জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আবেগকে পুঁজি করে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে নজিরবিহীন দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। মাত্র ছয়
মাসে ভিভিআইপি আপ্যায়ন ও ‘নাশতার বিল’ হিসেবে দেখানো হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ টাকার
বেশি। এর বাইরে ভুয়া টিনের বাউন্ডারি, দরপত্র ছাড়া সংস্কার এবং ভুয়া
প্রদর্শনীর নামে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বিপুল অর্থ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাদুঘর দুটির শীর্ষ কর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে এবং ‘ফারুকীর
নাশতার বিল’ নামেই পরিচিতি পাওয়া এই আপ্যায়ন–বাণিজ্যের আড়ালে প্রতিদিন লাখ
লাখ টাকা লোপাট করা হয়েছে।
দিনপ্রতি নাশতা ও আপ্যায়নের চমকে দেওয়া হিসাব জাদুঘরের নথিপত্র ঘেঁটে খরচের যে
হিসাব পাওয়া গেছে, তা সাধারণ গণিতকেও হার মানায়:
– ২৫ দিনে দৈনিক বিল ১ লাখ ১৮ হাজার: চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৫
ফেব্রুয়ারি—এই ২৫ দিনে ভিভিআইপিদের আপ্যায়ন ও
ইন্টারনেট বিলের ভ্যাট বাবদই দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৪৭৬
টাকা। ভ্যাটসহ এই ২৫ দিনের মোট বিল দাঁড়িয়েছে ২৯ লাখ ৫৪ হাজার ৭৬০ টাকা।
অর্থাৎ, এই ২৫ দিনে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ১৯০ টাকা শুধু
নাশতা ও আপ্যায়নের পেছনে ওড়ানো হয়েছে!
– ৬ মাসের গড় খরচ: গত ৬ মাসে মোট ১ কোটি ২ লাখ টাকার আপ্যায়ন বিল করা হয়েছে। ১৮০
দিন হিসাব করলে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫৬ হাজার ৬৬৬ টাকা আপ্যায়নের নামে খরচ
দেখানো হয়েছে। জাদুঘর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত ফারুকী ও তাঁর ঘনিষ্ঠ
ভিভিআইপিদের আপ্যায়ন বিল হিসেবেই এই অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
– স্বেচ্ছাসেবকদের দৈনিক খরচ ৩১ হাজার: গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে জুলাই স্মৃতি
জাদুঘরের ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবকের আপ্যায়ন খরচ দেখানো হয়েছে ৫৭ লাখ টাকা। প্রায়
৬ মাসের হিসাবে প্রতিদিন স্বেচ্ছাসেবকদের পেছনে গড়ে ৩১ হাজার ৬৬৬ টাকা ব্যয়
দেখানো হয়েছে।
– একদিনের পরিদর্শনে ৭০ হাজার: গত ৬ অক্টোবর ইসসেকো (ICESCO)-এর মহাপরিচালক ড.
সেলিম এম আল মালিকের একদিনের জাদুঘর পরিদর্শনে আপ্যায়ন বিল তোলা হয়েছে ৭০
হাজার টাকা।
– এর বাইরে ‘আড্ডা প্রবর্তনা রেস্টুরেন্ট’ নামের একটি রেস্তোরাঁতেই বিভিন্ন সভার
নামে ১০ লাখ ২৮ হাজার ৫১৫ টাকার বিল করা হয়েছে এবং বিভিন্ন কর্নার উদ্বোধনের
নামে এক দিনেই নাশতার বিল হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
প্রতিটি ছোট এসির দাম সাড়ে ৩ লাখ! জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারি সংস্কারকে
কেন্দ্র করে বড় ধরনের লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ ও ২০২৩ সালে সর্বশেষ সংস্কারের পর
দুই বছর পার না হতেই উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই ফের সংস্কারের নামে দেড় কোটি টাকার
বিল তোলা হয়েছে।
– এসির হিসাব: ১৪টি ছোট এসি লাগানোর বিল করা হয়েছে ৪৯ লাখ ৮৮ হাজার ৫২৭ টাকা। অংক
কষলে দেখা যায়, প্রতিটি ছোট এসির দাম পড়েছে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩২৩ টাকা!
– লাইটের হিসাব: শুধু লাইট লাগানোর খরচ দেখানো হয়েছে ৩৮ লাখ ২ হাজার ১৭৪ টাকা।
‘জিজিবি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাগজে-কলমে এই কাজ দেওয়া
হলেও, তাদের কার্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, জাতীয় জাদুঘরের এমন কোনো কাজই
তারা করেনি।
ভুয়া বাউন্ডারি ও গায়েবি প্রদর্শনী গণপূর্তের মাধ্যমে জুলাই জাদুঘরের জন্য আলাদা
১১১ কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় জাদুঘরের তহবিল থেকে কোটি
কোটি টাকা খরচ দেখানো হচ্ছে।
– জুলাই জাদুঘরের সড়কের পাশে টিনের বাউন্ডারি নির্মাণের কথা বলে জাতীয় জাদুঘর
থেকে ৬৪ লাখ ৩৮ হাজার ৪৭০ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। অথচ বাস্তবে সেখানে
কোনো বাউন্ডারির অস্তিত্বই নেই।
– জাতীয় জাদুঘরের শীতলপাটির ছবি সরবরাহ ও ইতিহাস বিভাগের প্রদর্শনীর নামে ৫ লাখ
৫৮ হাজার ৩৭০ টাকা বিল তোলা হয়েছে, যা আদতেই কখনো অনুষ্ঠিত হয়নি।
১৩ লাখে ‘প্যাকেজ’ চাকরি, মোট বাণিজ্য প্রায় ৭ কোটি! সম্প্রতি নির্বাচনের আগে কোনো
লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে জাদুঘরে ৫৩ জন কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফাঁস
হওয়া অডিও রেকর্ডে দেখা যায়, জাতীয় জাদুঘরের রেজিস্ট্রেশন সহকারী ও
মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ মো. সুমন মিয়া এক চাকরিপ্রত্যাশীর
কাছে ১৩ লাখ টাকা দাবি করে বলছেন, ‘১৩ টাকায় (লাখ) দিয়ে দিতে পারব… টোটাল
প্যাকেজ।’ হিসাব অনুযায়ী, ৫৩ জনের কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা করে নেওয়া হলে এই নিয়োগ
বাণিজ্যের আকার দাঁড়ায় ৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সুমন মিয়া তাঁর নিজ জেলায় আপন
ছোটবোন তাসলিমা আক্তারকেও নিয়োগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সুমন মিয়া এসব
অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে ‘ছোট কর্মচারী’ বলে দাবি করেন।
অধরা মহাপরিচালক ও নিশ্চুপ কর্তৃপক্ষ এর আগে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কাজ দেওয়ার
সিদ্ধান্তে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) যে
দুর্নীতির আশঙ্কা করেছিল, তা-ই এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। যুগ্ম সচিব
পদমর্যাদার না হয়েও ক্ষমতার দাপটে জাতীয় জাদুঘর ও জুলাই স্মৃতি
জাদুঘরের মহাপরিচালকের চেয়ারে বসা তানজীম ইবনে ওহাবের বক্তব্য জানতে দপ্তরে
ও মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে এসব লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত কোনো সদুত্তর মেলেনি।
ফারুকীর নেতৃত্বে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের নামে এই ভয়াবহ অর্থ লোপাটের ঘটনায়
কর্তৃপক্ষের এমন নিশ্চুপ অবস্থান পুরো জাদুঘরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে চরম
প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।(আজকের কণ্ঠ)
