আরিফুল ইসলাম
বঙ্গোপসাগরে পাকিস্থানী সাবমেরিন, হামাস বিতর্ক এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে নতুন ভূ-রাজনৈতিক খেলা। লেখাটি মতামতমূলক বিশ্লেষণধর্মী, হাতে সময় থাকলে ধৈর্য্য সহকারে পড়ে নিতে পারেন।
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে একটি সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে; সাম্রাজ্যবাদ কখনো পরাজিত হয় না, বরং রূপ পরিবর্তন করে ফিরে আসে। একসময় যুদ্ধজাহাজ, কামান ও সৈন্যবাহিনী দিয়ে দেশ দখল করা হতো; আজ দখলের অস্ত্র হলো নিরাপত্তা আতঙ্ক, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, তথ্যযুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক চাপ। লক্ষ্য একটাই, ছোট ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে দুর্বল করা।
সম্প্রতি দুটি বিষয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানি সাবমেরিনের উপস্থিতি, অন্যদিকে বাংলাদেশে হামাসের উপস্থিতি বা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। আপাতদৃষ্টিতে দুটি ঘটনা ভিন্ন হলেও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উভয় বিষয়ই বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ, যেখানে বাংলাদেশকে একটি কৌশলগত ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগর শুধু একটি সমুদ্র নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি, জ্বালানি, বাণিজ্য ও সামরিক নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু। যে শক্তি বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বিস্তার করবে, সে শুধু সমুদ্রপথ নয়, পুরো অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। ফলে এখানে কোনো সাবমেরিনের উপস্থিতি কেবল সামরিক ঘটনা নয়; এটি শক্তি প্রদর্শনের রাজনৈতিক বার্তা।
অন্যদিকে, হামাসকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের নাম আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসা আরও উদ্বেগজনক। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, যখনই কোনো রাষ্ট্রকে “নিরাপত্তা ঝুঁকি”, “উগ্রবাদ”, “সন্ত্রাসবাদের আশ্রয়স্থল” বা “আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার উৎস” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা সহজ হয়ে যায়। ইরাককে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অজুহাতে ধ্বংস করা হয়েছিল। লিবিয়াকে মানবাধিকার রক্ষার নামে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছিল। আফগানিস্তানকে দুই দশক ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছিল। প্রতিবারই জনগণকে বলা হয়েছিল, এটি নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু ফলাফল ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধ্বংস, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা।
বাংলাদেশকে ঘিরে আজ যে আলোচনা তৈরি হচ্ছে, তা তাই শুধু দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এমন একটি বাস্তবতার ইঙ্গিত, যেখানে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে টেনে আনার চেষ্টা হতে পারে। একদিকে সামরিক উপস্থিতির প্রশ্ন, অন্যদিকে নিরাপত্তা-ভিত্তিক বয়ান। উভয়ই একটি রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তারের পরিচিত কৌশল।
সাম্রাজ্যবাদ কখনো সরাসরি এসে বলে না, “আমরা তোমার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে এসেছি।” বরং তারা আসে বন্ধুত্ব, নিরাপত্তা, সহযোগিতা কিংবা স্থিতিশীলতার ভাষা নিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে একটি দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, গণমাধ্যম ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার উপর প্রভাব বিস্তার করে। একসময় রাষ্ট্রটি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে সক্ষম থাকলেও পরে সেই ক্ষমতা ক্রমশ সীমিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ কোনো নির্দিষ্ট দেশ নয়; বরং সেই ভূ-রাজনৈতিক খেলা, যেখানে বিদেশি শক্তির স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের উপরে স্থান দেওয়া হয়। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের সতর্ক করে যে, যখন একটি জাতি নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভাজনে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বহিরাগত শক্তি সেই সুযোগকে কাজে লাগায়। আর এই দূর্বলতা ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে বৈধ্য আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুধু ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য ছিল না; এটি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রাম। সেই চেতনার মূল শিক্ষা হলো, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের জনগণ, কোনো বিদেশি শক্তি নয়। বঙ্গোপসাগরে কার সাবমেরিন চলবে, কোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে কার স্বার্থ জড়িত থাকবে; এসব প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতি কি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হবে, নাকি বহিরাগত শক্তির কৌশলগত হিসাব দ্বারা? ইতিমধ্যে ম্যারিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ইউনুস সরকার ও বাইচান্স সরকার দেশ বিক্রি করেছে।
আজ প্রয়োজন ৭১-এর পক্ষের শক্তির ঐক্য, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। যা সাংবিধানিকভাবে বৈধ প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে জটিল মেরুকরণ করা হয়েছে। কারণ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি সবসময় বন্দুকের নল দিয়ে আসে না; কখনও আসে বিভ্রান্তিকর বয়ান হয়ে, কখনও নিরাপত্তার অজুহাতে, কখনও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মোড়কে।
যে জাতি এই কৌশল বুঝতে ব্যর্থ হয়, সে একসময় নিজের ভূখণ্ডের মালিক থাকলেও নিজের ভবিষ্যতের মালিক থাকতে পারে না। আর যে জাতি সতর্ক থাকে, ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, তার সার্বভৌমত্বকে কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই দীর্ঘদিন চ্যালেঞ্জ করতে পারে না।
বাংলাদেশের সামনে আজ তাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো, কোনো শক্তির বলয়ে নয়, বরং নিজের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। সেটা করার জন্য প্রয়োজন বঙ্গবন্ধু কণ্যা শেখ হাসিনা আপার মত একজন দক্ষ ও বিজ্ঞ মানুষ। কারণ স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কেবল পতাকা নয়; স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করার অধিকার।
