স্বকৃত নোমান
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আস্ত এক প্রেতাত্মা টিভিতে ঢুকে বসে আছে! সে ঢুকল কীভাবে, সেকথা ভাবতে ভাবতেই দেখি শামসুজ্জামান দুদু তাকে ধুয়ে দিচ্ছেন। একেবারে সার্ফ এক্সেলের ধোয়া। প্রেতাত্মা মানে অতৃপ্ত মৃত মানুষের আত্মা বা অতিপ্রাকৃত অশুভ সত্তা, লোকবিশ্বাস অনুযায়ী যা জীবিত মানুষের সামনে মানুষের রূপ ধরে ঘুরে বেড়ায়। শামসুজ্জামান সাহেবের ধোলাই খাওয়া প্রেতাত্মাটি অতৃপ্ত পাকিস্তান, অতৃপ্ত রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং ইয়াহিয়া খান, গোলাম আযম, নিজামি প্রমুখের প্রেতাত্মা, যে কিনা মানুষের রূপ ধরে এই দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সুযোগ পেয়ে টিভিতেও ঢুকে পড়েছে। প্রেতাত্মাকে দেখে মানুষের রাগ ওঠা স্বাভাবিক। তাই শামসুজ্জামান সাহেবের রাগ উঠেছে এবং তিনি প্রেতাত্মাটির কলিজায় কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছেন।
ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে দেখি ‘কিচেন কেবিনেট’ নিয়ে কথা হচ্ছে। ইংরেজিতে অদক্ষ হলেও কিচেন মানে যে রান্নাঘর, তা বুঝতে পারলাম এবং কেবিনেট মানে যে রান্নাঘরের হাড়ি-পাতিল বা মশলার কৌটা রাখার আসবাব, সেটাও বুঝতে পারলাম। কিন্তু পরে দেখি ঘটনা অন্য। সাবেক পররাষ্ট্র (যিনি অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থ দেখতেন) তৌহিদ হোসেন বলছেন, “প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে ৬জন উপদেষ্টা প্রতি মঙ্গলবার বৈঠক করেন, যাকে কিচেন কেবিনেট বলা হতো। সব সিদ্ধান্ত সেখানে হতো। মার্কিন চুক্তির বিষয়ে আমি বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবহিত নয়।”
সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠল আরেকটা ফটোকার্ড, যেখানে এক সাবেক নীলা মার্কেট বা ওয়েস্টিন বা হাঁসের মাংস বা বালক বা বালখিল্য বিষয়ক উপেদষ্ট বলছে, “কিচেন কেবিনেট ছিল, কিন্তু আমি সদস্য ছিলাম না।” ভারী তো বিপদ! এই কিচেন কেবিনেট আবার কী জিনিস! ভেবেছিলাম সকাল সকাল রবীন্দ্র সংগীত শুনব, পড়ালেখা কিছু করব না। কিন্তু কিচেন কেবিনেট কী জিনিস সেটা তো জানতে হবে, নইলে তো নাগরিক সমাজে মান-সম্মান কিছু থাকবে না। মালকোচা মেরে নেমে গেলাম পড়ালেখায়।
নেট ঘেঁটেঘুটে কিঞ্চিৎ পড়াশোনা করে জানা গেল যে, কিচেন কেবিনেট শব্দটির জন্মস্থান যুক্তরাষ্ট্র। উনিশ শতকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসন-এর শাসনামলে শব্দটি মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ট হয়। তৎকালীন সময়ে জ্যাকসনের আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বাইরে কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতেন। সমালোচকরা ব্যঙ্গ করে বলতেন, তারা যেন রান্নাঘরের দরজা দিয়ে এসে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখছেন। সেখান থেকেই কিচেন কেবিনেট শব্দটির প্রচলন। পরবর্তীকালে রাজনীতিতে শব্দটি এমন একটি অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা গোষ্ঠী বোঝাতে ব্যবহৃত হতে থাকে, যারা সরকারি কাঠামোর বাইরে থেকেও ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করে।
আচ্ছা! এতক্ষণে তবে বুঝতে পারলাম কিচেন কেবিনেট শব্দটা যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা। কিন্তু এলো কীভাবে? বিমানে চড়ে, নাকি জাহাজে চড়ে? সম্ভবত সেই সব লোকদের সঙ্গে এসেছে, যারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়ে এসে এই দেশের সংবিধান সংস্কার করতে চেয়েছিল।
তবু ধন্দ কাটে না। না কাটার কারণ ফেসবুক। এই বুক-এ একের পর এক ভেসে উঠতে থাকে ফটোকার্ড। এক ফটোকার্ডে দেখি তিন সাবেক উপদেষ্টার ছবি ও উক্তি। সাবেক খাটাখাটনি আই মিন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং নৌকা, ট্রলার, জাহাজ ইত্যাদি চলাচল বিষয়ক উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন বলছেন, “ড. ইউনুসের কিচেন কেবিনেট ছিল। আমাকে রাখা হয়নি। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, আমি সেখানে ছিলাম না।”
ওদিকে কবিপত্নী ওরফে আমাদের ভাবি ওরফে সাবেক মাছ ও পশুপাখি সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলছেন, “বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সস্তায় মাংস, পোলট্টি ও প্রাণিজ পণ্য আমদানির তীব্র বিরোধিতা করেছি। শেষ দিন পর্যন্ত এই চুক্তির বিরুদ্ধে লড়েছি। চুক্তি ঠেকাতে পারিনি।” আর অধ্যাপক, লেখক ওরফে ‘হায় আল্লাহ খালেদ’ ওরফে ছাব্বিশ লক্ষ ভারতীয় তত্ত্বের প্রবক্তা ওরফে সাবেক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারা বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব ড. আসিফ নজরুল বলছেন, ‘মার্কিন চুক্তি নিয়ে ইউনুস আমাকে ডাকেনি।”
কয়েকজন বাদে মোটামুটি সবাই দোষ চাপিয়ে দিয়েছেন কালাচোরার ঘাড়ে। কিন্তু কালাচোরাটা কে? সেটা আর খুলে বলতে হবে না। সবাই সেই মবতন্ত্রের জনকের আসল নাম জানে এবং তার ‘লডরবডর তত্ত্বে’র কথাও জানে। জানে দারিদ্র্য বিমোচেনের নামে তার তেজারতির কথাও। কিন্তু কালাচোরা তো একা না, তার আশপাশে আরও কালাচোরা ছিল, যারা সরকারি কাঠামোর বাইরে থেকেও ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করত এবং যারা এই দেশের মানুষের সঙ্গে বেঈমানি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দাসত্বমূলক চুক্তি করেছে।
সেই কালাচোরাদের নাম জানার বড় সাধ। আশা করি এই সাধ শীঘ্রই পূরণ হবে। জানার জন্য কোনো তদন্ত লাগবে না, কোনো গোয়েন্দা সংস্থা লাগবে না, কালাচোরাদের যে কোনো একজনই ফাঁস করে দেবে। কারণ সংঘবদ্ধ অপরাধীরা কখনো দীর্ঘদিন নিজেদের অপরাধ লুকিয়ে রাখতে পারে না। একটা সময় নিজেদের মধ্যে ক্যাঁচাল লাগে এবং তখন কেউ না কেউ বাকিদের নাম-ধাম এবং যাবতীয় অপকর্মের কথা ফাঁস করে দেয়।
0000000000
ইমতিয়াজ মাহমুদ
শামসুজ্জামান দুদুর সাথে এক রাজাকার বসেছিল টক শো করবে বলে। কোন না কোন প্রসঙ্গে একাত্তরের কথাটা উঠেছে, ব্যাস। আপনারা সকলেই সম্ভবত সেই ভিডিওটা দেখেছেন। আমি আর আলাদা করে শেয়ার করলাম না। দুদু ভাই তো গুছিয়ে কথা বলার মানুষ, ক্রুদ্ধ তিনি রীতিমত কাঁপছিলেন, একবার কি দুইবার দেখলাম মাটিতে পাও ঠুকলেন। নির্লজ্জ রাজাকারটি এক পর্যায়ে দুদু ভাইকে ভারতের দালাল বলেও গালি দিলো দেখলাম।
শোনেন, এইটাই হচ্ছে বাস্তবতা। আপনারা জামাতকে প্রশ্রয় দিবেন, আওয়ামী লীগের বিরোধ করতে গিয়ে মুক্তিযদ্ধবিরোধী বক্তব্য দিবেন, মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করবেন, তাইলে প্রশ্রয় পায় কারা? একাত্তরকে যখন আপনি ইতিহাসের একটা ছোট অধ্যায় মনে করে বলতে চাইবেন যে বর্তমানে সেই আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক, তাইলে আপনি আসলে কাকে আস্কারা দিচ্ছেন। আপনি যদি জয় বাঙলা শ্লোগান দিতে দ্বিধা করেন, তাইলে আসলে কার বিরোধ করছেন?
রাজাকারকে আপনি যতোই প্রশ্রয় দেন, সুবিধা দেন, রাজনৈতিক পরিসরে ওদের অবস্থান স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করেন- রাজাকার রাজাকারই থাকবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে রাজাকার কখনো মানুষ হবে না। সময় বুঝে ওড়া আপনার তালু চাটবে, পা চাটবে, দেখে আপনি বিভ্রান্ত হবেন। কিন্তু যেই সুযোগ পাবে, নখ দাঁত বের করে ওরা আপনাকে ভ্যাংচি দিবে। আপনাকে হত্যা করতে বা আপনার রগ কাটতে বা আপনাকে কেটে কুচুকুচি করতে ওদের হাত একটুও কাঁপবে না।
আমাদের হাতে ওদের পিতৃপিতামহের শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। সামরিক পরাজয় তো আছেই, তাঁর চেয়ে যেটা ওদের তীব্র লাগে সেটা হচ্ছে রাজনৈতিক পরাজয়টা। প্রতিদিন স্কুলের শিশুরা যখন আমার সোনার বাঙলা গেয়ে আসমানে উড়তে থাকা সবুজের বুকে লাল বিন্দুটার দিকে তাকিয়ে অহংকারভরে সালাম দেয়, ততবার রাজাকারদের কলিজায় তীব্র ব্যাথায় মোচড় দিয়ে ওঠে। যতবার কোন খেলায় বা অন্য কোন উৎসবে অনুষ্ঠানে লোকে অহংকারভোরে লাল সবুজ উঁচিয়ে ধরে, ততবার…
এই কুকুরগুলি চেষ্টা করেই যাবে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব, বাংলাদেশের সংবিধান, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় সবকিছু, সব বিলোপ করে দিতে। চব্বিশের জুলাইয়ের পরেই হয়তো ওরা সেটা করে ফেলত, পারেনি। কেন পারেনা জানেন? কারণ একাত্তরে আমরা যে মূল্য দিয়েছি সেটা অনেক অনেক অনেক বেশী। প্রতিটা বাঙালী শিশু জন্ম নেয় হৃৎপিণ্ডে একটা ক্ষত নিয়ে। রাজনৈতিক যতোই ভিন্নতা থাক, সেই ক্ষতে যখন কেউ স্পর্শ করে, ধমনীতে এক ফোঁটা বাঙালী রক্ত যার আছে সে জ্বলে উঠবেই।
শামসুজ্জামান দুদু তো ফজলুর রহমান নন। মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে তাঁর এমনিতে খুব বেশী জ্বলে উঠবার কথা নয়। কিন্তু এই রজাকারের বাচ্চা রাজাকারটি দুদু ভাইয়ের হৃৎপিণ্ডের সেই ক্ষতে স্পর্শ করেছে কোনোভাবে, সেইটাই কাজ করেছে- জ্বলে উঠেছেন তিনি। ক্রুদ্ধ শামসুজ্জামান দুদুর চেহারা দেখেছেন? আরেকটু হলে তিনি হয়তো রাজাকারটিকে প্রহার করতেন। তরুণ বন্ধুরা, এইটা মনে রাখবেন। জন্ম যদি হয় বঙ্গে, তবে আপনার হৃৎপিণ্ডেও রয়েছে সেই ক্ষত- সেই বিসুভিয়াস।
বাঙলার বাতাসে একবার বুক ভরে নিঃশ্বাস নিন, লাল সবুজের মাঝখানে সেই রক্তবিন্দুর দিকে একবার তাকান, গেয়ে দেখুন ‘আমার সোনার বাঙলা’, দেখবেন আপনারও ইচ্ছে হবে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ চিৎকার করে বলতে, ‘জয় বাঙলা’
