পৃথিবীতে যত বিপ্লব-বিদ্রোহ ঘটেছে, তার পেছনে ছিল শিল্পী সাহিত্যিকদের বৌদ্ধিক প্রেরণা৷ ফরাসি বিপ্লবে যেমন রুশো মন্তেস্কু ভলতেয়ারের চিন্তা কাজ করেছে, রুশ বিপ্লবে তেমনি মার্ক্স এঙ্গেলসের।
সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গে যে বামপন্থী উত্থান হলো, তাতে মৃণাল সেন, ঋতিক ঘটক, সত্যজিতদের অবদান অস্বীকারের উপায় নেই। এঁরা জনগণকে সংবেদনশীল ও রাজনৈতিক সচেতন করে তুলেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জহির রায়হানের “জীবন থেকে নেয়া”র অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় চলচ্চিত্র এতো প্রভাববিস্তারী হয়ে ওঠেনি। তারপরও সেসময় কলকাতা নগর কাঁপিয়েছিল একটি চলচ্চিত্র- ‘উদয়ের পথে’।
দরিদ্র বেকার এক তরুণ অনুপের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সংলাপ কলকাতার যুবকদের মুখে মুখে ফিরত। সেসময় আদর্শবাদের মানদণ্ড হয়ে উঠেছিল অনুপ।
এসব চলচ্চিত্র বাংলায় সাম্যবাদী চেতনা বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল। এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের কারণে, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করেও মার্কিন দালালরা পূর্ব বা পশ্চিম বাংলায় সুবিধা করতে পারেনি।
ষাটের দশকে আমেরিকানরা সমস্যাটা চিহ্নিত করতে পেরেছিল। তোপাখানা রোডের আমেরিকান ইনফরমেশন সেন্টার বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে শিল্পী সাহিত্যিকদের ভিড়াতে লাগল। তবে তখন প্রবল জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থানের ফলে তারা স্পেস করে নিতে পারেনি। সুযোগটা আসে আশির দশকে আওয়ামীলীগের মতো জাতীয়তাবাদী শক্তিকে রাজনীতির মাঠ থেকে সরিয়ে দিয়ে।
শিল্প সাহিত্য ও চলচ্চিত্র থেকে আদর্শবাদ ও সাম্যবাদী চেতনা সরিয়ে চটকদারি বিষয় আর ভাড়ামি প্রতিস্থাপন করা শুরু হয়। প্রথমে টিভি স্ক্রিনে পরে চলচ্চিত্রে তা সফলভাবে করে দেখান হুমায়ুন আহমেদ। তবে তিনি শিক্ষিত ও সূক্ষ্ম রুচিসম্পন্ন ছিলেন। তাই বিষয়টিকে কদর্য করে তুলেন নি। ভাড়ামি ও গভীর চিন্তাকে মিলিয়ে মিশিয়ে দিয়েছিলেন।
তবে ন্যাক্কারজনকভাবে আদর্শহীন ভোগবাদী স্ক্রিন উপহার দিতে শুরু করল মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও তার অনুসারীরা। শূন্য দশকে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বৃন্দাবন দাস ও সালাউদ্দিন লাভলুর গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে লেখা নাটককে হটিয়ে দিয়ে তারা আনল উগ্র শহুরে জীবন। সেখানে পরকীয়া উপস্থাপিত হলো স্মার্ট জীবনের অনুষঙ্গ হিসাবে। বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ককে দেখানো হলো শহুরে সংস্কৃতির উপদান স্বরূপ। বহুগামিতাকে দেওয়া হলো সামাজিক স্বীকৃতি। গ্যাং কালচারকে আনা হলো সামাজিক বিনোদন রূপে। লিটনের ফ্ল্যাট রীতিমতো একটা আইকনিক ওয়ার্ড হয়ে গেলো। বাংলা স্ক্রিনে অনুপ অপুর বিপরীতে এলো কাবিলা পাশারা। এরা মিথ্যুক ঠগ ও প্রতারক। অন্যকে ঠকানোর মধ্যেই ওদের সাফল্য প্রতিষ্ঠিত। গালি দেওয়া আর বস্তির ভাষায় কথা বলতে পারা হয়ে গেলো সমসাময়িকতার লক্ষণ।
এই ফারুকীর হাত ধরে এলো ইফতেখার ফাহিম, আশফাক নিপুণ, রেদোয়ান রনিদের মতো আরও কিছু উন্মূল তরুন। অথচ অনেক ভালো প্রস্তুতি নিয়ে আসা তরুণ নির্মাতা মেসবাউর রহমান সুমন, শিবু চন্দ্র শিলরা এদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে গেল। ফারুকীর কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো তৌকির আহমেদ, ফেরদৌস হাসান, বৃন্দাবন দাসরা। ফারুকীরা কী ভয়ানক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাসের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়। রুচিসম্পন্ন জাত শিল্পীরা রুচিহীন নির্মাতাদের কারণে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজই পেত না।
এই ফারুকীর ভাই ব্রাদাররা বাংলাদেশের তরুণদের বৌদ্ধিক বিপর্যয়ে কী ভূমিকা রেখেছিল তা একদিন গবেষণার জনপ্রিয় বিষয়ে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের তরুণ কিশোরদের সামনে আদর্শরূপে ‘জীবন থেকে নেয়া’ কিংবা ‘সিরাজউদ্দৌলা’র আনোয়ার হোসেন রইল না, এলো ‘বিহাইন্ড দ্য স্ক্রিনে’র মোশাররফ করিম। যে প্রতিনিয়ত সবাইকে ঠকাচ্ছে। এমনকি তাকে যে বিশ্বাস করে অনুসরণ করে তাকেও। স্ক্রিনে চার্লি চ্যাপলিনও চুরি করতেন। ঠকবাজিতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। কিন্তু এর মাধ্যমে লন্ডনের নিম্নবিত্ত মানুষের টিকে থাকার লড়াই ফুটে উঠেছে। শ্রেণিদ্বন্দ্ব প্রকটিত হয়েছে। বিপরীতে ফারুকী গঙের ঠগবাজি একধরনের ভাড়ামোজাত বিনোদন।
কিশোর তরুণদের সংস্কৃতির নামে মনোবৈকল্য ধরিয়ে দিয়েছে এরা। এতে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ায় কিশোর গ্যাং-এর জন্ম হয়েছে। এই সমাজবিনষ্টকারীরাই যখন জুলাইয়ে রাস্তায় নামে সরকার উচ্ছেদের দাবিতে, তখন বুঝতে হয়- এতোদিন যে ভাড়ামি তারা করেছিল, সেটা স্রেফ বাজারি সংস্কৃতির চর্চা ছিল না- একটা জাতিকে চিন্তায় পুঁজিবাদের দাস বানানোর চেষ্টা ছিল সেটা। এরা সম্ভাব্য প্রতিরোধকারীদের জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল আগেই। পুলিশ হত্যার পটভূমি ত ‘মহানগর’ ওয়েব সিরিজ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল।
কিন্তু নন ম্যাট্রিক আর ভার্সিটি ড্রপ আউটরা এতো বড়ো বৌদ্ধিক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলল কীভাবে? আসলে এদের পেছনে ছিল পাকা মাথার খেলোয়াড়েরা। যারা সোশ্যাল ডাইনামিকস বোঝে। বোঝে সাহিত্যও। লক্ষ করুন, ২০০৪-এ ফারুকীর উত্থান যে ‘ব্যাচেলর’ সিনেমা দিয়ে, সেটা কিন্তু আনিসুল হকের লেখা। আনিসুল হক তখন শুধু প্রথম আলোর উপ সম্পাদক নন, মার্কিন দূতাবাসের জনসংযোগ কর্মকর্তা মেরিনা ইয়াসমিনের স্বামীও।
ফারুকী আনিসুল হকের ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ চলচ্চিত্রটা সরকার নামিয়ে দেয়ার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়ে তৈরি। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র যে যুবক ডিসিকে জিম্মি করে সরকার থেকে দাবি আদায় করতে চায়, সিনেমার শুরুতে সে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিল। অর্থাৎ কোনো বৈপ্লবিক আদর্শ বা লক্ষ্য থাকবে না, কিন্তু সরকার ফেলে দিতে হবে। তারপর যা হওয়ার হবে। ৫ আগস্টে তার সফল পরিসমাপ্তি দেখলাম আমরা।
এই আনিসুল হক মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় মেতে ছিলেন। গণ্ডায় গণ্ডায় বই লিখেছেন। ফারুকী সস্ত্রীক মুজিব বন্দনায় মত্ত ছিল। আজ প্রশাসনের বহু কর্মকর্তা কেবল মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু নিয়ে বই লেখার অপরাধে অপরিমেয় নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। কিন্তু আনিসুল হক ও ফারুকীরা নির্ভার। কারণ এরা ‘ট্রজন হর্স’ হয়ে লুকিয়ে ছিল প্রগতিশীল শিবিরে। আমরা তাদের ভাষা ও কাহিনীর ভাঙাগড়াকে এক্সপেরিমেন্ট ভেবে গুরুত্ব দেইনি। আদতে তারা আমাদের মগজে বিষ পুরে দিচ্ছিল।
আওয়ামী লীগ সরকার নামিয়ে এরা দেশের যত বড়ো ক্ষতি করেছে, তার চেয়ে বড়ো ক্ষতি তারা আগেই করে ফেলেছে। এর আফটার শক ছিল ৫ আগস্ট এবং এর পরে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ৷ একটা স্বাধীন দেশে জন্ম নেয়া তরুণরা দেশ স্বাধীনের ৫০ বছর পর কেন পরাধীন হতে চায়? কেন তারা পূর্বপুরুষের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেন তাদের মধ্যে আবেগ সঞ্চার করতে পারে না? এসব আসলে অসুস্থ সংস্কৃতি উপভোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
(A Team)
