শরিফুল হাসান
“এই যে আমাদের দেশটার নাম বাংলাদেশ, পূর্ব পাকিস্তান থেকে কবে কীভাবে বাংলাদেশ হলো জানেন? শুনুন তবে, ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আজকের দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’ চূড়ান্ত করে বলেছিলেন, একটা সময় এই ভুখন্ড ও এই মানচিত্র থেকে বাংলা শব্দটি মুছে ফেলার অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। অবস্থা এখন এমন যে এক বঙ্গোপসাগর ছাড়া বাংলা শব্দটি আর কোথাও নেই। আমি পাকিস্তানের মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ ঘোষনা দিলাম এই দেশের নাম এখন থেকে বাংলাদেশ, আর পূর্ব পাকিস্তান নয়।’
ইতিহাস বলে ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে ওই স্মরণসভায় ‘বাংলাদেশ’ নামটি চূড়ান্ত করে বঙ্গবন্ধু এই কথাগুলো বলেছিলেন। পরদিন ৬ ডিসেম্বর বিভিন্ন পত্রিকায় ‘বাংলাদেশ’ নামকরণের খবর ছাপা হয় এবং আতাউর রহমান খান পাকিস্তান অবজার্ভার-এ বঙ্গবন্ধুর এই নামকরণের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেয়।
এছাড়া ন্যাপের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা ভাসানী ৭ ডিসেম্বর প্রকাশ্য জনসভায় পূর্ব পাকিস্তানের পুনঃনামকরণ সমর্থন করে বলেন, ‘ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ নামকরণই হবে সঠিক এবং যথার্থ। তিনিও যুক্তি দেন যে, যেহেতু এক ইউনিট ভেঙে গেছে, তাই বাংলাদেশ নামটি পুনরুজ্জীবিত হওয়া উচিত।’ সেই থেকে নথিপত্রতে পূর্ব-পাকিস্তান লেখা হলেও মুখে কেউ পূর্ব-পাকিস্তান উচ্চারণ করতেন না। সবাই বলতেন বাংলাদেশ।
১৯৬৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার তৎকালীন মার্কিন কনস্যুলেট ওয়াশিংটনকে একটি এয়ারগ্রাম বার্তায় জানায়, শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান প্রমুখ বাঙালি রাজনীতিক সমস্বরে ‘বাংলাদেশ’ নামকরণের দাবি তুলেছেন।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা ঘোষণায়ও ‘বাংলাদেশ’ নামটি ব্যবহৃত হয়। বঙ্গবন্ধুর ইপিআর-এর বেতার বার্তা এবং পরবর্তীতে কালুরঘাট থেকে প্রচারিত স্বাধীনতার ঘোষণায়ও স্বাধীন দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’ উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতার যে ঘোষণা প্রচার করে, তাতেও বলা হয় এই দেশটির নাম হলো ‘বাংলাদেশ’। দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর যখন প্রথম সংবিধান প্রণীত ও গৃহীত হয় সেই সময়ও সাংবিধানিক নাম দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ’।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সরকারের শাসনের নানা ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা হতেই পারে এবং এটাই স্বাভাবিক কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর বঙ্গবন্ধু শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত যা কখনো মোছা যাবে না। ওই যে বঙ্গবন্ধু দেশের নাম দিলেন বাংলাদেশ এরপর মুক্তিযুদ্ধ, লাখো মানুষের ত্যাগ আর গত ৫৪ বছরে নানা সময়ে নানা মানুষের অবদান, ত্যাগ তিতিক্ষায় এই যে দেশ, যতোদিন এই পৃথিবী থাকবে, ততোদিন মাথা উঁচু করে থাকবে বাংলাদেশ!”
