ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে ঘিরে তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির গোপন অভিযান। জুবায়েদ জিম নামক এক ‘এজেন্ট’ ও বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পড়ুন বিস্তারিত।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | নিউ দিল্লি পোস্ট অনুসরণে ৩০ এপ্রিল, ২০২৬;
বর্তমানে ভারতে আশ্রিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে একটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ‘কিলার মিশন’ বা হত্যার নীল নকশা কার্যকর করার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একাধিক আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে নিউ দিল্লি পোস্টে প্রকাশিত এম এ হোসেনের একটি নিবন্ধে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তুরস্কের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা ‘ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন’ (MIT) এই অভিযানের নেপথ্যে কাজ করছে এবং ভারত-বাংলাদেশের এক বিশেষ চক্র এই অশুভ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত।
জুবায়েদ জিম: ছদ্মবেশী এজেন্টের ‘প্রটোকল’ রহস্য
এই রহস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মো. জুবায়েদ জিম নামে এক বাংলাদেশি নাগরিক।
অভিযোগ অনুযায়ী, জিম নিজেকে শেখ হাসিনার ‘প্রটোকল অফিসার’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
নিজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর বা এনএসআই (NSI) পরিচালক হিসেবে জাহির করলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি ছাত্রাবস্থায় নৌবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।
ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও অবৈধভাবে ভারতে অবস্থানকারী এই ব্যক্তি এখন ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (NIA)-র রাডারে রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, জিম মূলত তুরস্কের এমআইটি-র নির্দেশে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং তাঁর বর্তমান অবস্থান সংক্রান্ত স্পর্শকাতর তথ্য পাচার করছেন।
তুরস্ক কানেকশন ও পারিবারিক যোগসূত্র
তদন্তকারী সূত্রগুলো দাবি করছে, জিমের সাথে তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে।
গত বছর জিমের স্ত্রী একাধিকবার তুরস্ক ভ্রমণ করেন, যেখানে এমআইটি-র কর্মকর্তাদের সাথে তাঁর বৈঠক হয়।
এরপর থেকেই জিম হাসিনার নিরাপত্তাকে বিপন্ন করার একটি সুগভীর মিশনে অবতীর্ণ হন।
এই মিশনের একটি বড় উদ্দেশ্য হলো—হাসিনার কোনো ক্ষতি হলে তার দায়ভার ভারতের ওপর চাপিয়ে দিয়ে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটানো।
ইউনূস ও চীনা প্রযুক্তি সংস্থার যোগসাজশ?
এম এ হোসেনের নিবন্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরেও।
দাবি করা হয়েছে, একটি চীনা প্রযুক্তি কোম্পানির সাথে কয়েক মিলিয়ন ডলারের চুক্তির মধ্যস্থতায় জিমকে ব্যবহার করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, হাসিনার জনভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে ড. ইউনূস ও জিম সমন্বিতভাবে প্রচারণায় লিপ্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাইবার ফিশিং ও প্রবাসী নিপীড়নের অভিযোগ
জুবায়েদ জিমের বিরুদ্ধে কেবল তথ্য পাচার নয়, বরং ডিজিটাল অপরাধের অভিযোগও রয়েছে।
তিনি ‘ওয়াইজ-গভ’ (Wise-Gov) নামে একটি থিঙ্কট্যাঙ্ক প্ল্যাটফর্ম চালু করার চেষ্টা করছেন, যা মূলত সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে একটি ‘ফিশিং মেকানিজম’।
এর মাধ্যমে তিনি ভিজিটরদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছেন।
এছাড়া নরওয়ে, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় এবং মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে তাদের মধ্যে দলীয় কোন্দল সৃষ্টির অভিযোগও জিমের বিরুদ্ধে দীর্ঘ হচ্ছে।
সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সম্মানহানির লক্ষ্যে একজন আফ্রিকান নারীর ছবি ব্যবহার করে অপপ্রচারের পেছনেও এই জিম জড়িত বলে জানা গেছে।
“এটি কেবল একজন পলাতক মানুষের গল্প নয়; বরং তুরস্কের গোয়েন্দা পদচিহ্ন, পাকিস্তানের কৌশলগত প্রক্সি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক বিষাক্ত সংমিশ্রণ।”
তুরস্ক-পাকিস্তান আদর্শিক ত্রিভুজ
নিবন্ধটিতে দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান মিত্রতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
গত এক দশকে তুরস্ক পাকিস্তানের সাথে রাজনৈতিক মিত্রতা ও ইসলামপন্থী নেটওয়ার্কগুলোর সাথে যোগসূত্র বাড়িয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
পাকিস্তানের আইএসআই (ISI) দীর্ঘকাল ধরেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করতে বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের চেষ্টা করে আসছে।
এখন তুরস্কের এমআইটি সেই সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ভারতের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ
ভারতের এনআইএ (NIA) বর্তমানে জিমকে ধরার চেষ্টা করছে। ভারতের জন্য এটি একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ; কারণ নাগরিক সমাজ এবং প্রবাসী নেটওয়ার্কগুলোকে ব্যবহার করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন ছায়াযুদ্ধ শুরু করেছে। ‘ইন্ডিয়ালগ ফাউন্ডেশন’-এর মতো সংস্থাগুলোর ওপর নজরদারির ঘটনা প্রমাণ করে যে, বিদেশি এজেন্সিগুলো ভারতের গণতান্ত্রিক উন্মুক্ততাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
এটি কেবল শুরু
শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে যে ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
এটি একটি সুপরিকল্পিত প্যাটার্ন। তুরস্কের গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং পাকিস্তানের প্রক্সি কৌশল একত্রিত হয়ে বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।
জুবায়েদ জিমের মতো ব্যক্তিরা এই বিশাল যন্ত্রের ছোট একটি নাটবল্টু মাত্র। এনআইএ-র এই তদন্তের ফলাফল দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সম্পাদকীয় নোট: এই বিশেষ প্রতিবেদনটি নিউ দিল্লি পোস্টে প্রকাশিত নিবন্ধের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি।
