মুহাম্মদ ইউনূস এখন আর ক্ষমতায় নেই। গত ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি সরকার দায়িত্বে। কিন্তু ইউনূসের বিরুদ্ধে যে পাহাড়সমান অভিযোগ জমে উঠেছে গত দেড় বছরে, সেগুলোর কোনো বিচার হচ্ছে না। হওয়ার লক্ষণও নেই। এই নীরবতাটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ইউনূসকে আমরা চিনতাম নোবেলজয়ী হিসেবে, ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ হিসেবে। সেই পরিচয়ের আড়ালে যা চলছিল, তা বের হয়ে আসতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সরকারি অর্থে, গরিব মানুষের কল্যাণের কথা বলে। ১৯৮৩ সালে যখন ব্যাংকটি শুরু হয়, তখন মোট মূলধনের ৬০ শতাংশের বেশি ছিল সরকারের টাকা। বাকিটা ছিল ঋণগ্রহীতাদের। ইউনূসের নিজের একটি পয়সাও ছিল না সেখানে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবহার করেই তিনি গড়ে তুলেছেন একের পর এক কোম্পানি, ফান্ড, ট্রাস্ট। আর সেগুলোর শীর্ষে সবসময় তিনি নিজে।
গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভার সিদ্ধান্তে গঠিত গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ ফান্ডের মাধ্যমে মোট ২৮টি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। এগুলো আইনত গ্রামীণ ব্যাংকেরই অঙ্গপ্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ রাষ্ট্রের সম্পদ থেকে জন্ম নেওয়া। কিন্তু ২০২১ সালের পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদে গ্রামীণ ব্যাংকের কোনো প্রতিনিধি নেই। শুধু ইউনূস বসে আছেন চেয়ারম্যান হয়ে। রাষ্ট্রের পয়সায় গড়া প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির মালিকানায় চলে যাওয়ার এটি একটি পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ হতে পারে।
গ্রামীণ টেলিকমের গল্পটা আরও স্পষ্ট। এই প্রতিষ্ঠানটি গ্রামীণফোনের ৩৪ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক। গ্রামীণফোন প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে। সেই মুনাফার বড় অংশ আসে গ্রামীণ টেলিকমের ঘরে। কিন্তু গ্রামীণ টেলিকম আইন ভেঙে তার লভ্যাংশের প্রায় অর্ধেক দিয়েছে গ্রামীণ কল্যাণকে, যে প্রতিষ্ঠানটি মোটেও গ্রামীণফোনের শেয়ারহোল্ডার নয়। শুধু তাই না, এই পুরো প্রক্রিয়ায় দশকের পর দশক ধরে কর্পোরেট কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। যেখানে ৩৫ থেকে সাড়ে ৩৭ শতাংশ কর দেওয়ার কথা, সেখানে দেওয়া হয়েছে ১০ থেকে ২০ শতাংশ। ২৮ বছরের হিসাব ধরলে শুধু গ্রামীণ টেলিকমেই ফাঁকি গেছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।
ইউনূসের ব্যক্তিগত ট্যাক্স ফাইলেও একই চিত্র। বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আসত, কিন্তু সেই পুরো টাকার তথ্য সরকারকে দেওয়া হতো না। ২০০৭-০৮ থেকে ২০১৪-১৫ পর্যন্ত প্রতিটি কর বছরে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যা ঢুকেছে আর তিনি ট্যাক্স ফাইলে যা দেখিয়েছেন, তার মধ্যে কোটি কোটি টাকার ফারাক। এটা ভুলক্রমে হওয়ার সুযোগ নেই। প্রতি বছর, ধারাবাহিকভাবে।
হাই কোর্ট একসময় তাকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার অনাদায়ি কর পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিল। ইউনূস বলেছিলেন, আদালত বললে দেব। কিন্তু ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর তিনি যখন ক্ষমতায় বসলেন, সেই মামলা প্রত্যাহার হয়ে গেল। শুধু কর মামলা না, শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলা, অর্থ পাচারের মামলা সবকিছু একে একে খারিজ হয়ে গেল। শপথ নেওয়ার আগের দিন একটা মামলায় খালাস, পরের দিন আরেকটায়। এত দ্রুত এত মামলা খারিজ হওয়ার নজির আদালতের ইতিহাসে বিরল।
এরপর যা হলো তা আরও ভয়াবহ। প্রধান উপদেষ্টার চেয়ারে বসেই তিনি তার নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একের পর এক সুবিধা আদায় করে নিলেন। গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র তিন মাসে অনুমোদন পেল, যেখানে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বছরের পর বছর অপেক্ষা করে। গ্রামীণ টেলিকমের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পেমেন্ট সার্ভিস লাইসেন্স পেল। গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের শেয়ার ২৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হলো। গ্রামীণ ব্যাংককে ২০২৯ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়া হলো। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই দৃষ্টান্ত দেশের ইতিহাসে সম্ভবত নতুন।
এখন প্রশ্ন হলো, ইউনূস ক্ষমতা ছেড়ে গেছেন। বিএনপি এসেছে। কিন্তু এই বিশাল দুর্নীতির কোনো বিচার হচ্ছে না কেন? এনবিআরের যে তদন্ত ইউনূস বন্ধ করিয়ে দিয়েছিলেন, সেগুলো আবার শুরু হচ্ছে না কেন? যে মামলাগুলো রাজনৈতিক চাপে খারিজ হয়ে গেছে, সেগুলো পুনরুজ্জীবিত করা কি অসম্ভব?
বিএনপির নীরবতার পেছনে কয়েকটা কারণ থাকতে পারে। একটা হলো কূটনৈতিক হিসাব। ইউনূসের পশ্চিমা জগতে ব্যাপক সংযোগ আছে। তার বিরুদ্ধে মামলা চালু করলে আন্তর্জাতিক মহলে ঝামেলা হবে বলে একটা আশঙ্কা থাকতে পারে। আরেকটা কারণ হতে পারে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্য। ইউনূসকে যারা ক্ষমতায় এনেছিলেন, তাদের সঙ্গে বিএনপির কিছু অংশের নানামুখী সম্পর্ক আছে। তৃতীয় একটা সম্ভাবনা হলো বিএনপি নিজেও চায় না এই নজির তৈরি হোক যে ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পরে একজন সরকারপ্রধানকে দুর্নীতির দায়ে বিচারের মুখে পড়তে হয়। এই নজির একদিন তাদের নিজেদের জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে।
কিন্তু এই যুক্তিগুলো মানুষ মানে না। যে মানুষ দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানোর স্বপ্ন বেচে নিজে বিলিয়নিয়ার হয়েছেন, যে মানুষ গরিবের ঋণের সুদের টাকায় নিজের পকেট ভারী করেছেন, যে মানুষ রাষ্ট্রের সম্পদকে নিজের পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে নিয়েছেন, তার বিচার না হওয়াটা স্রেফ অবিচার। এবং এই অবিচারের দায় যে সরকার এখন ক্ষমতায় আছে, তাদেরও।
ইউনূসের নোবেল পুরস্কার তার অপকর্মকে ঢেকে রাখতে পারবে না। পুরস্কার আর সম্মান দুটো আলাদা জিনিস। একটা কমিটির দেওয়া, আরেকটা মানুষের দেওয়া। মানুষ এখন হিসাব করছে।
