যদি তোমাদেরকে বলা হয় একটা কফিনের মধ্যে গোটা জীবন কাটাতে হবে, যেখানে খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে টিভি দেখা, জামাকাপড় রাখা, ফ্রিজ রাখা থেকে শুরু করে নিত্যদিনের যাবতীয় জিনিস মজুত রাখতে হবে, তাহলে কি তোমরা রাজি হবে? না, এটা মিস্টার বিস্টের কোনো ভিডিও নয়, বাস্তব চিত্র। মাত্র ১৬ বর্গফুট বা একটা কফিনের মতো জায়গায় একটা মানুষ থাকে, কখনো বা দুজন। হ্যাঁ, মাত্র ১৬ বর্গফুট। একজন মানুষের পুরো দৈনন্দিন কাজ থেকে ঘুমানো সবটাই ওইটুকু জায়গাতে হয়। রান্নার আলাদা কোনো জায়গা নেই, বাথরুমের বেসিনকে সিঙ্ক হিসাবে ব্যবহার করে তারা।
বিশ্বের মানচিত্রে এমন কিছু শহর আছে যাদের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিলাসবহুল বহুতল আর অত্যাধুনিক জীবনযাত্রা, চীনের হংকং তেমনি এক শহর। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম ধনী শহরের এই ভয়ংকর চিত্রটা আজ তোমাদের বলব। হংকং বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে দামি আবাসন বাজার। এর কারণ হলো—প্রথমত শহরের জমির পরিমাণ খুব সীমিত। আর বেশিরভাগ অংশ পাহাড় এবং বনে ঢাকা। অন্যদিকে অতিরিক্ত জনসংখ্যা। ফলত বাড়ির দাম ও ভাড়া এতটাই বেশি যে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে একটি সাধারণ ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া প্রায় অসম্ভব। এই কারণেই শহরের পুরনো বিল্ডিংগুলোতে বড় ফ্ল্যাট ভেঙে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট ঘর। এই ঘরগুলোকেই বলা হয় কফিন হাউস বা কেজ হোম।
একটি বড় ফ্ল্যাটকে বেআইনিভাবে ভাগ করে ১০ থেকে ২০টি, কখনো বা ৩০টি ছোট ছোট ঘর করা হয়। প্রতিটি ঘরে কখনো কখনো ১ জন বা ২ জন থাকে। এই ঘরগুলোর গড় আকার—১৫ থেকে ২০ বর্গফুট। কিছু ক্ষেত্রে তা ১০-১২ বর্গফুটেরও কম। তাহলে বুঝতেই পারছ ঠিক কতটা ছোট, যেখানে একজন মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারে না। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হংকংয়ে বর্তমানে প্রায় ২ লক্ষ ২০ হাজার মানুষ এই ধরনের কফিন হাউসে থাকে। প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন মানুষ ১টি বা ২টি বাথরুম ব্যবহার করেন। আলো-বাতাসের অভাব লেগেই থাকে, গরমকালে ঘরের পরিবেশ দমবন্ধকর হয়ে ওঠে। বর্ষাকালে দেওয়ালে ছত্রাক জন্মায়। এমন পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকার ফলে অনেকেই শ্বাসকষ্ট, অনিদ্রা ও মানসিক ব্যাধিতে ভোগে। তাদের মধ্যে কেউ পেশায় নিরাপত্তাকর্মী, কেউ ডেলিভারি কর্মী, অনেকে আবার অবসরপ্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ। অনেকেই বিগত ১০ থেকে ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানেই থাকে।
এই কফিন হাউসগুলো মূলত কাউলুন অঞ্চলের পুরনো এলাকাগুলোতে বেশি দেখা যায়। তার মধ্যে পরিচিত এলাকাগুলো হলো—শাম শ্যুই পো, যেখানে সবচেয়ে কফিন হাউস বেশি। এছাড়াও মং কোক, ইয়াউ মা তেই, তো কা ওয়ান ইত্যাদি। ঘরের আয়তন ছোট হলেও ভাড়া মোটেও কম নয়। অঞ্চল ও অবস্থার ওপরেও নির্ভর করে। মাসিক ভাড়া ২ হাজার থেকে ৫ হাজার হংকং ডলার। নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এই ভাড়া এক বিশাল বোঝা। সাধারণ মানুষদের এই পরিস্থিতির কথা হংকং সরকার স্বীকার করেছে, কফিন হাউস একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। তাই নতুন পাবলিক হাউসিং নির্মাণ করা ও ধীরে ধীরে কফিন হাউস বন্ধ করার পরিকল্পনা জানিয়েছে ২০৪৯ সালের মধ্যে।
আমরা যদি এই কাঠামোগত সংকটের গভীরে যাই, তবে দেখতে পাব যে হংকং টানা ১৪ বছর ধরে পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং নাগালের বাইরের এক আবাসন বাজার হিসেবে নিজের স্থান ধরে রেখেছে। এই শহরের আকাশচুম্বী বহুতলগুলির পেছনে যে অন্ধকার গলিগুলি লুকিয়ে আছে, সেখানে প্রতিটা ইঞ্চির দাম সোনার চেয়েও বেশি। সাধারণ একজন মানুষ যে হংকংয়ের সাধারণ রাস্তায় দিনমজুরি করে, বা কোনো পার্ট-টাইম কাজ করে, তার পক্ষে এই শহরে একটা সাধারণ এক কামরার ফ্ল্যাট কেনা তো দূরের কথা, সাধারণ উপায়ে ভাড়া নেওয়াও এক অলীক কল্পনা। কারণ এখানে একটি অত্যন্ত সাধারণ মানের ও ছোট এক কামরার ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়াই প্রায় ৪,০০০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি এবং যদি কেউ তা কিনতে চায়, তবে তাকে ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ খরচ করতে হবে। এই বিপুল অঙ্কের টাকা একজন সাধারণ মানুষের সারা জীবনের উপার্জনের চেয়েও অনেক বেশি। আর ঠিক এই তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণেই হংকংয়ের বুকে জন্ম নিয়েছে এক বেআইনি এবং অমানবিক সমান্তরাল আবাসন ব্যবস্থা, যা আজ কফিন হাউস বা সাব-ডিভাইডেড ফ্ল্যাট নামে পরিচিত।
এই আবাসন ব্যবস্থার তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুচতুর এবং বেআইনি। বাড়ির মালিকরা বা ল্যান্ডলর্ডরা বেশি মুনাফা লাভের আশায় শহরের পুরনো এবং জরাজীর্ণ ভবনগুলির এক একটি বড় ফ্ল্যাটকে, যা হয়তো বড়জোর ৮০০ বর্গফুটের মতো, সেটিকে কাঠের তক্তা বা ল্যামিনেটেড বোর্ড দিয়ে ছোট ছোট খুপরিতে ভাগ করে দেয়। এই ভাগ করার প্রক্রিয়াটি কেবল লম্বালম্বি নয়, অনেক সময় ফ্ল্যাটের ঘরের উচ্চতা বেশি হলে সেটিকে মাঝখান থেকে অনুভূমিকভাবে কেটে দুটি তলা বা লেভেল তৈরি করা হয়। এর ফলে ঘরের সিলিং বা ছাদ এতটাই নিচে নেমে আসে যে একজন মানুষের পক্ষে সেখানে সোজা হয়ে বসা বা মাথা তোলাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রতিটি ছোট খুপরি বা কফিন ঘরের গড় আয়তন দাঁড়ায় মাত্র ১৬ বর্গফুট, যা একজন সাধারণ মানুষের শরীরের দৈর্ঘ্যের চেয়ে বড়জোর সামান্য কিছু বেশি আর চওড়ায় হয়তো তার দুই কাঁধের সমান। এইটুকুই হলো একজন মানুষের বেঁচে থাকার সম্পূর্ণ পৃথিবী।
এই ১৬ বর্গফুটের ভেতরেই মানুষকে তার জীবনের সমস্ত প্রয়োজনীয়তা এবং বস্তুকে গুছিয়ে রাখতে হয়। যদি তোমরা এই ঘরগুলির ভেতরের দৃশ্য দেখ, তবে দেখবে যে দেয়ালের হুকে ঝুলছে নিত্যদিনের জামাকাপড়, মাথার কাছে বা পায়ের নিচে ঠাঁই পেয়েছে একটা ছোট টেলিভিশন, আর বিছানার একেবারে কোণ ঘেঁষে বসানো রয়েছে একটা মিনি ফ্রিজ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই তীব্র সংকটের মধ্যেও মানুষ বাধ্য হয় একা নয়, বরং দুজনে মিলে এই কফিন ঘর শেয়ার করতে। যেখানে একজন মানুষ নিজের হাত-পা ছড়াতে পারে না, সেখানে দুজন মানুষ কীভাবে রাত কাটায়, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। এই ঘরগুলিতে কোনো জানলা থাকে না, ফলে বাইরের পৃথিবীর আলো বা বাতাস কোনোদিন এই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ পায় না। এই অন্ধকার এবং বদ্ধ ঘরের ভেতরেই মানুষ নিজের মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিনোদন খোঁজে এবং বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে বেঁচে থাকে।
সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসে তখন, যখন এই ঘরগুলির দৈনন্দিন পরিবেশ মানুষের টিকে থাকার ন্যূনতম যোগ্যতাটুকুও কেড়ে নেয়। হংকংয়ের আবহাওয়ায় গরমকাল অত্যন্ত তীব্র এবং আর্দ্র। বিশেষ করে জুলাই মাসের দিকে যখন এই শহরের বাইরের তাপমাত্রা প্রায় ১১০° ফারেনহাইটে পৌঁছে যায়, তখন এই ভেন্টিলেশনহীন কফিন ঘরগুলির ভেতরের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নরকতুল্য হয়ে ওঠে। কোনো জানলা না থাকায় এবং ঘরের ভেতরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায়, এই ঘরগুলির ভেতরের বায়ু বাইরের স্বাভাবিক বাতাসের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি দূষিত এবং বিষাক্ত হয়ে পড়ে। ঘরের সিলিং এবং দেওয়ালে জমে থাকে কালো এবং স্যাঁতসেঁতে ছাতা বা মোল্ড। এই তীব্র গরম এবং আর্দ্রতার হাত থেকে বাঁচতে বাসিন্দারা ঘরের বাইরে করিডোরে এসে বসে থাকে, কারণ ঘরের ভেতরে প্লাস্টিকের একটা ছোট পাখা চললেও তা কেবল গরম বাতাসকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেয়, শরীরকে কোনো আরাম দেয় না।
এই চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সরাসরি প্রভাব পড়ে বাসিন্দাদের শরীরে ও মনে। দীর্ঘদিন ধরে এই দমবন্ধকর এবং স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় থাকার কারণে এখানকার প্রায় প্রতিটা মানুষই তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং ক্রনিক ফুসফুসের সমস্যায় ভোগে। কিন্তু এর চেয়েও বড় আর এক বাস্তব সমস্যা হলো ‘বেড বাগ্স’ বা ছারপোকার উপদ্রব। এই কাঠের কফিন ঘরগুলি হলো ছারপোকাদের বংশবৃদ্ধির আদর্শ স্থান। একটি স্ত্রী ছারপোকা তার জীবনকালে প্রায় ৫০০টি ডিম পাড়তে পারে, যার ফলে এই ঘরগুলির বিছানা, দেওয়াল আর কাপড়ের ভাঁজে লক্ষ লক্ষ ছারপোকা ঘুরে বেড়ায়। এই পোকাগুলি রাতে বাসিন্দাদের সারা শরীরে কামড়ায় এবং তাদের রক্ত চুষে নেয়, যার ফলে এখানকার মানুষেরা তীব্র রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ায় ভোগে। ছারপোকার কামড়ের জ্বালায় এবং চুলকানিতে মানুষের রাতের ঘুম চিরতরে হারিয়ে যায়। এই তীব্র অনিদ্রা এবং এক ইঞ্চিও নড়াচড়া করতে না পারার বন্দিদশা মানুষকে ধীরে ধীরে তীব্র মানসিক অবসাদ ও গভীর ডিপ্রেশনের দিকে ঠেলে দেয়, যা তাদের বেঁচে থাকার ইচ্ছাটুকুকেই প্রতিদিন অল্প অল্প করে শেষ করে ফেলে।
এই মানবিক বিপর্যয় আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে যখন এই মানুষগুলির বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জৈবিক চাহিদা অর্থাৎ খাবার তৈরি এবং শৌচকার্যের পরিবেশের দিকে আমরা তাকাই। এই সাব-ডিভাইডেড বা কফিন হাউসগুলির ভেতরে রান্না করার জন্য আলাদা কোনো রান্নাঘর বা পরিকাঠামো থাকে না। প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন মানুষের জন্য পুরো ফ্লোরে মাত্র একটি বা দুটি সাধারণ বাথরুম থাকে, যা একই সাথে শৌচাগার এবং স্নানের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই নোংরা এবং ঢাকনাবিহীন শৌচাগারের ভেতরেই বাসিন্দাদের কাপড় কাচার ওয়াশিং মেশিনটি রাখা থাকে এবং তার ঠিক পাশেই থাকে বেসিনটি। কোনো উপায় না থাকায়, এই মানুষগুলি বাথরুমের বেসিনকেই রান্নাঘরের সিঙ্ক বা বেসিন হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। এই চরম অস্বাস্থ্যকর জায়গার ঠিক পাশেই, যেখানে নিচে টয়লেট রয়েছে, তার ওপরেই চলে শাকসবজি ধোয়া বা রাতের খাবার তৈরি করার প্রক্রিয়া। এই নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরি করার ফলে মলমূত্রের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া যেমন ই-কোলাই (E. coli) এবং সালমোনেলা (Salmonella) খুব সহজেই খাবারের সংস্পর্শে চলে আসে এবং বাসিন্দাদের শরীরে প্রবেশ করে। ফলত, এই কফিন হাউসের মানুষেরা প্রতিনিয়ত তীব্র পেটের রোগ এবং মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটায়।
অর্থনৈতিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, এই মানুষগুলির উপার্জনের একটি সিংহভাগ অংশই এই নরককুণ্ডের পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। হংকংয়ের বুকে যারা অত্যন্ত সাধারণ এবং পরিশ্রমের কাজ করে, যেমন পার্ট-টাইম ক্লিনার বা মেটাল ওয়ার্কার, তাদের মাসিক আয় হয়তো বড়জোর ৬৫০ থেকে ১,২৫০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। কিন্তু এই ১৬ বর্গফুটের কাঠের বাক্সের মতো ঘরের জন্যই প্রতি মাসে ল্যান্ডলর্ড বা বাড়ির মালিকদের প্রায় ৩২০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি ভাড়া গুনতে হয়। অর্থাৎ, একজন মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে করা উপার্জনের প্রায় অর্ধেকটাই চলে যায় এই কফিন ঘরের পেছনে। এই বিপুল অর্থনৈতিক বোঝার কারণে তারা পুষ্টিকর খাবার খাওয়া বা ভালো চিকিৎসা পাওয়ার কথা ভাবতেও পারে না। তারা সস্তা এবং উচ্চ সোডিয়াম বা চর্বিযুক্ত খাবার খেয়ে জীবন ধারণ করে, যা তাদের উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের মতো শারীরিক জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এত টাকা ভাড়া দেওয়ার পরও এই বাসিন্দাদের মনে বিন্দুমাত্র শান্তি বা স্থায়িত্ব থাকে না, কারণ ল্যান্ডলর্ডরা যেকোনো মুহূর্তে তাদের উচ্ছেদ করে দিতে পারে। বাড়িওয়ালা বা ল্যান্ডলর্ডদের এই স্থায়ী ভয় এবং আতঙ্কের কারণে তারা মিডিয়ার সামনে মুখ খুলতেও ভয় পায়।
সবচেয়ে লজ্জাজনক এবং নির্মম তথ্যটি সামনে আসে যখন হংকংয়ের এই কফিন হাউসগুলির সঙ্গে সেখানকার সরকারি কারাগার বা জেলখানার তুলনা করা হয়। হংকংয়ের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, একজন দণ্ডিত কয়েদি জেলের ভেতরে থাকার জন্য প্রায় ৮০ বর্গফুট জায়গা পায়, যেখানে তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত শৌচাগার থাকে এবং সে নিজের হাত-পা ছড়িয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর বা হাঁটার পর্যাপ্ত সুযোগ পায়। অথচ, যে সমস্ত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কোনো অপরাধ না করে কেবল দারিদ্র্যের কারণে এই কফিন হাউসগুলিতে দিন কাটাচ্ছে, তারা পায় মাত্র ১৬ বর্গফুট জায়গা। গাণিতিকভাবে হিসাব করলে দেখা যাবে, জেলের একজন কয়েদির জন্য নির্ধারিত একটি মাত্র সেলের সমপরিমাণ জায়গায় এই কফিন হাউসগুলিতে প্রায় ১০টি ঘর একের ওপর একটি স্তূপ করে বা স্ট্যাক করে রাখা সম্ভব। একজন সাধারণ মানুষ যখন নিজের চারপাশের এই বন্দিদশাকে কারাগারের চেয়েও নিকৃষ্ট হিসেবে আবিষ্কার করে, তখন তার আত্মসম্মান এবং বেঁচে থাকার মানসিক জোর সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
এই কফিন ঘরগুলির বাসিন্দাদের জীবনবৃত্তান্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক এবং অসহায় মানুষেরা আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে কেউ হয়তো অতীতে সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করতেন, কিন্তু জুয়া খেলার নেশায় বা ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে নিজের ঘরবাড়ি, স্ত্রী এবং সন্তানকে হারিয়ে আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। পরিবার পরিজনদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে এই প্রবীণ মানুষেরা এখন সরকারি ভাতার সামান্য অর্থের ওপর নির্ভর করে এই ১৬ বর্গফুটের বাক্সে নিজেদের শেষ দিনগুলির জন্য অপেক্ষা করছে। সারাদিন এই অন্ধকার ঘরে বসে টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ থাকে না। দীর্ঘদিন ধরে এক জায়গায় বসে থাকার ফলে এবং পুষ্টির অভাবে তাদের হাত-পায়ের কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে তারা বাইরে বের হতেও ভয় পায় যে কখন তাদের পা ভেঙে তারা রাস্তায় পড়ে যাবে। এই মানুষগুলির জীবনের একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় তাদের মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ, যা তাদের এই দমবন্ধকর বাস্তবতা থেকে সাময়িক মানসিক মুক্তির পথ দেখায়।
এই হংকং শহরে কেবল বেঁচে থাকাই যে এক চরম যুদ্ধ তা নয়, বরং এখানে মৃত্যুর পর শান্তিতে একটু জায়গা পাওয়াও সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। হংকং পৃথিবীর অন্যতম ধনী শহর হলেও এখানে জমির সংকট এতটাই তীব্র যে মৃত্যুর পর একটি সাধারণ কবর বা পার্মানেন্ট মেমোরিয়াল প্লট কিনতে গেলে প্রায় ১,২৮,০০০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি অর্থ খরচ করতে হয়, যা একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এর ফলে ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যকার এই বিশাল বৈষম্য মানুষের মৃত্যুর পরেও সমাপ্ত হয় না। এই বিপুল খরচের কারণে সাধারণ মানুষ পাবলিক কবরস্থানে অস্থায়ীভাবে জায়গা ভাড়া নেয়। কিন্তু সেখানেও স্থান অত্যন্ত সীমিত হওয়ায়, আইন অনুযায়ী ঠিক ৬ বছর পর কবর থেকে সেই লাশটিকে জোরপূর্বক তুলে ফেলা হয় এবং সেটিকে পুড়িয়ে বা পুড়িয়ে ফেলার পর চিতার ছাইটুকু একটি অত্যন্ত ছোট ড্রয়ার বা বক্সে রেখে দেওয়া হয়, যার আয়তন একটি সাধারণ জুতোর বাক্সের চেয়ে বড় নয়।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং ঝকঝকে বহুতল ভবনের এই শহরে প্রায় ২ লক্ষ ২০ হাজার মানুষ এভাবেই প্রতিদিন সমাজের চোখে অদৃশ্য হয়ে এবং কফিনের মতো খাঁচায় বন্দি হয়ে বেঁচে আছে। এই ভয়াবহ সামাজিক সংকটকে হংকং সরকার একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। চীন সরকার এবং হংকং প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ২০৪৯ সালের মধ্যে—যা গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ১০০ বছর পূর্তির বছর—এই সময়ের মধ্যে হংকংয়ের বুক থেকে এই সমস্ত বেআইনি কফিন হাউস, কেজ হোম এবং সাব-ডিভাইডেড ফ্ল্যাটগুলি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি আবাসন বা পাবলিক হাউসিং তৈরি করা হবে। তবে এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখার আগে, বর্তমানের এই লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রতিদিন ১৬ বর্গফুটের অন্ধকার বাক্সের ভেতরেই তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত করতে হচ্ছে, যেখানে বেঁচে থাকা আর মৃত্যুর মাঝখানের দূরত্বটা কেবলই একটা কাঠের তক্তার দেয়াল।
লেখা – সৃষ্টি এবং রয়
