সিলেট শহর থেকে উত্তর দিকে গোয়াইনঘাটের আলীরগ্রাম। গোয়াইনঘাট পাকিস্তান আর্মি দখল করে নেয় ১মে ১৯৭১। গোয়াইন নদীর পূর্বপাড়ে পূর্ণানগর গ্রামে আজির উদ্দিনের বাড়িতে পাকিস্তান আর্মি হেডকোয়ার্টার স্থাপন করে। পাশাপাশি রাধানগর গ্রামে আরেকটি শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করে। এই দুই জায়গায় অবস্থান নিয়ে আশেপাশের গ্রামগুলোতে শুরু করে অপারেশন। হত্যা এবং নারী নির্যাতন।
এই ধারাবাহিকতায় রাজাকারদের সাথে নিয়ে এসে একদিন পৌঁছায় আলীর গ্রামে। এই গ্রামের মানুষেরা ‘৭০ এর নির্বাচনে একচেটিয়া আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। এই অপরাধে গ্রাম-হানা।
বেশ কয়েকজন নারী নিজেদের বাড়িতেই ধর্ষিত হন। আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়েন আওয়ামী লীগ কর্মী গুলেজা বেগম ও তাঁর মেয়ে কোকিলা বেগম। প্রথমেই মা মেয়েকে নিয়ে যাওয়া হয় পুর্ণানগর। সেখানে কয়েকদিন যৌন নির্যাতনের পর মা মেয়েকে পাঠিয়ে দেয়া হয় পাকিস্তান আর্মির খাদিম নগর ক্যাম্পে।
খাদিম নগর সিলেট শহরের পূর্ব প্রান্তে- ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ঘাঁটি। সেখানে আরো বহু বাঙালী নারী যৌনদাসী হিসেবে বন্দী ছিলেন। তাঁদের গায়ে কাপড় রাখা হতো না, মাথার চুল ছোট করে কেটে দিয়েছিলো- যাতে কেউ আত্মহত্যা করতে না পারেন। অনেকেই গর্ভবতী হয়ে পড়েছিলেন। ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী খাদিমনগর মুক্ত করা পর্যন্ত তাঁরা এখানেই বন্দী ছিলেন। কোকিলা বেগমের মনে পড়ে, যখন মুক্ত হন- মা মেয়ের গায়ে কোন কাপড় ছিল না। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা তাঁদেরকে শার্ট ও লুঙ্গি দিয়েছিলেন। গায়ে জড়িয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরেছিলেন মা মেয়ে।
১৬ ডিসেম্বরের পর সিলেট এসেছিলেন ভারতের প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী ও লেখক অঞ্জলি লাহিড়ী। তিনি গিয়েছিলেন খাদিম নগর মিলিটারি ক্যাম্পে যেখানে কোকিলা বেগম ও তাঁর মা সহ আরো নারী বন্দী ছিলেন। অঞ্জলি লাহিড়ী লিখেছেন- “খাদিম নগরে গিয়ে দেখেছি মেয়েদের বন্দি নিবাসে লম্বা চুলের গোছা, ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো, প্রচণ্ড যন্ত্রণায় পাথরের দেয়ালে গেঁথে যাওয়া নখের দাগ। আধা-পচা মানুষের হাঁ করা যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ। দেখেছি জঙ্গলে স্তূপীকৃত অগণিত নরমুণ্ডু।”
সিলেট শহরের উত্তর প্রান্তে সালুটিকর এলাকায় অবস্থিত রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল( বর্তমানে সিলেট ক্যাডেট কলেজ) দখল করে পাকিস্তান আর্মি গড়ে তুলেছিল ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার, ব্রিগেডিয়ার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে ২০২ পদাতিক ব্রিগেড। ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার হোসেন রানার নেতৃত্বে মৌলভীবাজারে মোতায়েন ৩১৩ পদাতিক ব্রিগেডও পরে এখানে চলে আসে। এই ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার থেকে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের অপারেশন নিয়ন্ত্রণ হতো। পাশাপাশি এটি ব্যবহৃত হয় নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে। সিলেট শহর, শহরতলী ও মফস্বলগুলোতে হানা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহু ব্যক্তিকে এখানে ধরে নিয়ে আসে। কাউকে কাউকে বন্দী রেখে নির্যাতন করে কিছুদিন পর ছেড়ে দেয়। বেশীরভাগ মানুষকে পিছনের একটি টিলায় নিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে। স্বাধীনতার পর এই বধ্যভূমিতে অগণিত মানুষের হাড়গোড় পাওয়া যায়।
এসব নৃশংসতার পাশাপাশি ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারটি ছিল পাকিস্তান আর্মির যৌন নির্যাতন কেন্দ্র। শহর এবং শহরের বাইরে হানা দিয়ে নারীদের ধরে এনে রাখতো তাদের বিকৃত লিপ্সা মেটাতে। পাকিস্তান আর্মির বন্দীশালা থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসাদের একজন ছিলেন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা যুগভেরী সম্পাদক আমিনুর রশীদ চৌধুরী। ১৯৭২ সালে তিনি তাঁর পত্রিকায় লিখেছিলেন বন্দীদশার স্মৃতি, উল্লেখ করেছিলেন ভয়ংকর নারী নির্যাতনের দৃশ্য। পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পণের পর তিনি আবার গিয়েছিলেন সেখানে। দেয়াল জুড়ে পাকিস্তানী সৈনিকদের আঁকা যৌনবিকৃতির চিত্র তিনি ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন। সেই ছবি প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর লেখার সাথে।
সিলেটে নির্যাতিত নারীদের উদ্ধার ও পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করেছিলেন সৈয়দা জেবুনেচ্ছা হক। তিনি তাঁর সাক্ষ্যে জানান-
“ডিসেম্বরের ছাব্বিশ তারিখ থেকে আমরা নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন কাজ শুরু করি। শহরে পাক আর্মিদের প্রধান ঘাঁটি মডেল স্কুলে (ক্যাডেট কলেজ) আমরা অনুসন্ধানে গিয়েছি। আর্মিদের এই ঘাঁটি ও ক্যাম্পগুলোতে হত্যা ও নারী নির্যাতনের প্রচুর আলামত আমরা পেয়েছি। ক্যাম্পের একটা দেয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা একটি বাক্য এখনও আমার চোখে ভাসে-‘আমি আর বাঁচতে চাই না।’ আমরা সেখানে মনিপুরী মেয়েদের প্রচুর স্কার্ট, টপস ও অন্যান্য পোশাক আশাক পড়ে থাকতে দেখেছি। এছাড়া বাঙালি মেয়েদের নির্যাতনের অনেক আলামতও আমরা সেখানে পেয়েছি। বাঙালি পুরুষদের মাটিচাপা দেয়া অনেক মৃতদেহ আমরা পেয়েছি। তবে সেখানে আমরা কোন জীবিত মেয়েকে পাইনি।
এরপর আমরা গেলাম এয়ারপোর্টে। সেখানে পাকিস্তানি আর্মিদের বাঙ্কার থেকে আমরা দু’জন জীবিত মেয়েকে উদ্ধার করেছিলাম। দু’জনই ছিল ভীষণ অসুস্থ। তারা আমাদেরকে জানিয়েছিল, দিনের পর দিন বাঙ্কারে আটকে রেখে পাকিস্তানি আর্মিরা তাদের ওপর পালাক্রমে পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে। এভাবে নির্যাতনের ফলে তাদের একজন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিল। আর্মিরা তাদেরকে বাড়ি থেকে ধরে এনেছিল। সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে আমরা দেখেছি অনেক মেয়েকে বাবা মার সামনেই নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের সময় হয়ত বাবা মাকে বেঁধে রেখেছে, পরে তাদেরকে হত্যা করেছে। আর্মিরা যেসব বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল সেখান থেকে আমরা দুটো নির্যাতিত মেয়েকে পেয়েছিলাম। যেসব বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিত সেগুলোতেই এরকম ঘটনা বেশি ঘটেছে। এভাবে আমরা অনেক নির্যাতিত মেয়েকে পেয়েছি, যে কারণে পরবর্তীতে তাদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র খুলতে হয়েছে। রায়নগরে এজন্য বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে একটা খালি বাড়ি দিয়েছিলেন। এটাকেই আমরা গুছিয়ে নিয়ে পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসাবে চালু করি।
এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে আমরা শুধুমাত্র অন্তঃসত্ত্বা মেয়েই পেয়েছিলাম উনপঞ্চাশজন। কখনও আমরা খবর পেয়ে নিয়ে এসেছি, কখনও নির্যাতিতার ভাই সঙ্গে করে এনে রেখে গেছে, বাবা সঙ্গে করে এনে রেখে গেছে। সেসময় এই লোকগুলোর যে অভিব্যক্তি ও আকুতি আমরা দেখেছিলাম তা কখনই ভোলা সম্ভব নয়। তাঁরা এ কথা কাউকে জানাতে পারেননি, কী করবেন বুঝতে পারেননি। শেষে আমাদের কেন্দ্রের কথা শুনে মেয়েকে, বোনকে, কিংবা আত্মীয়াকে এখানে নিয়ে এসেছেন। আর নির্যাতিতাদের অবস্থা তো বলাই বাহুল্য।
শেষ পর্যন্ত উনপঞ্চাশজন অন্তঃসত্ত্বা মেয়ের ভেতর থেকে সাতচল্লিশজনকে আমরা এ্যাবরশন করিয়ে দিয়েছি। তারপর ক’দিন কেন্দ্রে রেখে চিকিৎসা করে একটু সুস্থ হলে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। আর বাকি যে দু’জন মেয়েকে এ্যাবরশন করা সম্ভব হয়নি তাদের অবস্থা ছিল খুব খারাপ। সাত মাস হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার এ্যাবরশন করতে ভয় পাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রেই রেখে দিতে হয়েছে। পরে তাদের বাচ্চা প্রসব হয়েছে। এই বাচ্চা দুটোর অন্তত একটা বেঁচে আছে বলে আমি জানি।
এই উনপঞ্চাশজন ছাড়াও আরও প্রায় ত্রিশজন মেয়েকে আমরা কেন্দ্রে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলাম। এরা অবশ্য অন্তঃসত্ত্বা ছিল না, কিন্তু আর্মিদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিল। উপরন্তু তাদের বাবা মা কিংবা স্বামীকে আর্মিরা মেরে ফেলেছিল। আশ্রয়ের জায়গা ছিল না। মুসলমান মেয়েরাই বেশি ছিল। তবে হিন্দু ও মনিপুরী মেয়েরাও ছিল। পুনর্বাসন কেন্দ্রে আমরা তাদের জন্য লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছি, সেলাই ও অন্যান্য হস্তশিল্প শিখিয়েছি। তারপর কাজ শেখা হলে তাদেরকে সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছি। তারা বাড়িঘরে ফিরে গেছে, নিজেদের পথ নিজেরাই দেখে নিয়েছে। “
——
সুত্র
——
১। স্মৃতি ও কথা ১৯৭১, অঞ্জলী লাহিড়ী।
২। সৈয়দা জেবুন্নেছা হকের সাক্ষ্য। যুদ্ধ ও নারী, ডাঃ এম এ হাসান।
৩। কোকিলা বেগমের সাক্ষ্য। ঈশানে নিশান, হাসান মোরশেদ।
@ Preset71
