আজ ৭ই জুন, ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস। বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিনের ৬০ বছর পূর্তি আজ। ১৯৬৬ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ৬ দফা দাবির সমর্থনে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় পালিত সর্বাত্মক হরতালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গুলিতে ঢাকা, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ ১১ জন বাঙালি শহিদ হন। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বেগবান হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন।
ইতিহাসবিদদের মতে, ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ একই ধারাবাহিক সংগ্রামের অংশ। সেই ধারাবাহিকতায় ৭ই জুন শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির দিন নয়, বরং বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এদিকে ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে ৬ দফা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “ঐতিহাসিক ৭ই জুন বাঙালি মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে অনন্য এক দিন। ১৯৬৬ সালের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে নেমে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বুলেটে শহিদ হন মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ বীর সন্তানেরা।”
শেখ হাসিনা বলেন, ৬ দফার অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবির মধ্যেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের রূপরেখা নিহিত ছিল।
তিনি উল্লেখ করেন, “এই ৬ দফার ভেতরেই সুপ্ত ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের রূপরেখা।”
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতিকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ৬ দফার তাৎপর্য অনুধাবন করে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। তবুও আন্দোলন থেমে থাকেনি; বরং ৬ দফা থেকে ১১ দফা, গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপ নেয়।
ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী, ৬ দফা শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ঘোষণাপত্র। সেই কারণেই স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও ৭ই জুন বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
স্বায়ত্তশাসনের দাবির নতুন রূপরেখা
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্যের শিকার হয়। জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পূর্ব বাংলায় বসবাস করলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র ছিল পশ্চিম পাকিস্তান।
এ প্রেক্ষাপটে ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর সম্মেলনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপনের ঘোষণা দেন। ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি পেশ করেন এবং ১১ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা জনসমক্ষে তুলে ধরেন।
৬ দফায় একটি ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থার আওতায় কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করে প্রদেশগুলোর হাতে অধিকাংশ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। কর আদায়, বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের মতো বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ কারণেই পরবর্তীকালে ৬ দফাকে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ বা ‘ম্যাগনা কার্টা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
বিরোধিতা পেরিয়ে জনআন্দোলনে রূপ
৬ দফা ঘোষণার পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পাশাপাশি তৎকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এর বিরোধিতা করে। কিন্তু শেখ মুজিব জনগণের কাছে সরাসরি কর্মসূচির ব্যাখ্যা তুলে ধরতে দেশব্যাপী গণসংযোগ শুরু করেন। চট্টগ্রাম, সিলেট, পাবনা, বগুড়া, রংপুর, যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় জনসভা করে তিনি ৬ দফার পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন।
১৯৬৬ সালের মার্চে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে ৬ দফা দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গৃহীত হয়। এরপর আন্দোলন দ্রুত গণভিত্তি লাভ করে। বিশেষ করে ছাত্রলীগ ও তরুণ নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে।
৬ দফা আন্দোলন দমনে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতাকে গ্রেপ্তার করে। এর প্রতিবাদে এবং ৬ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ই জুন দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হয়।
নেতৃত্বশূন্য অবস্থাতেও ছাত্র ও শ্রমিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণে হরতাল সফল হয়। তৎকালীন সরকার আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নেয়। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ১১ জন নিহত হন। সরকারি হিসাবেও প্রাণহানির তথ্য স্বীকার করা হয়। তবে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে তা আরও বিস্তৃত হয়।
স্বাধীনতার পথে ৬ দফা
৬ দফা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু আন্দোলনের তীব্রতা কমেনি। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
পরবর্তীকালে বাঙালির আন্দোলন ‘৬ দফা নয়, এক দফা—স্বাধীনতা’ স্লোগানে রূপ নেয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতির প্রেক্ষাপটে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে বাস্তব রূপ পায় বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রাম।
