বিশেষ প্রতিবেদন
জনগণের মাঝে মুখে মুখে এখন আসছে আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর যে দলটিকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মাঝে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকদের একাংশের মতে, বিগত ২১ মাসের চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সাম্প্রতিক নানা কেলেঙ্কারির জেরে সাধারণ জনগণের মনে আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা এখন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঈদের ঠিক পরমুহূর্তে জাতীয় রাজনীতিতে যখন একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসছে, ঠিক তখনই আওয়ামী লীগের এই দৃশ্যপট পরিবর্তন ও জনপ্রিয়তা ফিরে পাওয়ার খবরটি দেশের রাজনৈতিক মহলে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়েছে।
যেসব কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা এখন দ্বিগুণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের গভীর পর্যবেক্ষণ ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পরও কেন সাধারণ মানুষের মনে দলটির প্রতি ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা নতুন করে ফিরে আসছে:
১. অর্থনৈতিক স্বস্তি ও প্রণোদনা বন্ধের প্রভাব: সাধারণ মানুষ এখন শেখ হাসিনা সরকারের আমলের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে বর্তমান সংকটের সরাসরি তুলনা করছেন। বিশেষ করে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে প্রবাসীরা বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে যেকোনো অঙ্কের টাকার ওপর যে ২.৫০% নগদ প্রণোদনা পেতেন, নতুন নির্দেশনায় তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রবাসীদের রক্ত পানি করা আয়ের ওপর উল্টো ৭.৫% ট্যাক্সের বোঝা চাপানোয় ১ লক্ষ টাকা পাঠালে পরিবার এখন পাচ্ছে মাত্র ৯২,৫০০ টাকা। প্রতি লক্ষে এই ১০,০০০ টাকার সরাসরি লোকসান ও বৈষম্যের কারণে কোটি প্রবাসী ও দেশের সাধারণ মানুষ এখন শেখ হাসিনার আমলের অর্থনৈতিক নীতিকে শতভাগ ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করছেন।
২. প্রশাসনিক চরম ব্যর্থতা ও মানবিক বিপর্যয়: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনের অদূরদর্শিতা ও চরম ব্যর্থতার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। যথাসময়ে হামের প্রতিষেধক টিকা না কেনার কারণে দেশজুড়ে শত শত নিষ্পাপ শিশুর অকাল মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের ইতিহাসে এক অমার্জনীয় মানবিক বিপর্যয়। এই নজিরবিহীন শিশু মৃত্যুর ঘটনা এবং আমেরিকার সাথে করা তড়িঘড়ি বিতর্কিত বাণিজ্যচুক্তি দেশের সার্বভৌমত্বকে সংকটে ফেলায় সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শাসনব্যবস্থাকে অনেক বেশি নিরাপদ ও দূরদর্শী মনে করছেন।
৩. তরুণ নেতৃত্বের নৈতিক স্খলন ও কিচেন ক্যাবিনেট রহস্য: নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বুলি নিয়ে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতাদের আসল রূপ যত প্রকাশ পাচ্ছে, মানুষের মোহভঙ্গ তত দ্রুত হচ্ছে। সম্প্রতি জামায়াত জোট থেকে নির্বাচিত হাতিয়া আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক সমন্বয়ক হান্নান মাসুদের হোটেল রুমে দুই নারীসহ বাস্তব ও রিয়েল ছবি ফাঁস হওয়া তরুণ নেতৃত্বের ভাবমূর্তিকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। এর ওপর, সাবেক সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া নিজেই প্রেস কনফারেন্সে স্বীকার করেছেন যে প্রশাসনে পর্দার আড়ালে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বা গোপন সেল সক্রিয় ছিল। অন্যদিকে, গত ২৭ মে ভোর ৬টা ৫০ মিনিটে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অতি গোপনে দেশত্যাগের ঘটনা প্রমাণ করেছে যে বর্তমান ব্যবস্থা কতটা নড়বড়ে ছিল। এই চরম রাজনৈতিক ও নৈতিক দেউলিয়াত্বের মুখে দাঁড়িয়েই সাধারণ মানুষ এখন আওয়ামী লীগের প্রচ্ছন্ন দেশপ্রেম ও শাসনকাঠামোকে মিস করছেন।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে: “আভাস পাওয়া যাচ্ছে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের”
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, কোনো দলকে জোরপূর্বক নিষিদ্ধ করে বা মামলা-হামলা দিয়ে জনগণের মন থেকে মুছে ফেলা যায় না, যদি না নতুন ব্যবস্থা জনগণের মৌলিক চাহিদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। আর এই চরম সত্যটিই প্রতিফলিত হয়েছে বর্তমান সংসদের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য (এমপি) ও প্রাক্তন বিএনপি নেত্রী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার কণ্ঠে। সম্প্রতি একটি বিশেষ টকশোতে তিনি সরাসরি দাবি করেছেন— “শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে”।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রশাসনের নজিরবিহীন অদূরদর্শিতা, রেমিট্যান্স সংকট, স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয় এবং তথাকথিত সংস্কারবাদী নেতাদের একের পর এক নোংরা স্ক্যান্ডালই নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগকে জনগণের চোখে পুনরায় ‘ত্রাতা’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আর এর ফলেই দলটির জনপ্রিয়তার গ্রাফ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে ওপরের দিকে ছুটছে।
