জান দেবো তবু ধান দেবো না
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকী আজ। তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক। মধ্যবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তার রচনার প্রধান বিষয়। ফ্রয়েড ও মার্কসের ভাবধারায় প্রভাবিত মানিক চল্লিশটি উপন্যাস ও তিনশত ছোটগল্প রচনা করেন। পদ্মা নদীর মাঝি ও পুতুলনাচের ইতিকথা তার বিখ্যাত সৃষ্টি। মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে তার জীবনাবসান ঘটে।
“জান দেব, তবু ধান দেব না!” — এই একটা স্লোগান একসময় কাঁপিয়ে দিয়েছিল বাংলার দিগন্ত।
জোতদার-জমিদারের বুট আর লাঠির তলায় যখন বাংলার বর্গাচাষীদের হাড়গোড় গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই গর্জে উঠেছিল চিরবঞ্চিত তেভাগার বীর লড়াকু কৃষকেরা।
ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ চাই, এই দাবিতে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তা কেবল মাঠের লড়াই ছিল না; তা ছিল শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের এক তীব্র শ্রেণীসংগ্রাম। আর সেই উত্তাল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলার সাহিত্যজগতে বুর্জোয়া মানসিকতার গালে শক্ত চড় কষেছিলেন যিনি, আজ ১৯ মে তাঁর শুভ জন্মদিন!
এই বিশেষ দিনে সাহিত্যের সেই আপোষহীন কমরেড মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও লাল সেলাম!
বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে কিংবা পুরনো পত্র-পত্রিকার হলদেটে পাতায় যখনই তেভাগা আর ১৯৪০-এর দশকের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা পড়ি, তখনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক কালজয়ী কথাশিল্পীর অবয়ব ।
মানিকবাবু কেবল একজন ঔপন্যাসিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন কলম হাতে একজন খাঁটি মেহনতি মানুষের প্রতিনিধি। যখন প্রগতিশীল লেখক সংঘ ও কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে এসে তিনি নিজেকে পুরোপুরি মার্ক্সবাদের আলোয় রাঙিয়ে নিলেন, তখন থেকেই তাঁর লেখার অভিমুখ বদলে গেল।
ড্রয়িংরুমের বাবু কালচার ছেড়ে তাঁর সাহিত্য নেমে এলো মাঠের কর্দমাক্ত মাটিতে, যেখানে লাঙল ধরে সর্বহারা মানুষ।
তেভাগা আন্দোলন যখন দুই ২৪ পরগনা, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর জুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, জোতদারদের গুদাম ভাঙছে কৃষকেরা, ঠিক তখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী ছোটগল্প ও উপন্যাসের মাধ্যমে সেই আন্দোলনের জ্বলন্ত দলিল তুলে ধরছিলেন।
তাঁর ‘ছিনাল’ বা ‘ছোটবকুলপুরের যাত্রী’-র মতো গল্পগুলোতে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই কীভাবে বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াচ্ছে তেভাগার কৃষকেরা “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানের ভেতরের যে আসল বারুদ, তা তিনি শহরের বাবুদের চোখের সামনে মেলে ধরেছিলেন।
মানিকবাবু দেখিয়েছিলেন, তেভাগা কেবল কৃষকের ভাতের লড়াই নয়, এটা রাষ্ট্রযন্ত্র আর শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষের এক ঐতিহাসিক অধিকার আদায়ের ইশতেহার ।
তাঁর লেখায় জোতদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের যে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তা কোনো কাল্পনিক রোমাঞ্চ ছিল না, বরং তা ছিল একদম খাঁটি বাস্তব। তৎকালীন সময়ে দাঁড়িয়ে একজন প্রথম সারির সাহিত্যিক যেভাবে সরাসরি মেহনতি মানুষের শ্রেণীস্বার্থের পক্ষে নিজের কলমকে হাতিয়ার করেছিলেন, তা আজও যেকোনো পাঠককে আলোড়িত করে।
আজ তাঁর জন্মদিনে তেভাগা আন্দোলনের সেই বীর শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এবং সাহিত্যের প্রমিথিউস কমরেড মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপসহীন লেখনীর প্রতি আবারও জানাই লাল সেলাম! শোষণের দিন শেষ হবেই, দুনিয়ার মজদুর এক হও!
লেখক: অভীরূপ
