প্রিসেট৭১
“নিহত বুদ্ধিজীবীরা সংখ্যায় কত তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, এটা ‘জামায়াত থাগস’রা ঘটিয়েছে। এটা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘কনাইভেন্স’ বা তাদের সম্মতিতে এটা ঘটেছে। এই ঘটনা অবাঙালিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণতা এবং যুদ্ধাপরাধের দাবি তুলতে পারে।’
ঢাকার মার্কিন কনসাল হার্বার্ট ডি স্পিভাক ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে পাঠানো একটি তারবার্তায় এই তথ্য পাঠান। ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর রাতে অপারেশন সার্চলাইটের শুরুতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ড শুরু করে। সেই রাতে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পাশাপাশি কমপক্ষে ৮ জন শিক্ষককে হত্যা করে। এসময় ঢাকায় মার্কিন কনসাল ছিলেন আর্চার ব্লাড।তিনি তাঁর বিখ্যাত টেলিগ্রামে ২৫ মার্চে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। পরে আর্চার ব্লাডের স্থলাভিষিক্ত হন স্পিভাক।
৪ এপ্রিল তারিখেই জামায়াতের ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান গোলাম আজম, সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সাথে বৈঠক করেন। মে মাসে খুলনার খানজাহান আলী রোডে একটি আনসার ক্যাম্পে জামায়াতে ইসলামীর ৯৬ জন কর্মীর সমন্বয়ে দলটির পূর্ব পাকিস্তান শাখার সহকারী আমির মাওলানা এ কে এম ইউসুফ প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করেন। পরবর্তীকালে দেশের অন্যান্য অংশেও রাজাকার বাহিনী গড়ে তোলা হয়।
১ জুন জেনারেল টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অরডিন্যান্স ১৯৭১ জারি করে আনসার বাহিনীকে রাজাকার বাহিনীতে রূপান্তরিত করেন। তবে এর নেতৃত্ব থাকে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের হাতে। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামী তাদের ছাত্রসংগঠনের সদস্যদের নিয়ে আলবদর এবং বিহারীদের নিয়ে আল শামস নামে দুটি মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানীদের সমর্থনে।
মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডের চুড়ান্ত ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে ১৫ নভেম্বর থেকে। এদিন সকালে ধানমণ্ডির হাতিরপুলের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বাসার সামনে থেকে আলবদরেরা তুলে নিয়ে যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী শল্যচিকিৎসক ডা. আজহারুল হক ও শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ডা. হুমায়ুন কবীরকে। ১০ ডিসেম্বর আলবদররা তুলে নিয়ে যায় প্রথিতযশা সাংবাদিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী সিরাজুদ্দিন হোসেনকে। এরপর ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর আরো অগনিত বুদ্ধিজীবিদের। এসময় কতোজনকে বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করে আলবদররা?
এ বিষয়েও তথ্য রয়েছে স্পিভাকের বার্তায়। ১৯৭২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তারিখের তারবার্তায় তিনি জানান- যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছে। অন্যান্য বড় শহর থেকেও একই ধরনের খবর এসেছে, তবে তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তালিকার সবাই বাঙালি কিন্তু সাধারণভাবে তাঁরা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়। তাঁদের অধিকাংশই ১১ ডিসেম্বরের রাত এবং ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে তাঁদের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রায়ই উর্দি পরিহিত সামরিক জওয়ানদের পরিহিত থেকে সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাঁদের আটক করে। সংবাদপত্র, কনস্যুলেটের স্থানীয় স্টাফ এবং আমেরিকান সংবাদদাতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার উত্তর-পশ্চিমাংশের একটি ইট কারখানায় তাঁদের অধিকাংশকে হত্যা করা হয়। মার্কিন সাংবাদিকেরা প্রায় ২০টি লাশ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাঁরা বলেছেন, মৃত্যুর আগে তাঁদের ওপর নির্যাতন চলেছে। ইউসিসের স্থানীয় জ্যেষ্ঠ স্টাফদের রিপোর্ট করেছেন যে ইতিপূর্বে গণনায় ধরা হয়নি এমন অনেক নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীকে মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পে অন্তরীণ রাখা হয়েছিল এবং তাঁদের হত্যা করা হয়।
নির্দিষ্টভাবে আলবদরই যে এর নেতৃত্ব দিয়েছে সে বিষয়ে মার্কিন কুটনৈতিক দলিলের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের গবেষকদের গবেষনাও উঠে এসেছে। এঁদের একজন অধ্যাপক ড. সাইদ ভালি রেজা, যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রাক্তন ডিন। তাঁর লেখা- ‘দ্য ভ্যানগার্ড অব দি ইসলামিক রেভল্যুশন: দ্য জামায়াত-ই-ইসলামি’ বইয়ের ৬৬ পৃষ্ঠায় তিনি জামায়াতের অঙ্গসংগঠন ইসলামি জমিয়তে তুলাবা (আইজেটি)র সঙ্গে আলবদরের সম্পর্ক এবং তাদের দ্বারা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছেন। এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁর এই বইয়ে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নাম আছে। তিনি লিখেছেন- “আইজেটি পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর বিদ্রোহ দমন অভিযোনে যোগ দেয়। সেনাবাহিনীর সাহায্যে আইজেটি দুটি আধা সামরিক বাহিনীর ইউনিট সংগঠিত করে। আর তা হলো আলবদর ও আলশামস। তাদের কাজ ছিল বাঙালি গেরিলাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা।
অধিকাংশ আলবদর নেওয়া হয়েছিল আইজেটি সদস্যদের মধ্য থেকে, যারা পূর্ব পাকিস্তানে মুহাজির সম্প্রদায়ের প্রতি সমর্থন জুগিয়েছিল। আইজেটির নাজিম-ই-আলা মতিউর রহমান নিজামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলবদর ও আলশামস সংগঠিত করেন।”
বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডের দায় মুক্তিবাহিনীর উপর চাপিয়ে দেয়ার একটি চেষ্টা সম্ভবতঃ শুরু হয়ে গিয়েছিলো ১৬ ডিসেম্বরের পরপরই। কিন্তু ২৩ ডিসেম্বর তারিখে পাঠানো তার বার্তায় স্পিভাক ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দেনঃ
(১) আমাদের জানামতে, ১৪-১৫ ডিসেম্বরে হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওই সময়ে পাকিস্তানি আর্মির নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং কারফিউ পুরোপুরি কার্যকর ছিল। (২) ওই সময়ে মুক্তিবাহিনীর সক্রিয় থাকার ব্যাপারে সামান্যই সাক্ষ্য প্রমাণ রয়েছে। (৩) নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো, তাঁদের কেউ ‘কোলাবরেটর’ ছিলেন না। বরং তাঁদের অধিকাংশই বাঙালি জাতীয়তাবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
স্পিভাক আটজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবির নাম উল্লেখ করেন। তাঁরা হলেন: অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক এম এফ রাব্বী, শহীদুল্লা কায়সার, সিরাজুদ্দীন হোসেন, এস এ মান্নান, নিজামউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক এ খায়ের ও ড. আলীম চৌধুরী।
[“মার্কিন দলিলপত্রের সাক্ষ্য: কেন বুদ্ধিজীবী হত্যা? কীভাবে জামায়াত জড়িত?” -প্রয়াত সাংবাদিক ও গবেষক মিজানুর রহমান খানের লেখা থেকে তথ্যসমুহ সংগৃহীত]
