দেশে হামের টিকা সংকট ও প্রাদুর্ভাবের পেছনে ইউনুস সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নিন্দনীয়। গত বছর ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু হামের টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে, যা গত নয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্যু করে ফেলে দেয়ার পর ক্ষমতায় আসা ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পিত উদাসীনতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে আওয়ামী লীগের সফল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বিঘ্নিত করেছে। সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে বের হয়ে আসার পরিকল্পনার কারণে সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফলে হামের টিকা কেনাই হয়নি। যে টিকা আগে বিনামূল্যে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের দেওয়া হতো, তা বন্ধ করে ইউনুস সরকার শিশুদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিজাম উদ্দিন স্পষ্ট করেছিলেন যে প্রায় এক বছর ধরে ইপিআইয়ের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাম ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইউনুস সরকার তখনো তাদের অসারতা ও অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়।
এই পরিস্থিতি আরও নাজুক করে তোলে যখন জানা যায়, ইউনুসের সরকারের সময় স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেছে। অনেক স্বাস্থ্য সহকারীর চাকরি চলে যায়, এবং পরে মাত্র ২৩ জেলায় সীমিত সংখ্যক কর্মী নিয়োগ দিয়ে বাকি দেশের কথা ভুলেই গিয়েছিল তারা।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। সেখানে আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশের বয়স ছয় মাসের নিচে, অথচ হামের টিকা দেওয়ার কথা ৯ মাস বয়সে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে মার্চ মাসেই ২০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি হয়েছে ২৮৬ শিশু। তিন মাসে মারা গেছে চার শিশু। রোগীর চাপে মেঝে, সিঁড়ি, পাশের ভবনেও রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। অথচ সেখানে মাত্র দুই শিশু বিশেষজ্ঞ রয়েছেন।
এটা কোনও দৈবদুর্বিপাক নয়, বরং পরিকল্পিত নিষ্ক্রিয়তার ফল। ইউনুসের নেতৃত্বে থাকা এনজিও নির্ভর সরকার দেশের শিশুদের গণহারে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার মহড়া চালায়। ২০২৫ সালে যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের টিকাদান তথ্য পাওয়া যায়নি, তখন ইপিআইয়ের ওয়েবসাইট থেকেও কিছু তথ্য সরিয়ে নেওয়ার মতো নোংরা কাজ করেছে তারা।
এক সময় ভেজাল ওষুধ সরবরাহ করে শিশুদের মৃত্যুর জন্য কুখ্যাত পিনাকী ভট্টাচার্য্য, সেই পিনাকীদের বসানো সরকার আবারো শিশু গণহত্যার পরিকল্পনা করে গেছে। টিকা না কিনে, ক্যাম্পেইন বন্ধ করে, তারা শিশুদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ফেলে দিয়েছিল।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ইউনুসের সেই অসাংবিধানিক সরকারের পতন হয়। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু বিএনপিও কি এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে? তারা আওয়ামী লীগের গড়ে তোলা সফল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া এই সংকট মোকাবিলায় কতটুকু সক্ষম হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেছিলেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ৯০-৯৫ শতাংশ টিকাদান প্রয়োজন। কিন্তু ইউনুস সরকারের আমলে তা ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল। বিশ্বব্যাংকের সাবেক বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার স্পষ্ট বলেছিলেন যে অপারেশনাল প্ল্যান ও লাইন ডিরেক্টর কাঠামো বাতিল করে নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তরের জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছিল, যা স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলেছে।
এই সংকটের মূল দায়ভার ইউনুস ও তার এনজিও নির্ভর সরকারের ওপরই বর্তায়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আওয়ামী লীগের সফল জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি ধ্বংস করে তারা বিলুপ্তপ্রায় হাম রোগকে মহামারি আকারে ফিরিয়ে এনেছে। শিশুদের জীবনকে তারা খেলনার মতো ব্যবহার করেছে। দেশের মানুষ এই ষড়যন্ত্র ভালোভাবে দেখেছে এবং বুঝেছে কারা শিশুদের হত্যাকারী।
বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও এই সংকট কাটিয়ে উঠতে তাদের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় টিকার হার ৯৮-৯৯ শতাংশ থাকলেও এখন তা অনেক নিচে নেমে এসেছে। শিশুদের বাঁচাতে হলে আগের সেই সফল কর্মসূচি আবার চালু করতে হবে। টিকা সংকট দূর করতে হবে, ক্যাম্পেইন জোরদার করতে হবে, এবং যেসব শিশু টিকার বাইরে রয়েছে তাদের দ্রুত আওতায় আনতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট বলেছেন যে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। ‘মিজেলস ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন’ শুরু করতে হবে, সংক্রমণ বেশি এমন এলাকায় সবাইকে টিকা দিতে হবে, প্রয়োজনে অতিরিক্ত ডোজ দিতে হবে। এমনকি ৯ মাসের আগেও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
ইউনুস সরকারের সময় যা করা হয়নি, এখন তা করতে হবে। তাদের নিষ্ক্রিয়তা ও পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের ফলে যে ভয়াবহ পরিণতি হয়েছে, তার দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। শিশুদের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচার হওয়া উচিত।(আওয়ামীলীগ পেইজ)
