অনন্যা রায়
কলকাতার সাহিত্য, রাজনীতি ও মতপ্রকাশের পরিসরে দীর্ঘদিন ধরে একটি নাম বারবার ফিরে আসে—তসলিমা নাসরিন। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া, লেখালেখি ও অবস্থানের কারণে নির্বাসিত এই লেখিকা প্রায় ১৯ বছর পর আবার কলকাতায় ফিরছেন। ২০২৬ সালের ১ অগস্ট রবীন্দ্র সদনে একটি সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু এক সাহিত্যিক সফর নয়; এটি হয়ে উঠছে বাক্স্বাধীনতা, ধর্মীয় মৌলবাদবিরোধী অবস্থান এবং শহরের সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক গভীর রাজনৈতিক প্রতীক। খবর অনুযায়ী, অনুষ্ঠানটি মূলত মৌলবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া একটি লিটল-মিট, যেখানে তসলিমা কবিতা পাঠও করতে পারেন।
তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরার খবরটি সাধারণ পাঠকের কাছে হয়তো একটি সংবাদ, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য-রাজনীতি, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং অভিবাসন-নির্বাসনের ইতিহাসে এটি বহুস্তর অর্থ বহন করে। একদিকে, এটি এমন একজন লেখিকার ফিরে আসা, যিনি নারী-অধিকার, ধর্মীয় অনুশাসনের সমালোচনা এবং মৌলবাদবিরোধী লেখালেখির জন্য বহু বছর ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে। অন্যদিকে, কলকাতা শহরও এখানে কেবল ভৌগোলিক ঠিকানা নয়; এটি তাঁর কাছে এক সময়ের ‘ঘর’, যে শহর তাঁকে আশ্রয়ও দিয়েছিল, আবার পরে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক চাপের কারণে দূরে সরিয়েও দিয়েছিল।
খবরে জানা যাচ্ছে, তসলিমা ১ অগস্ট রবীন্দ্র সদনে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে কলকাতায় পৌঁছবেন ৩১ জুলাই। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে সম্বর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করছে ধর্মনিরপেক্ষ ও মৌলবাদবিরোধী ভাবনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি সংগঠন। এটি কেবল সাহিত্যচর্চার পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং সাংস্কৃতিক সম্মেলন, কবিতা পাঠ এবং সৃজনশীল উপস্থাপনার মাধ্যমে তসলিমার অবস্থানকে সম্মান জানানোই এর প্রধান লক্ষ্য বলে জানানো হয়েছে। আয়োজকদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের একটি সংগঠনের সভাপতি মোহিত রায় বলেছেন, এটি মূলত শহরে তাঁর ফিরে আসাকে উদ্যাপনের আয়োজন।
তসলিমা নাসরিনের সাহিত্যিক পরিচয় আজ আর শুধু একজন লেখিকার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বিতর্কিত সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর লেখা একদিকে প্রশংসিত হয়েছে নারীমুক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের জন্য; অন্যদিকে একই লেখা তাঁকে বারবার মৌলবাদী বিরোধিতার মুখে ফেলেছে। তাঁর ‘লজ্জা’ উপন্যাস তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেয়, বিশেষ করে উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে। পরবর্তী সময়ে ‘দ্বিখণ্ডিতা’সহ একাধিক লেখা পশ্চিমবঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
প্রেক্ষাপটটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৪ সালে ‘লজ্জা’ প্রকাশের পর ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের হুমকি তীব্র হয় এবং তসলিমা বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হন। পরে তিনি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকেন। ২০০৪ সালের পর কলকাতায় থাকার সুযোগ পান এবং বহু বছর এই শহরকেই তিনি নিজের ঘর বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ২০০৭ সালের নভেম্বরে তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সহিংস প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ছিল, তাঁর লেখা ধর্ম অবমাননা করছে। সেই উত্তেজনার মধ্যে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনা মোতায়েন পর্যন্ত করে, এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে শহর ছাড়তে হয়।
এই ফিরে আসার মুহূর্তটি তাই কেবল আবেগের নয়, স্মৃতিরও। তসলিমা নিজে বহুবার বলেছেন যে কলকাতা তাঁর কাছে একটি আশ্রয়স্থল ছিল, কারণ বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সান্নিধ্যে এই শহরকে তিনি আপন বলে ভাবতেন। কিন্তু ২০০৭ সালের সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে গভীর আঘাত হয়ে রয়ে গেছে। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি সেই সময়কে এখনও মানসিকভাবে তাজা বলে মনে করেন এবং শহর ছাড়তে বাধ্য হওয়াকে ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, কলকাতায় ফেরার চিন্তায় তিনি উচ্ছ্বসিত, এবং কয়েকদিনের জন্য এলেও স্থায়ীভাবে ফিরে আসার সম্ভাবনাও তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
রবীন্দ্র সদনকে কেন্দ্র করে এই অনুষ্ঠানটির প্রতীকী গুরুত্বও কম নয়। কলকাতার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে রবীন্দ্র সদন দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্য, নাটক, সঙ্গীত ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের একটি প্রধান মঞ্চ। তসলিমার মতো একজন বিতর্কিত লেখিকার সেখানে উপস্থিতি এক অর্থে শহরের সাংস্কৃতিক উদারতার পরীক্ষা। কারণ এই প্রত্যাবর্তন ঘিরে শুধু স্মৃতিচারণ নয়, আছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু-সংবেদনশীলতা, ধর্মীয় মৌলবাদ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রশ্নও। তাই এই সাহিত্যসভা আসলে একটি সাংস্কৃতিক ঘটনার চেয়েও বেশি—এটি এক ধরনের গণ-অভিব্যক্তি।
এই খবর প্রকাশের পরই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ট্রিনামূল কংগ্রেস ও বিজেপি—দুই শিবিরই নিজেদের রাজনৈতিক ভাষ্যে এই প্রত্যাবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেছে। তৃণমূলের এক বিধায়ক তসলিমার লেখালেখি ও মুসলিম সমাজ এবং শরিয়ত-সংক্রান্ত বক্তব্যের কথা তুলে ধরে কড়া সমালোচনা করেছেন। অপরদিকে বিজেপি শিবির এই প্রত্যাবর্তনকে আগের সরকারের “মৌলবাদের কাছে নতি স্বীকার”-এর বিপরীতে একটি প্রতীকী জবাব হিসেবে দেখাতে চাইছে। অর্থাৎ, একজন লেখিকার সফরই এখন রাজ্যের রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট: তসলিমা নাসরিনের উপস্থিতি পশ্চিমবঙ্গে এখনও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তাঁর সমালোচকরা মনে করেন, তিনি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেন; তাঁর সমর্থকদের মতে, তিনি সাহসীভাবে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং নারীর অধিকার, মুক্তচিন্তা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে কথা বলেছেন। এই দুই বিপরীত অবস্থানের সংঘাতে বারবার প্রশ্ন উঠেছে—একটি গণতান্ত্রিক সমাজে একজন লেখকের মতামতের সীমা কোথায়, আর সেই মতামতকে রাষ্ট্র কতটা সুরক্ষা দেবে?
তসলিমার সাহিত্যজীবন এই প্রশ্নগুলিকে আরও জটিল করে তোলে। তিনি শুধু উপন্যাসিক নন; কবি, প্রাবন্ধিক, চিকিৎসক এবং মানবাধিকারকর্মী হিসেবেও তাঁর পরিচয় রয়েছে। সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর অসংখ্য উপন্যাস, স্মৃতিকথা, কবিতা ও প্রবন্ধ তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর লেখাগুলো বহু জায়গায় নিষিদ্ধ হয়েছে, বহুবার তাঁকে হুমকি, বহিষ্কার ও নির্বাসনের মুখে পড়তে হয়েছে। অর্থাৎ, তসলিমার জীবন এক অর্থে উপমহাদেশের সেই সাহিত্যিক বৃত্তান্ত, যেখানে লেখা আর জীবনের মধ্যে দূরত্ব নেই—কলমের মূল্য জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে বারবার।
এখানে কলকাতার ভূমিকাও আলাদা করে বোঝা দরকার। বাংলা ভাষাভাষী এই শহর একদিকে যেমন সাহিত্য-সংস্কৃতির বড় কেন্দ্র, অন্যদিকে তেমনি ধর্ম, পরিচয় ও রাজনীতির টানাপোড়েনে বারবার বিভক্ত হয়েছে। তসলিমার ২০০৭ সালের প্রস্থান সেই টানাপোড়েনের এক স্মরণীয় অধ্যায়। তাঁর বর্তমান প্রত্যাবর্তন সেই পুরনো ক্ষতকে আবার উসকে দিতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে তা নতুন আলোচনারও সুযোগ করে দেবে—শহর কি এখন আগের চেয়ে বেশি উদার? নাকি পুরনো ভয় এখনো সক্রিয়? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো অনুষ্ঠানের দিনই নয়, তার পরবর্তী সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে প্রকাশ পাবে।
খবরের আরেকটি দিক হল, তসলিমা বর্তমানে মূলত দিল্লিতে থাকেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ নির্বাসনের পরে তাঁর জীবন নানা দেশ, নানা শহর ও নানা রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু কলকাতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বরাবরই আলাদা। এই শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও আবাসের, কখনও বঞ্চনার, কখনও অপেক্ষার। তাই ২০২৬ সালের এই সফরকে অনেকেই “ফেরার” চেয়ে “ফিরে দেখার” মুহূর্ত বলবেন—যেখানে তিনি একদিকে অতীতকে স্পর্শ করবেন, অন্যদিকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রাখবেন।
ভারতীয় গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও একই মূল বক্তব্য উঠে এসেছে: তসলিমার ফেরা শুধু ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, এটি রাজনৈতিক ও আদর্শগত প্রতীক। একাধিক সূত্রে বলা হয়েছে, বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবেশে বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করেছে; এমনকি রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল এটিকে “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”র প্রশ্নে তুলে ধরতে চাইছে। অন্যদিকে বিরোধীরা এটিকে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান জোরালো করার জন্য ব্যবহার করছে। ফলে একটি সাহিত্যিক অনুষ্ঠানের চারপাশে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা দেখিয়ে দিচ্ছে—উপমহাদেশে সাহিত্য এখনো নিছক সাহিত্য নয়; তা পরিচয়, ক্ষমতা, ধর্ম এবং রাষ্ট্রের জটিল সমীকরণের অংশ।
সব মিলিয়ে তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় প্রত্যাবর্তন এক অসাধারণ প্রতীকী ঘটনা। এতে আছে নির্বাসনের দীর্ঘ যন্ত্রণা, শহরের প্রতি এক লেখিকার টান, মৌলবাদের বিরুদ্ধে সাহিত্যিক প্রতিবাদ, এবং রাজনৈতিক মঞ্চে সংস্কৃতির পুনঃউপস্থিতি। ১৯ বছর পর রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে তাঁর দাঁড়ানো তাই কেবল একটি সাহিত্যিক উপস্থিতি নয়—এটি এক দীর্ঘ ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। যে ইতিহাসে ভয়, বিতর্ক, প্রতিবাদ, আশ্রয়, নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তন—সবই একই কলমের ছায়ায় লেখা। কলকাতা হয়তো তাঁকে আবারও স্বাগত জানাবে; কিন্তু এই স্বাগতমাত্রেই কি পুরনো ক্ষত মুছে যাবে? সম্ভবত নয়। তবু এমন ফিরে আসা স্মরণ করিয়ে দেয়, সাহিত্য কখনও শুধুই শব্দ নয়—কখনও কখনও তা এক শহরের বিবেক, এক সমাজের আয়না, এবং এক নির্বাসিত হৃদয়ের ঘরে ফেরার নাম।
