ইমতিয়াজ রাসেল
মুখোশ খুলে গেছে, নাকি আমরা সবাই আয়না ভেঙে ফেলেছি? বাংলাদেশে একটা সময় খুব জনপ্রিয় একটা পরিচয় ছিল, “আমি সুশীল”, “আমি নিরপেক্ষ”, “আমি কোনো দলের না”।
এই পরিচয়টা এতটাই আরামদায়ক ছিল যে, এর আড়ালে দাঁড়িয়ে কেউ সরকারকে ধমক দিত, আবার সুযোগ বুঝে চুপও থাকত। কেউ মানবতার কথা বলত, কিন্তু মানবতা কখন কোথায় প্রযোজ্য, সেটা নির্ধারণ করত পক্ষ বিপক্ষ দেখে এবং নিজের সুবিধামতো। এখন হঠাৎ করে সেই নিরপেক্ষতার বাজারে এখন বেশ মন্দা।
কেন? কারণ বাস্তবতা এখন অনেক বেশি নির্দয়। রাজনীতি দাঁড়িয়ে গেছে স্পষ্ট এক বিভাজনে, আওয়ামী লীগ বনাম এন্টি-আওয়ামী লীগ। মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকার যে অভিনয়টা এতদিন চলছিল, সেটার মঞ্চটাই যেন ভেঙে পড়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভাঙন কি সত্যিই “মুখোশ উন্মোচন”? নাকি আমরা নিজেরাই সবাইকে মুখোশ পরিয়ে দিয়ে এখন খুলে ফেলছি?
ধরা যাক, একজন কবি। তিনি লিখলেন “মানবতা” নিয়ে। এখন যদি তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, “আপনি কোন দলে?” তিনি যদি বলেন, “আমি মানুষের পক্ষে” তাহলে কি তিনি ভণ্ড? নাকি আমরা তাকে ভণ্ড বানাতে চাই, কারণ তিনি আমাদের ভাষায় কথা বলছেন না? একইভাবে, একজন শিক্ষক যদি বলেন, “আমি সবার জন্য” তাহলে কি তিনি আসলেই নিরপেক্ষ, নাকি কৌশলী?
সমস্যাটা আসলে এখানে, বাংলাদেশে মূলত “নিরপেক্ষতা” কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ ছিল না। অনেক সময়ই এটা ছিল, নির্বাচিত অবস্থান, ব্যক্তি স্বার্থ, যেখানে প্রতিবাদও বাছাই করে করা হয়, নীরবতাও বাছাই করে রাখা হয়।
একসময় পান থেকে চুন খসলে, চারদিকে হৈচৈ, চিৎকার আর চেঁচামেচি করা মানুষগুলো আজ বড়ই নীরব!!
খেয়াল করছেন? এক সময় লোডশেডিং মানেই ছিল জাতীয় শোক। মোমবাতির আলোয় ফেসবুক পোস্ট, আর্তনাদ, লাইভ “দেশ অন্ধকারে ডুবে গেছে!” আজও বিদ্যুৎ যায় এবং চরমভাবে যায় কিন্তু কোথাও কোন আওয়াজ নেই।
একসময় জ্বালানির দাম বৃদ্বি কিংবা কোন সংকট হলেই, রাস্তায় আগুন জ্বলত, কণ্ঠে আগুন ঝরত এবং প্রতিবাদের ঝড় তুলতো। মনে হতো দেশ এক চরম সংকটে!! আর এখন যখন মানুষ অবর্ণনীয় জ্বালানি সংকটে ভুগছে এবং চরম ভোগান্তিতে আছে। এটা সত্য আগুন জ্বলছে তবে তা শুধু মানুষের ভেতরে, বাইরে সব শান্ত, শীতল, নীরব।
মানবিক প্রশ্নে কারণে অকারণে এক সময় আকাশ কেঁপে উঠত প্রতিবাদের ঝড়ে, মানবতার ঢেউ উঠত সোশ্যাল মিডিয়ায়। আজ যখন হামে শত শিশু মারা যায়, তখন সেই আকাশ যেন শব্দ ভুলে গেছে, সব শান্ত, শীতল, নীরব ভুমিকা পালন করছে।
একজন ভণ্ড শিক্ষক, যিনি একদিন গলা ফাটিয়ে বলতেন,
“এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না” আজ তিনি চুপ। সম্ভবত এখন উপত্যকাটা বদলায়নি, শুধু তার সংজ্ঞা বদলেছে।
চারদিকে অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন, সবই আছে। শুধু নেই সেই পরিচিত কণ্ঠগুলো। যারা একদিন ন্যায়বিচারের পতাকা হাতে রাস্তায় নামতেন, তারা আজ কোথায়? নাকি ন্যায়বিচারও এখন দলীয় পরিচয় দেখে?
এই নীরবতা কাকতালীয় না, এটা হিসেবি, এটা সুবিধাবাদী।
এটা ভয় আর স্বার্থের মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত নিরাপত্তা। কারণ সত্যটা খুব অস্বস্তিকর, আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে না, আমরা শুধু আমাদের বিরুদ্ধে অন্যায় এর বিরুদ্ধে।
তাই আজ দেশের বাতাসে কোনো স্লোগান নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো কণ্ঠ নেই। আছে শুধু, একটি সুবিশাল, সুসংগঠিত, সুপরিকল্পিত নীরবতা।
এই দ্বৈততা মানুষ এখন ধরতে শিখেছে এটা ইতিবাচক।
হ্যাঁ, মুখোশ খসছে, এটা সত্য কিন্তু সেই সাথে আমরা কি সহনশীলতার মুখোশটাও খুলে ফেলছি? কারণ গণতন্ত্র শুধু পক্ষ নেওয়ার নাম না, এটা ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতারও নাম।
সবশেষে একটা প্রশ্ন থাক, আমরা কি সত্যিই ভণ্ড সুশীলদের চিনে ফেলেছি, নাকি আমরা এমন এক জায়গায় চলে যাচ্ছি যেখানে “নিরপেক্ষ” শব্দটাই অপরাধ হয়ে দাঁড়াবে?
যদি দ্বিতীয়টা সত্যি হয়, তাহলে মুখোশ খোলার উল্লাসের ভেতরেই আমরা হয়তো নতুন এক অন্ধকারের দরজা খুলে ফেলছি।
