জাহীদ রেজা নূর
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফলই এখন আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। বিজেপি এ রকম ভূমিধস বিজয় পাবে, তা সম্ভবত বিজেপি দলটিও ভাবেনি। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল? তৃণমূল কংগ্রেস যেন বানের জলে ভেসে গেছে। নির্বাচনের আগে অনেকেই ভেবেছিলেন, বাম দলগুলোর প্রতি জনগণের সমর্থন বাড়বে, বিধানসভায় বেশ কিছু আসনে বামদের দেখা যাবে। ধারণা করা হয়েছিল, কংগ্রেসও এবার বেশ কয়েকটি আসন পাবে। কিন্তু নির্বাচনী লড়াইটা একেবারেই বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে হয়েছে এবং সে লড়াইয়ের বিজয়ী দল বিজেপি।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় এর আগে বিজেপি দাঁত বসাতে পারেনি। কেন্দ্রের পাশাপাশি ধীরে ধীরে অনেকগুলো অঙ্গরাজ্যে বিজেপি শিকড় গেড়েছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ হিন্দুত্ববাদী একটি দলকে তাদের চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত করবে না—এ রকম একটা মত প্রচলিত ছিল। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস তাদের শাসনামলে যে বদনাম কুড়িয়েছে এবং বিজেপির পাশাপাশি বাম দলগুলোও যেভাবে তৃণমূলবিরোধী প্রচার চালিয়েছে, তাতে তৃণমূলের পতন হবে, এমনটা অনেকেই ধারণা করেছিলেন। কিন্তু পতনটা এ রকম সৃষ্টিছাড়া হবে, সেটা কল্পনা করা কঠিন ছিল।
ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ডানপন্থার বলয়ে প্রবেশ করল।
২.
ডানপন্থা বললেই অনেকে ধারণা করে নেন যে উগ্রপন্থার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু ডানপন্থা মানেই উগ্রপন্থা নয়, সেটা কখনো কখনো উগ্রতার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সে কথাটা স্পষ্ট করে বলা দরকার। এ সময় পৃথিবীজুড়ে উগ্রপন্থীদের সংখ্যা বাড়ছে, এটা যেমন ঠিক, তেমনি তার বিপরীতেও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে মানুষ, সে কথাও স্বীকার করে নিতে হবে।
মোটাদাগে ডানপন্থা বলতে আমরা যা বুঝি, তা নিয়ে একটু আলোচনা করা ভালো। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্নায়ুযুদ্ধের সময় মূলত ডান ও বামে বিভাজিত হয়ে গিয়েছিল পৃথিবী। এ সময় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মাধ্যমে কিছু কিছু মানুষ, কিছু কিছু দেশ শান্তির দিশা খুঁজেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত, শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের দলে।’ বামপন্থীদের স্লোগানও মোটামুটি শোষক-শোষিত ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এই শোষিত মানুষের মুক্তি কি মিলেছে আদৌ? এ প্রশ্নটি এখনো আগের মতোই, বরং বলা যায় আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে আমাদের সামনে জ্বলজ্বল করছে।
বর্তমানে ধ্রুপদি বাম বা ডান নিয়ে যদি আলোচনা করতে হয়, তাহলে বাস্তবের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যাবে না। তাই বর্তমানকে জড়িয়ে ধরে আলোচনাটা করা দরকার। যেমন, ইউরোপের অনেক মডারেট ডানপন্থী দলগুলোও নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়ার জন্য উগ্র ডানপন্থীদের মতোই আচরণ করে থাকে।
ডানপন্থার একটা প্রধান পরিচয় ফুটে ওঠে জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রসত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে। নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য অভিবাসন ও বহুসংস্কৃতিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে ডানপন্থা। শক্তিশালী একনায়কের প্রতি সমর্থন দেওয়াও ডানপন্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য (তবে বামপন্থাতেও সেটা প্রকটভাবেই রয়েছে, সেটা বলে রাখা ভালো)। অর্থনীতির ক্ষেত্রে মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা এরা বলে, আবার কখনো কখনো নিজেদের শিল্প রক্ষার কথাও বলে। অর্থাৎ তা হয়ে ওঠে দুধারি তলোয়ার। বিভিন্ন দেশে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে ডানপন্থা এখন পৃথিবী গ্রাস করে নিতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ডানপন্থা বিকশিত হচ্ছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে। তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানের পাশাপাশি অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থান, জাতীয় শিল্পরক্ষা ইত্যাদি বাগাড়ম্বর ‘সাদা’ আমেরিকানদের উগ্রতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই স্লোগানগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে বটে, কিন্তু সেটা একশ্রেণির আমেরিকানের কাছে। আর তাতে অন্য পক্ষ থাকছে শঙ্কায়। আর এভাবেই সমাজে বিভাজন বেড়ে চলেছে।
খুবই অবাক করা ব্যাপার হলো, ইউরোপের অনেক দেশেই ডানপন্থা বা কট্টর ডানপন্থা জায়গা করে নিয়েছে। এখানেও অভিবাসন একটি বড় বিষয়। ইসলাম ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়েও এখানে রয়েছে বিতর্ক। আর রয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, হাঙ্গেরিতে ডানপন্থীরা যথেষ্ট শক্তিশালী। আবার ফ্রান্সে চরম ডানের বিরুদ্ধে কোয়ালিশন করে মধ্য ডান জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছে। আবার ব্রাজিলের মানুষ গত নির্বাচনে বামপন্থী লুলা দা সিলভাকে বেছে নিয়েছিল, যদিও তাদের সংসদে ডানপন্থীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে অনেক আগে থেকেই হিন্দু জাতীয়তাবাদের কার্ড হাতে হাজির হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত এখন আর তার অসাম্প্রদায়িক পরিচয়টি টিকিয়ে রাখতে পারছে না।
ইসলামি ডানপন্থার প্রকাশ ও বিকাশ নিয়েও লম্বা আলোচনা করা যায়। তার কিছু আলামত হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে আমাদের দেশের জনগণ।
৩.
তাহলে কি বলতে হবে, এই একবিংশ শতাব্দী ডানপন্থার যুগ হিসেবে নিজের পরিচয় লিপিবদ্ধ করে ফেলল? একটু আগে থেকে আসলে বিষয়টি বোঝা সহজ হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর অনেকেই ভেবেছিলেন উদার গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার অর্থনীতি জয়ী হয়ে গেছে। পুঁজিবাদী মহল থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, বিশ্বায়নের ফলে সবাই উপকৃত হবে। কিন্তু বিশ্বায়নের ফল সবার জন্য সমান হয়নি। বেশ কিছু ঘটনা ঘটল এ সময়টিতে। পশ্চিমা বিশ্বে তৈরি হলো একধরনের সংকট। বিশ্বায়নের ফলে শিল্প-কারখানাগুলো চলে গেল কম মজুরির দেশে। ফলে শিল্পোন্নত পশ্চিমা বিশ্বের অনেক শ্রমিক চাকরি হারালেন। প্রযুক্তি ও কারিগরি উন্নয়নের ফলে মানুষের কাজ কমে গেল। পাশাপাশি বড় শহরগুলো ধনী হতে থাকল, ছোট শহরগুলো পিছিয়ে পড়তে থাকল। এতে অসন্তোষ বাড়ল। মানুষের মনে জমা হওয়া এই অসন্তোষ কাজে লাগাল ডানপন্থীরা। খেয়াল করলেই দেখা যাবে, একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ইউরোপের দেশে দেশে ডানপন্থার প্রকট উত্থান ঘটতে শুরু করেছে।
অভিবাসন নিয়ে সংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ অভিবাসী হয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় গেছে। উদারনীতির ফলে তারা সে দেশগুলোর নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকে, নাগরিকত্ব প্রত্যাশা করে। চাইলেই দেশ থেকে তাদের বের করে দেওয়া যায় না। কিন্তু এর ফলে ইউরোপের অনেক দেশের নাগরিকেরা মনে করে থাকেন, মুসলিম অভিবাসনের কারণে তাঁদের সংস্কৃতি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। তাতে সংস্কৃতি বদলে যাচ্ছে। ফলে এসব দেশের ডানপন্থীরা যখন বলে, ‘সীমান্ত রক্ষা করো, জাতীয় পরিচয় রক্ষা করো’—তখন সহজেই অভিবাসনবিরোধী জনগণ ডানপন্থীদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারা তখন একেবারেই নিজস্ব নিয়মে অন্যকে বর্জন করার মতো কঠোর হয়ে যায়।
ভারতে বিজেপি কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ দীর্ঘদিন ধরেই হিন্দু পরিচয়টিকে রাজনীতির সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হিসেবে দেখে আসছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতির স্বীকৃতি তাদের অ্যাজেন্ডা। এতে সংখ্যালঘুরা বিপদে পড়বে কি না কিংবা তাতে ধর্মীয় মেরুকরণ হবে কি না, তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। গোটা ভারতে এখন যে হিন্দুধর্মীয় উগ্রপন্থা জায়গা করে নিচ্ছে, সেটা এই উপমহাদেশে ধর্ম সংঘাতের শঙ্কা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে দেশ হিসেবে সামরিক আর প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া পাকিস্তানও নানাভাবে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। এর প্রভাব বাংলাদেশে কতটা পড়েছে, সেটা বোঝা গেছে অধ্যাপক ইউনূসের আমলে। সে সময় চরমপন্থী মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর আস্ফালন এবং নানাভাবে মব সৃষ্টি করে সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘটনা কেউ ভুলে যাবে না। মেটিকুলাস ডিজাইনে ঠিক কী ধরনের দেশ গড়ে তোলার কথা ভেবেছিল ইউনূসের শিষ্যরা, সেটা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, ক্রমেই প্রকাশ্যমান।
৪.
ভালো চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। অন্তত নিজেকে মধ্যবিত্ত হিসেবে পরিচয় দেওয়ার মতো অবস্থাও থাকছে না অনেকের। এ রকম অনিশ্চয়তার সমাধান খোঁজার জন্য তাদের অনেকে উগ্র পথের সন্ধান করছে। সেই পথ খুঁজতে গিয়ে আত্মপরিচয় নিয়ে ভাবছে তারা। ভাবছে নিজের সংস্কৃতির কথা। ভাবছে সমাজের কথা। কিন্তু আমাদের দেশের মতো দেশগুলোতে এই পরিচয় খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে দিন দিন। ভাবা হয়েছিল, জাতিগত পরিচয় দিয়েই গড়ে উঠেছে যে দেশ, সে দেশে অন্য সব পরিচয়ের চেয়ে জাতিগত পরিচয়টাই হবে সবার ওপরে। কিন্তু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজনের ফলে সেই পরিচয়টি আঁকড়ে না ধরে ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে আকৃষ্ট হয়েছে অনেক মানুষ। সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রেও তারা বঙ্গীয় ও আরবীয় সংস্কৃতি নিয়ে দোটানায় পড়েছে। সেই প্রশ্নগুলো আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যেগুলোর উত্তর বায়ান্ন ও একাত্তরের অর্জনের মাধ্যমে পাওয়া হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছিল।
কেন এমন হলো? এর একটা উত্তর হতে পারে, আগে নাগরিকদের মানসিক সচেতনতার ভিত্তি ছিল পরিবার, স্কুল, টেলিভিশন-রেডিও, সংবাদপত্র। এখন অ্যালগরিদমভিত্তিক অনলাইন দুনিয়ার মাধ্যমেই বহুলাংশে তা তৈরি হয়। ছোট ভিডিও, তীক্ষ্ণ বক্তব্য, সিস্টেমবিরোধিতা কিংবা বিতর্কিত মতামত দিতে পারলে তার প্রতি নাগরিকদের আগ্রহ বাড়ে। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখে মানুষ, যাচাই-বাছাই না করে তা থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।
কী করে বামপন্থীরা বিংশ শতাব্দীতে অর্জন করা জনপ্রিয়তাকে হারিয়ে ফেলল, তা নিয়ে আলাদা একটা লেখা হতে পারে। এখানে শুধু বলি, বাম বা উদারপন্থী ধারাটিকে সাধারণ মানুষ এখন এলিট বলে ভাবে। কারণ, খুব জরুরি সময় জনগণ বামপন্থীদের কাছে পায় না। তারা মূলত এখন তাত্ত্বিক আলোচনা এবং পুরোনো কথাবার্তায়ই ব্যস্ত। তারা আর সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলে না। আর এই ফাঁকে ডানপন্থাও সিস্টেমবিরোধিতাকে প্রকাশ করে বামপন্থার করণীয় কাজের জায়গাটা দখল করে ফেলছে। মূলধারার মিডিয়া, বড় বিশ্ববিদ্যালয়, করপোরেট সংস্কৃতির সমালোচনা এখন উঠে আসছে ডানপন্থার বিদ্রোহীদের কাছ থেকেই। এটা অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট ডানপন্থা। শুরুতে তা প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনে হলেও আখেরে তা ওই উগ্রতার দিকেই ধাবিত হয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় তা দেখা গেছে।
এই আলোচনাটা এখানে শেষ করা যাবে না। বাংলাদেশ কীভাবে মবের মুল্লুকে পরিণত হলো এবং অশ্লীলতা কীভাবে রাজনীতির ভাষা হয়ে উঠল, সেগুলো নিয়ে একটা লেখাই লিখতে হবে। তবে সবকিছু মিলে চরম ডানপন্থার এই উত্থানের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করার পাশাপাশি এ কথাও বলতে চাইছি, যখন বড় ঝড় ওঠে, তখন অনেক ভাঙাভাঙির পর আবার নতুন করে গড়ে ওঠে নতুন ভাবনা। সেটা ভুলে গেলে চলবে না।
