আহমাদ ইশতিয়াক
এই ছবিটি ২০১৩ সালে তোলা। এই ছবিতে যারা রয়েছেন তারা সবাই ছিলেন বিধবা। তাদের সবাই মুক্তিযুদ্ধের একটি গণহত্যায় স্বামীহারা হয়েছিল। পৈশাচিক সেই গণহত্যাটি সংঘটিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের আজকের দিনে ২৩ এপ্রিল।
এই ছবিতে স্বামীহারা বিধবাদের মাত্র অল্প কয়েকজন রয়েছেন। কারণ ঐ একটি গণহত্যাতেই স্বামী হারা হয়েছিলেন অন্তত ৮০০ জন নারী। গণহত্যাটি ছিল ঠাকুরগাঁওয়ের জাঠিভাঙা গণহত্যা।
.
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে উত্তরাঞ্চলে দেশের সর্ববৃহৎ গণহত্যা ছিল জাঠিভাঙা গণহত্যা। যে গণহত্যার মূল টার্গেট ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।
.
জাঠিভাঙা গণহত্যায় কেবল কয়েক ঘণ্টায় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারেরা ২৫০০ এর ও বেশী নিরীহ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষকে হত্যা করেছিল।
.
এই গণহত্যা এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে, এই গণহত্যার পরবর্তীতে আটকে গিয়েছিল জাঠিভাঙার পাশের খরস্রোতা পাথরাজ নদীর স্রোত।
.
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শান্ত সুনিবিড় একটি ইউনিয়ন শুখানপুকুরী। ইউনিয়নটির মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে সীমান্তবর্তী খরস্রোতা নদী পাথরাজ। নদীর এক পাড়ের তীর ঘেঁষে অবস্থান জাঠিভাঙার।
.
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাঠিভাঙ্গা ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে বসবাসকারী হিন্দু জনগোষ্ঠীর বাসিন্দারাই ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। ধর্মীয় সহাবস্থানের কারণে গ্রামবাসীদের মধ্যে ছিলোনা কোন বিরোধ।
.
মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছেড়ে শরণার্থী হয়ে ভারতে পাড়ি জমাতে শুরু করেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষেরা। তবে এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিলো শুখানপুকুরী ইউনিয়নের গ্রামগুলো।
.
প্রত্যন্ত জনপদ হওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারেরা তখনও এই ইউনিয়নে প্রবেশ করতে পারেনি। পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের উপদ্রব না থাকায় এই রুটটি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলা ও দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়ন থেকে আগত ভারতগামী শরণার্থীদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। ফলে এই রুট ধরে দিনে দিনে বাড়তে থাকে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত শরণার্থীদের সংখ্যা।
.
একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী রাজাকারদের মাধ্যমে শরণার্থীদের এই রুটের সম্পর্কে জেনে যায়। পাকিস্তানি বাহিনীর আসন্ন হামলার আশঙ্কায় ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে গণহত্যার খবর শুনে ঠাকুরগাঁও সদরের শুখানপুকুরি ইউনিয়ন ও পার্শ্ববর্তী জগন্নাথপুর, চকহলদি, সিংগিয়া, চণ্ডীপুর, বালিয়া, বাসুদেবপুর, মিলনপুর, গৌরীপুর, খামার ভোপলা গ্রামের বাসিন্দারাও শেষমেশ প্রাণের ভয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
.
২২ এপ্রিল তারা ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন। সেদিন বিকেলে শরণার্থীদের অনেকেই পাখরাজ নদী তীরবর্তী জাঠিভাঙায় গিয়ে পৌঁছান। পূর্ব থেকেই জাঠিভাঙ্গায় অন্য অঞ্চল থেকে আগত শরণার্থীদের রাত্রিযাপনের জন্য অবস্থান করছিলেন।
.
ফলে সেখানে শরণার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এসময় স্থানীয় রাজাকারেরা তাদের রাত্রিযাপনের করতে বলে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে পরদিন সকালে সীমান্তের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার অনুরোধ করেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়ায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের কথা ভেবে এবং রাজাকারদের আশ্বাসে বিশ্বাস করে শরণার্থীরা জাঠিভাঙ্গায় রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
.
শরণার্থীদের আশ্বস্ত হওয়ার খবর পেয়ে এদিন রাতে স্থানীয় কয়েকজন রাজাকার ঠাকুরগাঁও ইপিআর সেক্টর হেড কোয়ার্টারে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর উপস্থিতির খবর জানিয়ে দেয়।
.
২৩ এপ্রিল, ১৯৭১। দিনটি ছিল শুক্রবার।
.
ভোর থেকেই আগের রাত্রে আগত শরণার্থীদের অনেকেই সীমান্তের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে শরণার্থীরা এসময় জাঠিভাঙ্গা ও শুখানপুকুরী ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে জমায়েত হতে শুরু করেছেন।
.
সেদিন সকাল থেকেই স্থানীয় দালালেরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী পুরুষদের পাথরাজ নদীর উপরেভাঙা পুল মেরামতের কথা বলে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে। নিরীহ শরণার্থীরা তখনও ঘুণাক্ষরে টের পাননি তাদের উপর পৈশাচিক এক গণহত্যা সমাগত।
.
বেলা বাড়তেই রাজাকারদের সহযোগিতায় দুই ট্রাক ভর্তি পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের একটি দল জাঠিভাঙ্গায় এসে পৌঁছায়। প্রথমে তারা জাঠিভাঙ্গা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা ঘেরাও করে। এসময় রাজাকারেরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে নিরীহ সাধারণ গ্রামবাসী ও শরণার্থীদের জোরপূর্বকভাবে তুলে আনে।
.
একপর্যায়ে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা উপস্থিত, তুলে আনা গ্রামবাসী ও শরণার্থীদের জাঠিভাঙ্গার পাথরাজ নদীর পাড়ে এনে জড়ো করে।একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে ব্রাশফায়ার শুরু করে।
.
এসময় প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক হয়ে ছুটতে শুরু করেন সাধারণ মানুষ। পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের অবিশ্রান্ত গুলিবর্ষণে এসময় অসংখ্য সাধারণ মানুষ শহীদ হন। উপস্থিত মানুষের সংখ্যা বেশী হওয়ায় গণহত্যার একপর্যায়ে হানাদার গুলির মজুত কমে আসে।
.
এসময় দেশীয় ধারালো অস্ত্র, দা, বল্লম ও রামদা হাতে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বহু মানুষকে নির্বিচারে কুপিয়ে হত্যা করেছিল রাজাকারেরা।
.
জাঠিভাঙ্গা গণহত্যার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন জাঠিভাঙ্গা এসসি উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক রাম কিশোর বর্মণ। তিনি আমাকে বলেছিলেন এমনটাই। ‘সে দৃশ্য স্বচক্ষে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। ওরা একপাশ থেকে গুলি করছে আর পুরুষেরা পালাচ্ছে। দৌড়াতে যেতে আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। গুলি এসে বুকে লেগেছে, এরপর আর সামনে এগোতে না পেরে ঢলে পড়লো। মানুষ মানুষকে মারতে পারে। যুদ্ধের পর গাঙয়ে অনেক মানুষের খুলি পাওয়া গিয়েছিল। অন্য জেলার থেকে মানুষ আসায় বহু মানুষের নাম পরিচয় আমরা আর কখনও জানতে পারিনি।’
.
তিনি বললেন, ‘গণহত্যার পূর্বে পাকিস্তানি সেনা ও দালালেরা বাড়ি বাড়ি ঢুকে প্রথমে এক দফা লুটপাট চালিয়েছিল। গণহত্যা শেষে পাকিস্তানি সেনারা চলে গেলে রাজাকারেরা আরেক দফা গণহারে লুটপাট চালিয়ে বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এতে গ্রামগুলোর স্বামী ও স্বজনহারা বিধবারা পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়েন।’
.
জাঠিভাঙ্গা গণহত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু পুরুষ নিধন। জাঠিভাঙা গণহত্যায় ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চকহলদি, চণ্ডীপুর, শুখানপুকুরী গ্রামের শত শত নারী স্বামীহারা হয়েছিলেন। কেবল চকহলদি গ্রামের বিধবা নারীর সংখ্যাই ছিল ২০০ জনের বেশী। সব গ্রাম নিয়ে যে সংখ্যা ৮০০ জনেরও বেশী। ফলে এই গ্রামগুলো বিধবাপল্লী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।
.
জাঠিভাঙা গণহত্যা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত একটি গণহত্যা। এই গণহত্যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল এই অঞ্চলকে হিন্দু পুরুষ শূন্য করতে হবে। এজন্য তারা শরণার্থীদের টার্গেট করে এই গণহত্যা চালিয়েছিল।’
.
অথচ যুদ্ধের পর জাটিভাঙ্গা গণহত্যায় স্বামীহারা বিধবাদের অনেককেই জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নিতে হয়েছিল। কেউবা দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন।
.
জাঠিভাঙ্গা গণহত্যায় এতো অধিক সংখ্যক মানুষ শহীদ হয়েছিলেন যে, তাদের সৎকার করা সম্ভবপর ছিলোনা। ফলে গুটিকয়েক লাশ ছাড়া বেশীরভাগ লাশ পাথরাজ নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন স্থানীয়রা।
.
জাঠিভাঙা গণহত্যার পরবর্তীতে কয়েক বছর আগে গণহত্যার স্থান পাথরাজ নদীর তীরে স্থাপন করা হয়েছিল একটি স্মৃতিস্তম্ভ। তবে বর্তমানে স্মৃতিস্তম্ভটি পড়ে রয়েছে একপ্রকার অবহেলার সাক্ষী হয়ে।
.
উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ গণহত্যাটি এই স্থানে সংঘটিত হলেও পুরো কমপ্লেক্সেই নেই কোন নৃশংসতা ও গণহত্যার বিবরণ সম্বলিত কোন বিবরণ। সীমানা প্রাচীরের মূল ফটকে নেই কোন তালাও। সন্ধ্যা পেরোলেই স্মৃতিস্তম্ভের ভিতরে বসে মাদকসেবীদের অবাধ আড্ডা। স্মৃতিস্তম্ভ ও কমপ্লেক্সের দেখভালের দায়িত্বে নেই কোন তত্ত্বাবধায়ক ও নিরাপত্তারক্ষী।
.
এ যে এক আমাদের ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস। জাঠিভাঙা গণহত্যার দিনে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেসব শহীদদের, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে নির্মিত হয়েছিল এ দেশ।
