ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে কারখানা শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসের ওপর তৌহিদি জনতাকে লেলিয়ে দিয়ে পিটিয়ে-পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে র্যাব।
আজ ২০শে ডিসেম্বর, শনিবার দুপুরে র্যাব-১৪ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন পরিচালক মো. নাঈমুল হাসান। তদন্তলব্ধ তথ্যের আলোকে তিনি জানালেন, নিহত দিপু চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার কোনো প্রমাণ মেলেনি। কেউ জানাতে পারেননি দিপু আসলে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কী বলেছিলেন, কেন তাকে হত্যা করা হলো নির্মমভাবে।
এ ঘটনায় কারখানার ফ্লোর ম্যানেজার আলমগীর হোসেনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য তুলে ধরে র্যাব জানায়, দিপুকে চাকরি থেকে ইস্তফায় বাধ্য করার পর ফ্লোর ম্যানেজার তাকে উগ্রবাদী তৌহিদি জঙ্গিদের হাতে তুলে দেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ফ্লোর ম্যানেজারসহ মোট ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নিহত দিপু তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়া কান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি গত দুই বছর ধরে ওই কারখানায় কাজ করছিলেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দিপু চন্দ্র দাস বি.এ পাস। কারখানায় সাধারণ পদে চাকরি করলেও শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতেন বলে অনেকের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। তাকে হটাতেই এমন ষড়যন্ত্র করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন কারখানায় কর্মরত একাধিক কর্মী।
তবে বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে এ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে রাজি নন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
র্যাবের ব্রিফিংয়ে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে প্রধান অভিযুক্তরা হলেন- পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কোম্পানির ফ্লোর ম্যানেজার আলমগীর হোসেন (৩৮) এবং কোয়ালিটি ইনচার্জ মিরাজ হোসেন আকন (৪৬)।
গ্রেপ্তার অন্য আটজন হলেন- তারেক হোসেন (১৯), লিমন সরকার, মানিক মিয়া (২০), এরশাদ আলী (৩৯), নিঝুম উদ্দিন (২০), আজমল হাসান সগীর (২৬), শাহিন মিয়া (১৯) এবং মো. নাজমুল। এদের মধ্যে সাতজনকে র্যাব এবং তিনজনকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেপ্তার করেছে।
ব্রিফিংয়ে র্যাব কর্মকর্তা নাঈমুল হাসান বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে ঘটনার সূত্রপাত। কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ দিপুকে জোরপূর্বক ইস্তফা দিতে বাধ্য করেন। পরে তিনি দিপুকে পুলিশের হাতে না দিয়ে বা তার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সরাসরি উগ্রবাদীদের হাতে তুলে দেন। যারা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ জন্য কারখানার দুই দায়িত্বশীলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
র্যাব পরিচালক বলেন, আমরা বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান করে জানার চেষ্টা করেছি দিপু কী বলেছেন, কার কাছে বলেছেন, কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর কেউ দিতে পারেনি। এর পেছনে পূর্ব শত্রুতা ছিল কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো নাগরিককে এভাবে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে মারা কোনোভাবেই আইনসম্মত নয়। সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এটি বরদাশত করবে না।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার রাতে ভালুকার জামিরদিয়া এলাকায় পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কোম্পানির শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে (২৮) ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর তার মরদেহ গাছের ডালের সঙ্গে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে ভালুকা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার তদন্তভার পুলিশের পাশাপাশি র্যাবও ছায়া তদন্ত হিসেবে চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
পড়ুন: কটূক্তির কথিত অভিযোগ: হিন্দু শ্রমিককে গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারল তৌহিদি জঙ্গিরা
র্যাবের-পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এরা কেউ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নয়।
ওসমান হাদীকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শীর্ষ গণমাধ্যম ব্যস্ত থাকায় দিপু দাসের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে গেলেও সচেতন বিবেকবান সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
বিশেষ করে র্যাবের ব্রিফিংয়ের পরেও প্রশ্ন জেগেছে সাধারণের মনে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অবমাননার ঘটনার সত্যতা নিরূপণ ছাড়াই উত্তেজিত হয়ে সংখ্যালঘুদের হত্যা-নিপীড়নের ঘটনা নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠরা কেন নিশ্চুপ? তাদের নিরবতাই মূলত তৌহিদি জনতাকে শক্তি যোগাচ্ছে। এ ধরনের সংঘটিত অপরাধ ঘটাতে সাহস যুগিয়ে যাচ্ছে। তারা কিছুতেই দায় এড়াতে পারেন না।
দিপু দাসের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আদৌ সত্যিকারের অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক সাজার আওতায় আসবে কিনা- স্থানীয় সাংবাদিকরাও প্রশ্ন রেখেছেন। যারা উস্কানি দিচ্ছে, সংখ্যালঘু নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে, রাষ্ট্র কি তাদের প্রতিহত করে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে- এমন প্রশ্ন সবার।
