আর এক ভাগে দাদাবাড়ি। আম্মারা রয়ে গেলেন ভারতীয় আর দাদা আব্বারা পেয়ে গেলেন নতুন পরিচয়, পাকিস্তানী।
দেশভাগের কালে আব্বা আম্মার বিয়ে হয়নি। সীমান্ত তখনো চোখ রাঙানো স্বভাব অর্জন করে ওঠেনি বলে দাদা নানাদের পরিবার ভাবতে পেরেছিলেন, দেশভাগ হয়েছে তাতে কি, আত্মীয়তা যখন রয়েছে, দুই পরিবারের পুত্র কন্যার মধ্যে বিবাহ অসম্ভব কিছু নয়।
গল্পে শুনেছি, বিয়ের বাজার করা হয়েছিল তখনকার কলিকাতা থেকে। আব্বা কয়েকজন আত্মীয় নিয়ে হবু শ্বশুরবাড়িতে সকালের নাস্তা সেরে কলিকাতা রওয়ানা হয়ে যান। কেনাকাটা শেষ করে রাতে শ্বশুরবাড়িতে খেয়ে ফেরেন নিজের দেশ পাকিস্তানের মাহমুদপুরে।
আম্মা নাকি খুব কান্নাকাটি করেছিলেন অন্য দেশে বিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে। নানা বুঝিয়েছিলেন, দেশ দুটো কিন্তু কাছাকাছিই তো থাকবো আমরা।
আমি আব্বা আম্মার প্রথম সন্তান। বোঝার বয়স হলে বুঝতে পারি, জীবনের সবচেয়ে আনন্দের জায়গা হচ্ছে নানাবাড়ি। আমার নানাবাড়ি দূরত্বের দিক দিয়ে খুব কাছে কিন্তু সেটা আর একটা দেশ।
দুটো দেশ। যাওয়া আসা করার নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন থাকা সত্বেও ইচ্ছা করলেই ওপারের মানুষ এপারে বা এপারের মানুষ আরামেই যাওয়া আসা করতে পারতো। পারতো বলে সেই আমলে সীমান্তের দুই পাশের মানুষদের কাছে এই ভাগভাগি খুব পেরেশানির বলে অনুভব হয়নি।
সে সময়টাতে দুই পারের সীমান্ত প্রহরায় থাকা বাহিনীর লোকজনেরা সাধারণ মানুষের যাওয়া আসার উপর কখনও কড়াকড়ি আরোপ করেছে বলে শোনা হয়নি, দেখিও নি। তাদের সায় থাকার কারণেই যাওয়া আসা করা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল না কারো।
বড় হলাম। মানুষ কিভাবে বড় হয়। লেখাপড়া, খেলাধুলা, সংস্কৃতির চর্চা ইত্যাদি বহুবিধ উপায়, পদ্ধতি মানুষের চারপাশে দেয়া আছে বা ছড়ানো আছে। চারপাশে ভালো মানুষদের দেখে বুঝে ভালো এবং মন্দ বুঝে নেয়ার মন তৈরি হয়।
সভ্যতা কি, শোভা সৌন্দর্য কাকে বলে বুঝিয়ে দেয় প্রকৃতি এবং চারপাশের মানুষ, মানুষের সমাজও প্রতিদিন পথ দেখিয়ে বুঝিয়ে দেয়, কোন পথ তোমার, বলে দেয় কোন পথ তোমাকে ডাকবে কিন্তু তুমি সে পথে হাঁটতে যাবে না।
আমি গ্রামে জন্মেছি। সেই শৈশব কৈশোরকালে গ্রামে জন্মেছি বলে বহুকিছু পাওয়া হয়নি, এমন কখনো মনে হয় নি। পেয়েছি সবই।
ভালো অভিভাবক, বিদ্যালয়, শিক্ষক, গ্রন্থাগার, ক্লাব, সাংষ্কৃতিক পরিবেশ, সামাজিক অভিভাবকত্ব, মোট কথা তখন প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই পেয়েছে মানুষ।
মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ভক্তি, ভালোবাসা ছিল। ভালোর প্রতিই আগ্রহ ছিল, মন্দের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা ছিল কম। গড়ে উঠতে যা কিছু মানুষের দরকার, কোনটারই অভাববোধ করতে হয়নি।
নিজের দেশের সবচেয়ে বড় শহব ঢাকা। আমাদের হ্যারিকেন জ্বলা গ্রাম থেকে সে শহর যেতে লেগে যেতো পুরো দিন। শুধু তাই নয়, বহুবার বহুরকমের যানবাহনও বদলানো লাগতো।
তখন দেশের টেলিভিশন আমাদের গ্রামে দেখা যেতো না। গ্রামে দেখতে পারতাম দূরদর্শন। আকাশবানীতে সবাই কান মন দিয়ে শুনতো রেডিও নাটক, অনুরোধের আসর, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন। সেটা ছিল গ্রাম কিন্তু গ্রামের লাইব্রেরীতে ছিল অঢেল বই।
আমাদের এলাকার মানুষ সিনেমা, থিয়েটার, যাত্রা দেখতে হৈ হৈ করে চলে যেতো ঐ পারে। জীবন অনেক সহজ আর সুন্দর ছিল। দেশ দুটো কিন্তু দুই দেশের মানুষদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল বন্ধুসুলভ। সে কারণেই কারো মধ্যে এই যখন কখন যাওয়া আসা নিয়ে অস্বস্তি ছিল না বিন্দুমাত্র।
কোনো দেশ, দেশের শত্রু হয় না। দেশের মানুষ নিজের উচ্চতা বৃদ্ধি করতে রাজনীতির পিঠে চড়ে বসে তারপর প্রধান এবং একমাত্র কর্তব্য হয় মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ তৈরির বন্দোবস্ত করা। এই নির্মম নিয়মে মানুষকে বনে যেতে হয় মানুষের শত্রু, দেশ বনে যায় আর এক দেশের শত্রু।
মনখারাপ হয়, আমাদের মনে যে স্বচ্ছতা ছিল, তা হারিয়ে গেছে। এখন কে কোন কথার কি মানে করবে কারো জানা নেই। কথা বলতে হয় হিসাব করে।
ভারতকে নিয়ে ভালো বললে হয়ে যেতে হয় ভারতের দালাল। যদি পাকিস্তান সম্পর্কে প্রশংসা করা হয়, বহু মানুষ বিজ্ঞের মতো লাফিয়ে উঠে বলে দেবে, এই মানুষটা তো পাকিস্তানের দালাল, প্রেতাত্মা।
যে দেশের যা যা ভালো আছে তা অনুভব করতে পারলে বলতে অসুবিধা কি? ভালোকে ভালো বলবার সামর্থ, উদারতা যদি না থাকে, নিজের ভালো বা নিজের দেশের ভালো বোঝার উদারতা, সামর্থ সে মানুষের থাকবার কথা নয়।
আমরা বোকার স্বর্গে বাস করি। দেশের মধ্যে কোন ব্যক্তিকে উঁচু আসনে বসাতে চেয়ে অন্য কোনো ব্যক্তিকে ছোট করি, অসম্মান করি। ঠিক একইভাবে নিজের দেশকে অনেক অনেক ভালোবাসি- এই প্রমান দিতে ক্রুদ্ধ হয়ে, বুক ফুলিয়ে অন্য দেশের অবমাননা করতে একটুও দ্বিধা করি না।
আমরা না চিনে, না জেনে না বুঝে মানুষকে দোষারোপ করি। করতে ভালো লাগে। অপরকে মন্দ বানাতে পারলে জীবন হয় স্বার্থক। তেমনি দেশের বেলাতেও স্বভাব একইরকম, ঠান্ডা মাথায় যদি ভেবে দেখা যায়- মানুষেরা দোষ করে সে দোষ দেশের উপরে চাপিয়ে দেয়।
মানুষদের বোঝা উচিৎ দেশের হাত পা, মুখ মাথা নেই। মগজও নেই। মগজ আছে মানুষের, সেই মগজ দিয়ে নিজের দেশকে অনুভব করতে হয়। অনুভব করতে পারলে প্রেম বাড়ে। বেড়ে যাওয়া প্রেম সংকীর্ণতা কমিয়ে দেয়।
দেশ দেশের মানুষদের চেনে, অনুভব করতে পারে, অনেক সইতেও পারে। সইতে শেখেও কেননা যে কোনো দেশ জানে, পৃথিবীতে সব মানুষ ভালোবাসা নিয়ে জন্মায় কিন্তু ভালোবাসা নিয়ে টিকে থাকতে পারে না।
লোভ, ঘৃণা, অবিশ্বাস আর স্বার্থের খপ্পরে পড়ে বহু মানুষ দেখতে হুবহু মানুষের মতোই থাকে কিন্তু আচার আচরণে, ভাষায় প্রমান দেয় তারা প্রেমহীন। মনে প্রেম নেই, তাই তাদের প্রমান দিতে হয় বলে কয়ে, কান্ডকীর্তি করে।
প্রেম দেখানোর বিষয় নয়, প্রমানেরও বিষয় নয়। প্রেম আলো ও অন্ধকারের মতো, যার বুকে থাকে সে মানুষ আলোময়, ভালোময়। যে বুকে নেই, সে শুধু অন্ধকার চেনে, অন্ধকারই ছড়ায়।
লেখক: চলচ্ছিত্র ও নাট্যশিল্পী।
