দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, নোয়াখালীতে একটি গ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠানে মাইক বাজানোর অভিযোগে কনের বাবা-মাকে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করে তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে উগ্রবাদীরা। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী ধর্মীয় গোষ্ঠী সম্পূর্ণ এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে এমন অবৈধ শাস্তি কার্যকর করেছে বলে জানান স্থানীয়রা।
শুধু এই ঘটনা নয়; এটি এখন বাংলাদেশে সঙ্গীত ও সংস্কৃতির উপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণের সর্বশেষ সংযোজন।
গত তিন মাসে যা ঘটেছে, তা যেন একের পর এক ধাপে সঙ্গীতকে নিষিদ্ধ করার নীরব অভিযান:
সেপ্টেম্বরে দেশব্যাপি প্রাথমিক স্কুলে সঙ্গীত শিক্ষক নিয়োগ বাতিল হয় ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠির হুমকিতে। বাতিলের পেছনে কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল: “ধর্মীয় সংবেদনশীলতা”।
অক্টোবরে সিলেটে দুই বাউল শিল্পীর ওপর হামলা চালানো হয়। একজনের বাঁশি ভেঙে দেওয়া হয়, অন্যজনকে মারধর করে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়।
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রামে শীর্ষস্থানীয় একটি কনসার্ট ভেন্যুতে হুমকির মুখে একের পর এক কনসার্ট বাতিল। সর্বশেষ বাতিল হয়েছে আর্টসেল, এলআরবি ও নেমেসিসের যৌথ কনসার্ট। একই সময়ে কক্সবাজারে একটি হোটেলে চলছিল স্থানীয় ব্যান্ডের লাইভ পারফরম্যান্স; হঠাৎ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় এবং শিল্পীদের হুমকি দিয়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়।
মানিকগঞ্জে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বাউল শিল্পিকে গ্রেপ্তার তো করা হয়েছেই, সেই ঘটনার সূত্রে উগ্রবাদী ধর্মীয়গোষ্ঠি ঠাকুরগাঁও, মানিকগঞ্জে বাউলদের পিটিয়ে এলাকাছাড়া করেছে।
এই ঘটনাগুলো যখন একসঙ্গে দেখা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—একি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনার অংশ?
সাংস্কৃতিক কর্মী ও গবেষক ড. সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেন, “যেভাবে সঙ্গীতের ওপর আঘাত আসছে, তা শুধু বিনোদনের বিরুদ্ধে নয়; এটা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপরেও আঘাত। বাউল, লালন, রবীন্দ্রসঙ্গীত, ব্যান্ড মিউজিক—এসবই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ। এগুলোকে যদি একে একে নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি?”
সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট বক্তব্য আসেনি। লালন উৎসব আয়োজনকে ইউনূস প্রসাশন তাদের অবস্থান হিসাবে প্রচার করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। কিন্তু স্থানীয়ভাবে যারা এসব করছে, তাদের অনেকের সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনের কিছু অংশের সখ্য রয়েছে—এটাই সমস্যা।”
গত এক দশকে বাংলাদেশে ব্লগার-লেখক হত্যা, মন্দিরে হামলা, মাজার খানকা শরীফ ও সুফীদের ওপর এবং আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণের পর এবার সঙ্গীত ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত—এই ধারাবাহিকতা দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দেশ কি ধীরে ধীরে সেই পথে হাঁটছে, যে পথে একসময় গিয়েছিল আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের কিছু অংশ?
বাউল শিল্পী শফি মন্ডল, যিনি সম্প্রতি হামলার শিকার হয়েছেন, বলেন, “লালন বলেছিলেন—‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। আজ যারা গান বন্ধ করতে চায়, তারা কি মানুষের চেয়েও বড় কিছু হয়ে গেছে?”
প্রশ্ন থেকে যায়— আমাদের সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা কোথায়? বিয়ের অনুষ্ঠানে মাইক বাজানো যদি অপরাধ হয়, স্কুলে গান শেখানো যদি নিষিদ্ধ হয়, বাউলের একতারা যদি ভেঙে ফেলা হয়, তাহলে আর কতদিন লাগবে বাংলাদেশকে ‘মৌলবাদী রাষ্ট্র’ বলে ডাকতে?
এই নীরবতা যদি না ভাঙে, তাহলে হয়তো খুব শিগগিরই আমাদের জাতীয় সঙ্গীতটিও কেউ ‘অনুমতি’ ছাড়া বাজাতে পারবে না।
