রিটন খান
মানুষকে যদি খুব নির্মমভাবে সংজ্ঞায়িত করতে বলা হয়, তাহলে হয়তো বলতে হয় আমরা আসলে সামান্য কিছু খনিজ, কিছু কার্বন, আর এক ব্যাগ পানি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো প্রাণী। শুনতে একটু অসম্মানজনক মনে হতে পারে। কারণ আমরা নিজেদের নিয়ে অনেক মহৎ গল্প বলতে অভ্যস্ত। আমরা বলি আত্মা আছে, ভাগ্য আছে, নিয়তি আছে, বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। আমরা নিজেদের নিয়ে এমন সব বাক্য তৈরি করি যেন মহাবিশ্ব অনেক সভা-সমিতি করে, কাগজপত্রে সিলমোহর মেরে আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। অথচ জীববিজ্ঞানের দিক থেকে দেখলে বিষয়টা অদ্ভুত রকমের সাধারণ। শরীরের অধিকাংশই পানি। কিছু রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া। কিছু বৈদ্যুতিক সংকেত। হৃদপিণ্ড নিয়মিত কাজ করছে, নিউরনের ভেতর ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ দৌড়াচ্ছে, আর আমরা এই সমগ্র ব্যবস্থাটার নাম দিয়েছি জীবন।
আমি মাঝে মাঝে এটা ভেবে মজা পাই যে মানুষের সমস্ত অহংকার, সমস্ত প্রেম, সমস্ত সাহিত্য, সমস্ত যুদ্ধ, সমস্ত ধর্মতত্ত্ব, সমস্ত রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সামান্য কিছু বিদ্যুতের ওঠানামার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মাথার ভেতরে এক-দুটি সংকেত ভুল জায়গায় পৌঁছালে একজন মানুষ প্রিয় মুখ ভুলে যেতে পারে। আরেকটু এদিক-ওদিক হলে সে পৃথিবীকেই চিনতে পারে না। আমরা নিজেদের খুব স্থির কিছু ভাবি, কিন্তু আসলে আমরা স্থির নই। আমরা অপেক্ষমাণ। যেন ভেতরে কোথাও সুইচ অফ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি, কারও স্পর্শের অপেক্ষায়।
জীবনের অনেকটা সময় আমি এই অপেক্ষাটাকে বুঝতে পারিনি। মনে হতো, মানুষ বোধহয় শুধু বেঁচে থাকে। পরে বুঝলাম, মানুষ শুধু বাঁচে না, মানুষ উত্তেজিত হতে চায়। জেগে উঠতে চায়। বিদ্যুতায়িত হতে চায়। কেউ বই পড়ে আলো জ্বালায় নিজের মধ্যে, কেউ প্রেমে পড়ে, কেউ ঈশ্বরের কাছে যায়, কেউ শহর বদলায়, কেউ পেশা বদলায়, কেউ আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নতুন নিজের খোঁজ করে। আমরা ভাবি, পরের শহরে গেলে হয়তো জীবন শুরু হবে। পরের চাকরিতে গেলে। পরের সম্পর্কে গেলে। পরের বছরে গেলে। যেন আমাদের বর্তমান জীবন একটা অপেক্ষাকক্ষ, আর আসল জীবন কোথাও সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি ছোটবেলায় ভাবতাম বড় হলেই নিশ্চয় মানুষ স্থির হয়ে যায়। বড়রা এমনভাবে কথা বলত যেন তারা পৃথিবীর গোপন মানচিত্র পেয়ে গেছে। কিন্তু বয়স বাড়ার পর দেখি, বড় মানুষও আসলে অপেক্ষা করছে। শুধু অপেক্ষার ভাষা বদলে যায়। শিশুরা অপেক্ষা করে ঈদের জামার জন্য, বড়রা অপেক্ষা করে পদোন্নতির জন্য, প্রেমের জন্য, স্বীকৃতির জন্য, কিংবা এমন কিছুর জন্য যার নাম তারা নিজেরাও স্পষ্ট করে বলতে পারে না।
সমস্যা এই নয় যে আমরা আলো খুঁজছি। মানুষ আলো খুঁজবেই। সমস্যা অন্য জায়গায়। আমরা খুব সহজেই সেই সুইচ অন্যের হাতে তুলে দিই। এমন মানুষের হাতে, যারা নিজেরাই অন্ধকারে বসে আছে। এমন মানুষের হাতে, যারা জানেই না অন্য মানুষের ভেতরের আলো নিয়ে কী করতে হয়।
আমি দেখেছি কেউ নিজের সমস্ত আনন্দ এক মানুষের ওপর রেখে দেয়। তার হাসি থাকলে আমি হাসব, তার ভালোবাসা থাকলে আমি বাঁচব, তার স্বীকৃতি থাকলে আমি মূল্যবান হব। এমন এক অদ্ভুত ক্ষমতা হস্তান্তর। যেন নিজের হৃদয়ের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকানা লিখে দেওয়া হচ্ছে অন্য কারও নামে। অথচ মানুষ খুব দক্ষ বিদ্যুৎ প্রকৌশলী নয়। বেশিরভাগ মানুষ নিজেদের ভাঙাচোরা তারই ঠিকমতো সামলাতে পারে না।
তারপর একদিন শর্ট সার্কিট হয়।
তখন আমরা বলি, জীবন আমাকে হতাশ করেছে। প্রেম আমাকে ভেঙেছে। পৃথিবী নিষ্ঠুর। যদিও অনেক সময় পৃথিবী নিষ্ঠুরের চেয়ে বেশি উদাসীন। সে বসে বসে নিজের নিয়মে ঘুরছে। আমরা নিজেরাই ভুল ঠিকানায় নিজের ভেতরের সুইচ জমা রেখে এসেছি।
এখন মনে হয় মানুষের ভঙ্গুরতা ট্র্যাজেডি নয়। ভঙ্গুর হওয়া স্বাভাবিক। কাঁচ ভাঙে, মাটি ভাঙে, শরীর ভাঙে, বিশ্বাসও ভাঙে। ট্র্যাজেডি হচ্ছে, আমরা নিজেরা নিজের আলো জ্বালাতে শেখার আগে অন্যের হাতে দিয়াশলাই তুলে দিই।
হয়তো বয়সের একটা কাজ এই শিক্ষা দেওয়া যে কেউ আমাদের বিদ্যুতায়িত করতে আসবে না। কেউ এসে আমাদের স্থায়ীভাবে জাগিয়ে রাখবে না। মাঝে মাঝে মানুষ আসবে, কিছুক্ষণ আলো দেবে, কিছুক্ষণ উষ্ণতা দেবে, তারপর চলে যাবে। শহর বদলাবে, কাজ বদলাবে, মুখ বদলাবে। কিন্তু ভেতরের ছোট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটা শেষ পর্যন্ত নিজেরই রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়।
অদ্ভুত কথা হলো, এটা বুঝতে পারার পর আমি মানুষকে কম ভালোবাসিনি। বরং একটু বেশি করেছি। কারণ তখন আর কাউকে সূর্য হতে বলার প্রয়োজন পড়ে না। একটি মোমবাতিও যথেষ্ট মনে হয়। কখনও একটি বাক্য। কখনও একটি বই। কখনও বিকেলের নীরবতা।
কখনও শুধু এইটুকু জানা, আমি এখনও জেগে আছি। এখনও ভেতরে কোথাও ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সংকেত চলাচল করছে। এখনও এই পানি-ভরা শরীরটা নীরবে বলছে, আরেকটু থাকি। আরেকটু দেখি।
