ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ব্রেক্সিট-পরবর্তী আগতদের ক্ষেত্রেও নতুন অভিবাসন নীতি প্রযোজ্য হবে।
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে নতুন যে পরিকল্পনা নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার, তাতে নাগরিকত্ব না পাওয়া পর্যন্ত অভিবাসীরা কোনো কল্যাণভাতা দাবি করতে পারবেন না।
বর্তমানে অভিবাসীরা পাঁচ বছর পর ‘সেটেলড স্ট্যাটাস’ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুবিধা দাবি করতে পারেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, অভিবাসীদের ‘সেটেলড স্ট্যাটাস’ পেতে ৩০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এরপর সুবিধা দাবি করতে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হবে, যা পেতে আরো এক থেকে তিন বছর লেগে যাবে।
টেলিগ্রাফ লিখেছে, এ পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হল, যখন সুবিধাভোগী অভিবাসীর সংখ্যা রেকর্ড ১৩ লাখে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬.৭ শতাংশ বেশি এবং ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
২০২৪-২৫ সালে মোট কল্যাণ ব্যয়ের পরিমাণ যেখানে ৩১৩ বিলিয়ন পাউন্ড ছিল, তা দশক শেষে ৩৭৩ বিলিয়নে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ঘাটতিও ক্রমশ বাড়ছে।
লেবার পার্টি কল্যাণ ব্যয়ের লাগাম টানতে হোঁচট খাচ্ছে। কারণ নিজেদের সংসদ সদস্যদের প্রতিরোধের মুখে কিয়ার স্টারমার এ বছরের শুরুতে প্রতিবন্ধী সুবিধা সংক্রান্ত প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো শিথিল করতে বাধ্য হন।
কিন্তু কল্যাণ সুবিধা দাবিকারী নিম্ন দক্ষতার চাকরিতে নিয়োজিত বিদেশি কর্মীদের এখন স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি পেতে ২৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
একইভাবে অবৈধ অভিবাসীদের ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি পেতে ৩০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
হোম সেক্রেটারি শাবানা মাহমুদ বলেন, “অভিবাসন সবসময়ই ব্রিটেনের গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটেনে আসার মাত্রা নজিরবিহীন। এই দেশে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করা কোনো অধিকার নয়, বরং একটি বিশেষ সুবিধা এবং তা অর্জন করতে হবে।
“আমি একটি বিকল অভিবাসন ব্যবস্থাকে বদলে এমন একটি ব্যবস্থা দাঁড় করাচ্ছি যা অবদান, অন্তর্ভুক্তি এবং ব্রিটিশ ন্যায়পরায়ণতার প্রতি শ্রদ্ধাকে অগ্রাধিকার দেবে।”
বর্তমানে পাঁচ বছর বসবাসের পর যুক্তরাজ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থায়ী হওয়ার যে নিয়ম রয়েছে তা তিনি বাতিল করেছেন।
এর বদলে ১০ বছরের মৌলিক যোগ্যতা অর্জনের মেয়াদ ঠিক করছেন, যা অভিবাসীর কাজ, আয়, সমাজে অবদান এবং উচ্চমানের ইংরেজি দক্ষতার ভিত্তিতে বাড়তে বা কমতে পারে।
টেলিগ্রাফ লিখেছে, এই নিয়ম কেবল নতুন আগতদের জন্যই প্রযোজ্য হবে না, বরং ১৬ লাখ দক্ষ ফ্রন্টলাইন কর্মীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
ডাক্তার, নার্স, শিক্ষক, উদ্যোক্তা ও উচ্চ-আয়কারী ব্যক্তিরা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি (আইএলআর) পেতে পারেন মাত্র পাঁচ বছরে, আর শীর্ষ করদাতারা তিন বছরেও পেতে পারেন।
বর্তমানে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি (আইএলআর) প্রাপ্ত অভিবাসীরা ইউনিভার্সাল ক্রেডিটের মত কল্যাণ সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে আবাসন মন্ত্রণালয়ের ‘ন্যায়সঙ্গত বসবাসের পথ’ শীর্ষক নীতি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “যাদের স্থায়ী মর্যাদা (সেটেল্ড স্ট্যাটাস) রয়েছে, তাদের এসব সুবিধা পাওয়া উচিত নয়।”
সেখানে বলা হয়েছে, নতুন অভিবাসীরা সেটেলমেন্ট পাওয়ার পরেও পূর্ববর্তী ভিসার শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সুবিধাগুলো পাবেন না। সুবিধা পাওয়ার মানদণ্ড সেটেলমেন্ট নয়, হবে নাগরিকত্ব।
সবসময়ই ৬ থেকে ৮ লাখ বিদেশি নাগরিক স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন, যাদের বেশিরভাগই তিন বছরের মধ্যে নাগরিকত্ব পান। তবে নীতি প্রস্তাবে সতর্ক করা হয়েছে, ‘বরিসওয়েভের’ কারণে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২২ লাখ মানুষ ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে’ আইএলআর পেতে পারে; ফলে এই সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বুধবার টেলিগ্রাফ জেনেছে, রোজ প্রায় ৫০০ অভিবাসী ইউনিভার্সাল ক্রেডিটের জন্য নিবন্ধন করছেন, যার ফলে মোট সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১২.৭ লাখ, যা ২০২২ সালের স্প্রিংয়ে ছিল ৮.৮৩ লাখ।
নতুন অভিবাসীদের সুবিধা দাবির এ ঢেউ মোকাবেলায় নীতি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, তখনই কেবল স্থায়ী বসবাসের অনুমতি দেওয়া উচিত, যদি তারা সরকারি সুবিধা নির্ভর না হোন।
স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে অভিবাসীদের অন্তত চারটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: কমপক্ষে তিন বছর কাজের অভিজ্ঞতা; কর, সারচার্জ বা ভিসা ফি–সংক্রান্ত কোনো বকেয়া না থাকা; এ লেভেল সমমানের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং অপরাধ প্রশ্নে পরিচ্ছন্ন থাকা।
২০২১ সাল থেকে দেশটি ছেড়েছে যত মানুষ, তার তুলনায় ২৬ লাখ বেশি মানুষ এসেছেন। এর অর্থ ব্রিটেনে প্রতি ৩০ জনের মধ্যে একজন এসেছেন গত চার বছরের মধ্যে।
টেলিগ্রাফ লিখেছে, সোমবার আশ্রয় নীতি সংস্কারের পর বৃহস্পতিবার বৈধ অভিবাসন নিয়ে মাহমুদের কঠোর পদক্ষেপ আসে, যেখানে শরণার্থীদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রিটেনে থাকার অধিকারের ইতি টানা হয়েছে এবং স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে ২০ বছর অপেক্ষার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
লেবার পার্টি যখন নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকের ভোটব্যাংক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই অভিবাসন নীতিতে সরকারের এই কঠোর রেখা এসেছে।
এই শরতে ফারাজ ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি শত-সহস্র নন-ইইউ আইএলআরধারীদের স্ট্যাটাস বাতিল করবেন এবং কঠোর মানদণ্ডের অধীনে পুনরায় ভিসার জন্য আবেদন করতে তাদের বাধ্য করবেন।
মাহমুদ বলেছেন, যারা ইতিমধ্যেই সেটেলমেন্ট পেয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে তার পরিবর্তিত নিয়ম প্রযোজ্য হবে না । ব্রিটিশ ন্যাশনাল (ওভারসিজ) ভিসাধারী হংকংবাসী ও ব্রিটিশ নাগরিকদের বিদেশি স্বামী/স্ত্রী বা সন্তানরা বদলে যাওয়া নীতির আওতায় পড়বে না।
‘বরিসওয়েভ’-এর সময় ২০২২ থেকে গত বছর পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা ভিসায় আসা ৬ লাখ ১৬ হাজার জন এবং তাদের নির্ভরশীলদের সেটেলমেন্টের জন্য ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে। অপব্যবহারের কারণে সামাজিক সেবা কর্মসূচিটি এ বছর বন্ধ করা হয়েছে।
টেলিগ্রাফ লিখেছে, সেটেলমেন্টের সময় ২৫ বছর পর্যন্ত বাড়তে পারে, কারণ ব্রিটেনে অবস্থানের সময় যদি তারা ১২ মাসের বেশি সুবিধা নিয়ে থাকে তবে অতিরিক্ত ১০ বছরের শাস্তি এবং কম নিলে ৫ বছরের শাস্তি যোগ হবে।
ছোট নৌকায় আগত বা ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর অবৈধভাবে থাকা অভিবাসীদের মূল ১০ বছরের সঙ্গে আরও ২০ বছর যোগ হবে।
মন্ত্রণালয়ের নথিতে বলা হয়েছে, অবৈধ প্রবেশকারী বা পর্যটক হিসেবে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে এই বাড়তি যোগ্যতার সময় প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ অবৈধভাবে প্রবেশকারী কারও ক্ষেত্রে সেটেলমেন্টের পথ ৩০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।
একজন বিদেশি কর্মী যদি আবেদন করার আগের তিন বছর বছরে অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার ১৪০ পাউন্ড আয় করে, তবে তাদের বেসলাইনের ১০ বছরের অপেক্ষার সময়সীমা সাত বছর কমে যাবে। ফলে তারা মাত্র তিন বছর পরেই স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাবে। বিজ্ঞান, প্রকৌশল বা শিল্প ক্ষেত্রে ‘গ্লোবাল ট্যালেন্ট’ ভিসাধারী বিদেশি নাগরিক বা উদ্ভাবনী ব্যবসার প্রতিষ্ঠারাও তিন বছরেই আইএলআর পাবেন।
যেসব উচ্চ হারের করদাতা তিন বছর ধরে বছরে ৫০ হাজার ২৭০ পাউন্ড আয় করেন, তাদের পাঁচ বছর কাটা যাবে। একই সুবিধা প্রযোজ্য হবে সরকারি পেশাজীবীদের জন্যও; যেমন ডাক্তার, শিক্ষক ও নার্স, যারা আবেদনের আগে পাঁচ বছর যুক্তরাজ্যে কাজ করেছেন।
স্থানীয় সম্প্রদায়ে স্বেচ্ছাসেবী ও দাতব্য কাজের জন্য অভিবাসীরা তিন থেকে পাঁচ বছর ছাড় পেতে পারেন, যদিও এই সংজ্ঞা ঠিক কীভাবে নির্ধারণ করা হবে তা সরকার ঠিক করে দেবে।
