আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ আখ্যা দিয়ে লেখক, সাংবাদিক, গবেষক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারকর্মী অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরকে আটক রাখার ঘটনাকে মৌলিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল হিসেবে দেখছে গণহত্যা প্রতিরোধ ও মানব নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা লেমকিন ইনস্টিটিউট।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভাপতি অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরকে গ্রেপ্তার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বাংলাদেশের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মনে করছে সংস্থাটি।
বেলারুশভিত্তিক লেমকিন ইনস্টিটিউট প্রায় ৮০ বছর বয়সী এই সাংবাদিককে অবিলম্বে মুক্তি দিতে দখলদার ইউনূস সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
এর আগে, গত ৫ই জানুয়ারি এক বিবৃতিতে লেমকিন ইনস্টিটিউট অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরকে গ্রেপ্তার ও পরবর্তীতে আটক রাখার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রক্রিয়াগত অনিয়মের অভিযোগ করেছে। তারও আগে গত নভেম্বরে এই গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আইনি মানদণ্ড ভঙ্গ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল (ইউএনএইচআরসি)। তারা তার মুক্তির পাশাপাশি ক্ষতিপূরণেরও দাবি করেছিল ইউনূস সরকারের কাছে।
জুলাই দাঙ্গার মাধ্যমে জঙ্গি হামলায় আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানোর পর ২০২৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর রাতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ঢাকার বনানী এলাকা থেকে আটক করা হয় অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরকে। অশীতিপর অবস্থায় তাকে অপদস্থ করে গাড়িতে তোলা হয়। এর জুলাই দাঙ্গার সময়কার একাধিক মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার দেখায়।
মামলার অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, চলাফেরায় অক্ষম অধ্যাপক শাহরিয়ার কবির অস্ত্র হাতে জুলাই দাঙ্গাবাজদের দমনে রাস্তায় নেমেছিলেন এবং গুলি করে মানুষও হত্যা করেছেন! গ্রেপ্তারের পর থেকে এই মানবাধিকার কর্মী এখন অব্দি কারাগারে রয়েছেন। এসব মামলায় একাধিকবার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে। জামিনের আবেদন জানালেও তা মঞ্জুর করেনি ইউনূস সরকারের আদালত।
গণহত্যা প্রতিরোধ ও মানব নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা লেমকিন ইনস্টিটিউট তাদের বিবৃতিতে শারীরিকভাবে অসুস্থ অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের গ্রেপ্তার ও রিমান্ড এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বাধ্যতামূলক নির্দেশনা অনুসরণ না করার বিষয়টিও তুলে ধরেছে।
সংস্থাটির ভাষ্য, অন্যান্য মামলায় আটক থাকা অবস্থায়ই তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালে অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার’ অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ই মে ঢাকায় উগ্রবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে হতাহতের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হয়। যাকে প্রতিহিংসা চরিতার্থের হাতিয়ার আখ্যা দিয়েছেন দেশি-বিদেশি মানবাধিকার কর্মীরা।
যদিও অধ্যাপক শাহরিয়ার কবির বাংলাদেশ সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নন এবং হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তার কোনো ভূমিকা ছিল না, তবুও তাকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের দাঙ্গার ন্যায় ২০১৩ সালের ঘটনার মামলাতে জড়ানো হয়েছে। এসব মামলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তাঁর দলের আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।
বিবৃতিতে লেমকিন ইনস্টিটিউট বলেছে, ১২ই জানুয়ারি এ মামলায় অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে, সেদিন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ আসতে পারে।
সংস্থাটি বলছে, ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার ও আদালতগুলোর আচরণ বিবেচনায় নিয়ে বলা যায় যে, অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের বিচার বাংলাদেশের সংবিধানের আইনি বিধান বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হবে- এমন কোনো প্রত্যাশা লেমকিন ইনস্টিটিউটের নেই।
সংস্থাটির আশঙ্কা, প্রমাণ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে প্রহসনের রায় দেওয়া হতে পারে এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে।
লেমকিন ইনস্টিটিউটের মতে, অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের ওপর এই চরম নিপীড়ন ও মানবাধিকার হরণের পেছনে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে তার দীর্ঘদিনের কঠোর অবস্থান, ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চা ভূমিকা, বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে সংখ্যালঘু নিপীড়ন নিয়ে তথ্যভিত্তিক শ্বেতপত্র রচনা ও তথ্যচিত্র নির্মাণ, একাত্তরের গণহত্যায় জামায়াতে ইসলামীর সক্রিয় ভূমিকাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জড়িত।
তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধ নিয়ে সোচ্চার তরুণ সমাজের মধ্যেও তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
লেমকিন ইনস্টিটিউট তাদের বিবৃতিতে একটি হত্যা মামলায় জামিন শুনানির প্রসঙ্গ টেনে জানিয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষ সরাসরি অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে এক ধর্মীয় নেতার টিভি অনুষ্ঠানের বিতর্কের কথা তুলেছে। একইসাথে রাষ্ট্রপক্ষ প্রকাশ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, শাহরিয়ার কবিরের গ্রেপ্তার কোনো ‘প্রমাণিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য নয়’, বরং তার ‘রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই’।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক অধ্যাপক শাহরিয়ার কবির যেন ইউনূস সরকারের সমালোচনা করতে না পারেন, ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে সোচ্চার হতে না পারেন সেজন্য তাকে আটক করা হয়েছে পরিকল্পনামাফিক।
এছাড়া বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বর্তমান সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বক্তব্য প্রদানে বাধা দিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বিশ্বাস করে লেমকিন ইনস্টিটিউট।
অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিবৃতিতে বলা হয়, এই প্রবীণ গবেষক হুইলচেয়ার ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না, বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছেন। তাকে গ্রেপ্তারের সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণেরও সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং এরপর থেকে তাকে এমন পরিবেশে আটক রাখা হয়েছে, যা মানবিক আচরণের ন্যূনতম মানদণ্ডও পূরণ করে না।
সংস্থাটির মতে, অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতির মধ্যেও তাকে দফায় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে দূরভিসন্ধিমূলকভাবে। আটক অবস্থায় বিশেষায়িত চিকিৎসা দূরে থাক, ন্যূনতম চিকিৎসা প্রদানের আবেদনও বারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
সংস্থাটি বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানায়, অধ্যাপক শাহরিয়ার কবির প্রয়োজনীয় ওষুধ বা যথাযথ চিকিৎসাসেবা পাননি, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন।
লেমকিন ইনস্টিটিউট বলছে, হেলমেট ও হাতকড়া পরিয়ে আদালতে হাজির করার সময় অধ্যাপক শাহরিয়ার কবির মব হামলার শিকার হয়েছেন, তাকে নোংরা গালিগালাজ করা হয়েছে। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, মব হামলার সময় অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরকে রক্ষার চেয়ে পুলিশ নিজের সুরক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আদালত তাকে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে দেননি; এজলাসে নিতে লিফট ব্যবহারে বাধা দেওয়া হয়; আদালতের কার্যক্রম চলাকালে বসতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এছাড়া নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করে তার নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগ দিতেও বাধা দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাটি জানায়, এমন পর্যবেক্ষণ থেকে সুস্পষ্ট, ইউনূস সরকার অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে এবং কার্যকর আইনগত প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি।
গণহত্যা প্রতিরোধ ও মানব নিরাপত্তা বিষয়ক স্বনামধন্য সংস্থাটি বলছে, জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপের অনুসন্ধান অনুযায়ী, অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের গ্রেপ্তারের ঘটনাটি নির্বিচার গ্রেপ্তারের আওতায় পড়ে।
প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করা গবেষক অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে মামলা চলাকালে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ইউএনএইচআরসির কাছে একটা অভিযোগ দায়ের করা হয়, যেখানেও মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ ছিল। সেসব অভিযোগের পর তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ‘নির্বিচারে গ্রেপ্তার’ শিরোনামে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে ইউএনএইচআরসি।
