জুলাই দাঙ্গায় আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত ১৬ মাসে সারাদেশে অন্তত ১১৩টি মাজার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাসা সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং ভক্তদের ওপর সহিংসতা চালানো হয়েছে।
জোর করে সাধক বাউলদের চুল-দাঁড়ি কেটে দেওয়ার মত নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। মব করে কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আর এসব ঘটনা চেয়ে চেয়ে দেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই সাথে উস্কানি দিয়েছে ইউনূস সরকারের দায়িত্বশীল মহল। মাজারগুলোতে ওরশের আয়োজন করতে দেওয়া হচ্ছে না। বাধা দেওয়া হচ্ছে পদে পদে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’ ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৪টি মাজার, দরগাহ ও খানকায় হামলার প্রমাণ পেয়েছে।
মাকামের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগের ৯টি জেলায় ৩৭টি মাজার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে পাঁচ জেলার ২৭টি স্থাপনায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
অধিকাংশ হামলার পেছনে ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ কাজ করেছে। মাজারকে ‘শিরক ও বিদআত’ আখ্যা দিয়ে হামলার পটভূমি তৈরি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েও মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
গত বছরের ১৮ই জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট থেকে পরবর্তী সাড়ে ৫ মাসে সারা দেশে ৪০টি মাজার, সুফি সমাধিস্থল ও দরগাহসহ মোট ৪৪টি হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে এবং ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
তবে সরকারি এই বিবৃতিটিকে প্রহসন বলছেন সংস্কৃতিকর্মী ও সাধকেরা। তাদের মতে, অধিকাংশ ঘটনাই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। আর যেসব তথ্য গোপন করা যায়নি, সেসব ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হামলার ঘটনা কয়েক শ।
সংস্কৃতিকর্মীরা বলেন, শুধু মাজারে হামলা হয়নি, মাজার ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত দরগা, খানকা শরিফ, পীর-মুর্শিদদের আস্তানা, বাউল-সাধকদের আখড়াসহ সুন্নীপন্থিদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করেছে উগ্রবাদী-তৌহিদি জনতা। ৭-৮শ বছর পুরনো মাজারের বাইরে হামলার শিকার দরগা-আখড়ার সংখ্যা অন্তত দেড় হাজার।
মাজারে হামলার সবচেয়ে নৃশংস ঘটনা ঘটে গত বছরের ৫ই সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে। সেখানে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার কবর শরিয়তবিরোধী দাবি করে দরবার ও বাড়িতে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা কবর থেকে মরদেহ তুলে পুড়িয়ে দেয়। এ ঘটনায় সৃষ্ট দাঙ্গায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। ঘটনার পর থেকে নুরুল হকের পরিবার ও অনুসারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্টদের আধ্যাত্মিক গুরু খ্যাত ফরহাদ মজহার বলেন, আমি যা বলি সেটাই ঠিক, অন্য সব ভুল এই ধারণাই ফ্যাসিজম। যারা মাজার, গান-বাজনার বিরোধিতা করে সহিংসতা চালাচ্ছে, তারা আসলে ইসলামবিরোধী। এ দেশে ইসলাম এসেছে পীর-আউলিয়াদের হাত ধরেই। এই বৈচিত্রই ইসলামের শক্তি। কিন্তু সরকার শক্ত হাতে বিশৃঙ্খলাকারীদের মোকাবিলা করতে পারেনি।
মাকাম-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা বিভাগের ৮০ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ৯০ শতাংশ ঘটনায় প্রশাসন নিষ্ক্রিয় ছিল। অধিকাংশ ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার বা তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই, যা হামলাকারীদের উৎসাহিত করেছে। হামলার ফলে অন্তত ৩০টি মাজার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে এবং বহু স্থানে বার্ষিক ওরশ ও আনুষ্ঠানিক আয়োজন বন্ধ হয়ে গেছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, হামলার খবর পেলেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। অনেক মামলা এখনও তদন্তাধীন।
মাজারে হামলার ঘটনায় রাসা সেন্টার হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫১০ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। রিটের শুনানি এ সপ্তাহে হওয়ার কথা রয়েছে।
শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, মাজার, মসজিদ, কবর ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সহিংসতার অংশ। সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও জবাবদিহির অভাবই এসব সহিংসতা চলমান থাকার প্রধান কারণ। সরকারের বিভিন্ন মহল মাজারের বিরুদ্ধে উস্কানি দিচ্ছে।
এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, মাজার-দরবারকে আমরা শরিয়তসম্মত মনে করি না।
