অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির যে ধারা শুরু হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরেও তা থামেনি। বরং উদ্বেগজনকভাবে তা অব্যাহত রয়েছে বলে তথ্য-প্রমাণ সামনে আসছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে — যা জনমনে গভীর আতঙ্ক ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচিত সরকারের শুরু, তবু বাড়ছে অপরাধ
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল — বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় নতুন সরকার। গত ২৭ মে বিএনপি নেতৃত্বাধীন এই সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন খাতে সরকারের নানা পদক্ষেপ আশার আলো দেখালেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি দৃশ্যমান হয়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরও ভয়াবহ হয়েছে। সরকারের প্রথম ১০০ দিনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, প্রতি মাসেই খুনখারাবির হার বাড়ছে।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, এই ১০০ দিনে সারা দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ও ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যাটি শুধু উদ্বেগজনক নয়, এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
শিশু হত্যা থেকে পারিবারিক গণহত্যা
রাজধানীর পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তার রাইসাকে গত ১৯ মে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এর আগে উত্তরের জেলা নওগাঁয় একই পরিবারের চারজন এবং গাজীপুরে এক পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটে।
সরকার তাদের ১০০ দিনেও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। শেষ ১০ দিনে অন্তত ছয় শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মিরপুরের রামিসার হত্যাকারী ছাড়া আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। একই পরিবারের পাঁচজনকে একসঙ্গে খুন করা হলেও এখনো অপরাধীকে ধরতে পারেনি পুলিশ।
অন্তর্বর্তী কালের উত্তরাধিকার: মব রাজত্বের শুরু যেখানে
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে দেশজুড়ে মব সহিংসতা, থানা আক্রমণ ও বিচারবহির্ভূত হামলার যে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, সেটিই ক্রমশ স্বাভাবিক রূপ নিতে শুরু করে। পুলিশ বাহিনী সে সময় কার্যত ভেঙে পড়েছিল এবং রাস্তায় আইনের শাসনের পরিবর্তে দলীয় শক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ১১ মাসে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মোট ৭৬১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে ১ হাজার ১৬৮ জন পুলিশ সদস্য অভিযুক্ত। এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও পুলিশ বাহিনী তার পূর্ণ কার্যকারিতা ফিরে পায়নি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বিরোধী দলের সমালোচনা
প্রথম ১০০ দিনে সরকারের ব্যর্থতা এবং সদিচ্ছার অভাব দেখছেন বিরোধী দলগুলোর নেতারা। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আর্থিক খাতে অস্থিরতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষ সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না বলে তারা মনে করছেন। পুলিশকে ঢেলে সাজাতে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
সরকারের অবস্থান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দাবি করেছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তিনি জানান, শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের তালিকা করা হয়েছে এবং শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানে নামবে। তবে টিআইবির তথ্য সরকারের এই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
টিআইবির সতর্কবার্তা
টিআইবি বলছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে হত্যা-অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধ উদ্বেগজনক হারে ঘটেছে। সংস্থাটির মতে, এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অপরাধের সংখ্যাগত বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট, কেবল সরকার পরিবর্তনই আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের জন্য যথেষ্ট নয় — প্রয়োজন পুলিশ ও বিচার বিভাগের কাঠামোগত সংস্কার এবং রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন আইন প্রয়োগ।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে মব-সংস্কৃতি ও দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল সেই ধারার অবসান। কিন্তু ১০০ দিনের পরিসংখ্যান বলছে, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে এখনো বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে।
