মহান মে দিবসে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিশ্চিতে বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনার অবদান এবং বর্তমান শ্রমবাজারের অস্থিরতা নিয়ে একটি বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন।
আজ মহান মে দিবস। দুনিয়ার মজদুর এক হও—এই স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতিবছর ১ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস। বাংলাদেশে এই দিবসের তাৎপর্য এবং শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি রাজনৈতিক দলের নাম অগ্রভাগে চলে আসে, আর তা হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে জননেত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত, মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে এই দলের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বঙ্গবন্ধু ও মেহনতি মানুষের স্বপ্ন: একটি শোষণহীন সমাজের ভিত্তি
১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কৃষক ও শ্রমিক।
১৯৭২ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই তিনি কৃষকদের দুঃখ লাঘবে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন।
শুধু তাই নয়, তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে বিশাল অংকের অর্থাৎ ৭০ কোটি টাকার কৃষি ঋণ মাফ করে দিয়ে তিনি মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে আবির্ভূত হন।
বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, শ্রমিকরাই হলো দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়:
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর সদস্যপদ লাভ করে।
ঢাকায় আইএলও-এর আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপিত হয়।
শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’কে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল শোষণমুক্ত সমাজ।
শ্রমিকদের জন্য ১০-স্তরবিশিষ্ট বেতন কাঠামো প্রবর্তন করা হয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য আবারো অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যায়।
শেখ হাসিনার নেতৃত্ব: আধুনিক শ্রমবাজার ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ১৯৯৬ এবং পরবর্তীতে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ শুরু করেন। বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের শ্রম খাত এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।
১. পোশাক খাতের আমূল পরিবর্তন
তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত করতে আওয়ামী লীগ সরকার ন্যূনতম মজুরি কয়েক দফায় বৃদ্ধি করে।
সর্বশেষ তা ৮,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১২,৫০০ টাকায় উন্নীত করা হয়।
কর্মস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইএলও-এর সাথে মিলে ‘ত্রিপক্ষীয় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’ গ্রহণ করা হয়,
যা রানা প্লাজা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কারখানাগুলোকে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ কর্মস্থলে পরিণত করেছে।
২. আইনি সুরক্ষা ও নীতিমালা প্রণয়ন
শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা দিতে আওয়ামী লীগ সরকার বাস্তবায়ন করেছে:
বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫
জাতীয় শ্রমনীতি ২০১২ ও জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন: এই তহবিলের মাধ্যমে শ্রমিক ও তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
বর্তমান শ্রমবাজারের অস্থিরতা: এক অন্ধকার চিত্র
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের শ্রমবাজারে এক চরম অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তথাকথিত মব হামলা এবং দখলদারিত্বের কারণে দেশের শত শত শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
এর ফলে প্রায় ২ লক্ষাধিক মানুষ নতুন করে কর্মহীন হয়ে পড়েছে।
বর্তমান সরকারের আমলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হলেও সেই অনুপাতে আয় বাড়েনি।
বরং আওয়ামী লীগ সরকারের চালু করা ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা, যার মাধ্যমে ১ কোটি পরিবার স্বল্পমূল্যে পণ্য পেত, তা বর্তমানে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে:
দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ২৭.৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়ে ৪.৬৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
সাধারণ মানুষের আহাজারি ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার একজন পোশাক শ্রমিক রহিম উদ্দিন বলেন,
“আগে অন্তত জানতাম মাসে কত টাকা আসবে এবং ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে সস্তায় চাল-ডাল কিনতে পারতাম। এখন কার্ডও নেই, আর কারখানাও কখন বন্ধ হয় সেই আতঙ্কে থাকি।”
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকারের কাছে শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নেই।
বাজেট থেকে অর্থ সরণ এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।
মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষা এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে আওয়ামী লীগের যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল, তার অভাব আজ প্রতিটি স্তরে অনুভূত হচ্ছে।
শ্রমিক অধিকার শুধু কাগুজে কলমে নয়, বরং রাজপথের সংগ্রাম ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবেই মেহনতি মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলে এসেছে। আজকের এই দিনে দেশের আপামর শ্রমিক শ্রেণির প্রত্যাশা, আবারও ফিরে আসুক সেই স্থিতিশীলতা এবং নিশ্চিত হোক তাদের ন্যায্য অধিকার। শ্রমিকের মুক্তি নিশ্চিত করতে হলে জনবান্ধব ও উন্নয়নমুখী নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।
