ঢাকার মহানগর দক্ষিণের শ্যামপুর থানার (৪৭ নম্বর ওয়ার্ড) এক কিশোর ছাত্রনেতার জীবনে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে নির্মমভাবে। ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম মাহের, যার বয়স মাত্র ১৫ বছর, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ক্ষমতা নেন ড. ইউনূস। দেশজুড়ে চরম নৈরাজ্য আর মব সন্ত্রাস, হত্যার শিকার হন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে।
দেশের সকল স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বহিষ্কৃত এবং মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে নিপীড়নের শিকার হন লাখ লাখ শিক্ষার্থী। ছাত্রলীগের পদধারী নেতা তো বটেই, ইউনূস সরকারের তল্পিবাহক জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি, বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনসমূহ, জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা মিলে ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকদের ওপরেও চরম জুলুম নির্যাতন চালায়।
পুলিশি নিপীড়নেরও শিকার হন ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টরা। মামলা না থাকলেও অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে মাসের পর মাস কারাবন্দী করে নিপীড়ন চালানো হয়। জামিন মেলেনি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহিষ্কারাদেশের ফলে থমকে যায় তাদের শিক্ষাজীবন। এই নির্যাতন নিপীড়ন থেকে ছাড় পাননি আশরাফুল ইসলাম মাহেরের মতো কিশোর বয়সীরাও।
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেই অধিকারবঞ্চিত। তাদের শিক্ষাজীবন পরিকল্পিতভাবে বিনষ্ট করার পাশপাশি যারা ইতিপূর্বে পাশ করেছেন, প্রতিহিংসাবশত এমন নেতাকর্মীদের শিক্ষাসনদও বাতিল করা হয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে এমন নজিরবিহীন মানবাধিকার লঙ্ঘন আর কোথাও ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।
১৫ বছরের কিশোর ছাত্রনেতা মাহেরকে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং পরবর্তীতে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে। কারাভোগ করতে হয় তাকে।
মাহেরের ভাষ্য অনুযায়ী, অল্প সময়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মধ্যেই তাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ১৫ বছর বয়সেই তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত হন এবং তার নামে মামলা হয়। ১৬ বছর বয়সে তাকে কারাবরণ করতে হয়, যেখানে তিনি টানা ৫২ দিন ছিলেন।
তিনি জানান, ছাত্রলীগের ব্যানারে শ্যামপুর ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এলাকায় তিনি অন্তত ১১টি মিছিলে অংশ নিয়েছেন। তার রাজনৈতিক পরিচয় সীমিত হলেও এর প্রভাব পড়েছে তার শিক্ষাজীবনে। ২১শে এপ্রিল শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা দিতে পারছেন না।
মাহের তার পোস্টে লেখেন, “রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে জীবনের অনেক বড় একটি অধ্যায় থেকে পিছিয়ে গেলাম। তবে এতে আমার কোনো আফসোস নেই। আমি আবারও পরীক্ষা দেব, প্রয়োজনে পাঁচ বছর পর হলেও।”
মাহের সবসময় মেধাবী ছাত্র ছিলেন, তার শ্রেণিতে অবস্থান সবসময় শীর্ষে ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিহিংসার প্রভাব যখন শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্যও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে কিশোর বয়সে এমন অভিজ্ঞতা তাদের মানসিক ও শিক্ষাগত বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
