পৃথিবীর সবচেয়ে গরীব রাষ্ট্রপ্রধানের গল্প, যিনি শিখিয়েছেন – “নেতৃত্ব মানে সেবা”
ছিল না প্রটোকল, ছিল না প্রাসাদ, ছিল না বিলাস।
তবুও তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে।
নাম তাঁর হোসে আলবার্তো “পেপে” মুজিকা কর্ডানো
– যিনি হয়ে উঠেছিলেন সারা বিশ্বের চোখে এক ব্যতিক্রমী নেতার প্রতিচ্ছবি।
জন্ম: ২০ মে ১৯৩৫, মন্টেভিডিও, উরুগুয়ে
মৃত্যু: ১৩ মে ২০২৫, ৮৯ বছর বয়সে (খাদ্যনালীর ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ এক বছরের লড়াই শেষে)
——————————————
জন্ম ২০ মে, ১৯৩৫ সালে উরুগুয়ের, মন্টেভিডিওতে এক কৃষকের ঘরে, শৈশবেই বাবার মৃত্যু, জীবনের শুরুটাই ছিল দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতায়। বেকারির ডেলিভারি বয়, হোটেল কর্মচারী, এমনকি লিলি ফুল তুলে বিক্রি করা—এই ছিল তার কৈশোরের জীবন।
তারুণ্যে তিনি একজন সাইকেল চ্যাম্পিয়ন, পরে গেরিলা যোদ্ধা। ১৯৬০-এর দশকে কিউবান বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে উরুগুয়ের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে দীর্ঘ ১৪ বছর বন্দি জীবন কাটাতে হয়, যার বেশিরভাগ সময়ই একাকী অন্ধকার সেলে। এই বন্দি জীবনই তাকে ভাবনার গভীরতায় পৌঁছে দেয়।
২০০৫ সালে তিনি মন্ত্রী এবং ২০১০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অথচ এই সময়েও তিনি বেছে নেন খামারে স্ত্রী লুসিয়ার সঙ্গে ফুল চাষ করে জীবন কাটানো। রাষ্ট্রীয় প্রাসাদ নয়, মাটির ঘরে, কর্দমাক্ত পথ পেরিয়ে খামারে ফেরা ছিল তার রুটিন। তার তিন পা-ওয়ালা প্রিয় কুকুর ‘মানুয়েলা’ ছিল সেই জীবনের অংশ।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার মাসিক বেতন ছিল ১২ হাজার ডলার, যার ৯০% তিনি দান করে দিতেন—নিজের জন্য রাখতেন মাত্র ৭৮০ ডলার। না ছিল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, না কোনো বিলাসী স্বপ্ন। একবার বলেছিলেন—
“গরিব হল তারা, যাদের সব কিছু খুব বেশি বেশি দরকার… আমি একজন মিতব্যয়ী, আমি স্বাধীনভাবে বাঁচি। লিভিং ফ্রুগালি ইজ এ ফিলোসফি অব লাইফ। আমি দরিদ্র নই।”
তিনি মুখে যা বলতেন, কাজে তা প্রমাণ করতেন। ক্ষমতায় থেকেই বৈপ্লবিক সংস্কার এনেছেন—গাঁজার বৈধতা, গর্ভপাত ও সমকামী বিবাহকে আইনি স্বীকৃতি। জাতিসংঘের মঞ্চেও স্পষ্টভাষায় সমালোচনা করেছেন বৈষম্য ও ভোগবাদের।
তার ১৯৮৭ সালের পুরনো ভক্সওয়াগন বিটল গাড়িটি যখন এক আরব শেখ ১০ লাখ ডলার দিয়ে কিনতে চাইলেন, তিনি বলেছিলেন—“বিক্রি করলে টাকাটা গরিবদের দিয়ে দেব।” এমন ছিলেন তিনি—মাটির কাছাকাছি, হৃদয়ের গভীরে।
বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে যখন একেকজন রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠেন, তখন হোসে মুজিকা ছিলেন এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ—ক্ষমতায় থেকেও সাধারণ মানুষের পাশে থাকা এক নেতা। উরুগুয়ের মানুষ তাকে ভালোবেসে ডাকত ‘এল পেপে’ নামে। আর আমরা তাকে স্মরণ করবো এক অনন্য মানুষ হিসেবে, যিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন, রাজনীতি মানে আসলে জনসেবাই।
গত ১৩ মে, ২০২৫ চির বিদায় নিলেন উরুগুয়ের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হোসে মুজিকা, যিনি ‘বিশ্বের সবচেয়ে গরিব প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি চলে গেলেন ৮৯ বছর বয়সে, দীর্ঘ এক বছর খাদ্যনালীর ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে।
তিনি ছিলেন নাস্তিক, নিঃসন্তান, তবুও পেয়েছেন দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় সব সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার।
তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি একতাবদ্ধ ল্যাটিন আমেরিকা।
আজ যখন বিশ্বের নেতৃত্ব প্রতিযোগিতা আর ক্ষমতার খেলায় ডুবে, তখন হোসে মুজিকা ছিলেন এক ব্যতিক্রমী প্রতিমূর্তি—নেতৃত্ব যার নাম সেবা, বিনয় আর মানবতা।
তিনি নোবেল পুরস্কার পাননি—তাতে কিছু যায় আসে না।
বরং নোবেলই সুযোগ হারিয়েছে এক প্রকৃত শান্তির দূতকে সম্মান জানাবার।
ইশ, আমার দেশেও যদি এমন একজন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্ম হতো…
আজ তাঁর জন্মদিনে মাথা নত করে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই—
এল পেপে, আপনি আমাদের হৃদয়ে চিরজীবী। হোসে মুজিকা শুধু উরুগুয়ের নন, তিনি গোটা বিশ্বের বিবেক।
