দুই বছর হতে চলল, শেরপুর জেলা কারাগারের সেই ভয়াবহ হামলার ঘটনার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, যে দিনটিতে দেশ দেখল কীভাবে একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্র কারাগারে হামলা চালিয়ে ৫১৮ জন কয়েদিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এর মধ্যে খুনি, ধর্ষক, মাদক কারবারি, জঙ্গি সবার উপস্থিতি ছিল। ৭৩০ দিন পার হয়ে গেছে। ফেরত এসেছে মাত্র ১৭২ জন। এখনো পলাতক ৩৪৬ জন। আর চোখ কপালে তোলার মতো তথ্য হলো, লুট হওয়া ১ হাজার ১৭৫ রাউন্ড গুলির মধ্যে উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৩২ রাউন্ড। বাকি ১ হাজার ১৪৩ রাউন্ড গুলি এখনো বেহাত। এটা কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, এটা একটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ধসে পড়ার দলিল।
এখন প্রশ্ন হলো, এই গুলিগুলো কার কাছে গেছে? কারা সেগুলো মজুদ করে রেখেছে? সাধারণ চোর বা ছিনতাইকারী কখনোই ৮৪৪ রাউন্ড চীনা রাইফেলের গুলি নিয়ে পালায় না। এই ধরনের গুলি নির্দিষ্ট কিছু অস্ত্রে ব্যবহার হয়, এবং এগুলো কিনতে বা ব্যবহার করতে হয় প্রশিক্ষিত কেউ, যার সঙ্গে কোনো না কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা জঙ্গি নেটওয়ার্কের সংযোগ আছে। ৫ আগস্টের হামলার পেছনে যে ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা ছিল, গোয়েন্দা রিপোর্ট ও মাঠপর্যায়ের তথ্য তা বারবার নিশ্চিত করেছে। জামায়াত-শিবিরের ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর স্লিপার সেল পর্যন্ত, সবাই মিলে সে দিন রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করেছে। আর এই লুট করা গুলি এখন তাদের কাছেই মজুত আছে, ভবিষ্যতের বড় কোনো নাশকতার অপেক্ষায়।
এখন দেশে ক্ষমতায় কারা? ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপির নেতৃত্বে যে সরকার চলছে, তার প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামী। সেই জামায়াত, যার ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বারবার জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত, যাদের শীর্ষ নেতৃত্ব মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পরও প্রকাশ্যে দলটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারাই এখন মন্ত্রী, তারাই সংসদে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান। এই বাস্তবতায় কেউ যদি আশা করে যে লুট হওয়া গুলি উদ্ধারে আন্তরিক কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে, তাহলে সেটা নিষ্পাপ ভাবনা ছাড়া আর কিছু নয়। যে দলের রাজনৈতিক ক্যাডাররা বারবার অস্ত্রবাজি আর নৈরাজ্যের সঙ্গে জড়িত, তারাই কি কিনা সরকারে বসে অস্ত্র উদ্ধারে মাঠে নামবে? এটা দায়িত্বের দ্বন্দ্ব তো বটেই, বরং স্বার্থের বিরোধিতা।
ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সেই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাকে এখন পুরনো ইতিহাস মনে হলেও, ভোলা যাবে না যে তার সময়েই এই হামলা সংঘটিত হয়েছিল, এবং তার সময়েই পলাতকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে চরম গড়িমসি আর উদাসীনতা দেখানো হয়েছে। ইউনুস সাহেব বিদেশি রাষ্ট্রের মদদপুষ্ট সুদী মহাজনদের প্রতিনিধি ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। ক্ষমতায় এসে তিনি রাষ্ট্রের প্রচলিত কাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে দিয়েছিলেন। ফলে পুলিশের মনোবল তখন তলানিতে। সে কারণেই ৩৪৬ কয়েদি ধরা তো দূরের কথা, তাঁদের ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্যও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির অবস্থা আরও বেশি অস্বস্তিকর। কারণ একদিকে তারা জনগণের কাছে নিরাপত্তা দেয়ার অঙ্গীকার করেছে, অন্যদিকে তাদের জোটসঙ্গী জামায়াতের কর্মীরাই এসব লুট হওয়া অস্ত্র ও পলাতক অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। ফলে বিএনপির নেতৃত্ব চাইছে ইস্যুটা চাপা দিয়ে যেতে, যাতে জোট সরকারের ভেতরের ক্ষতটা প্রকাশ্যে না আসে। কিন্তু একটা রাষ্ট্রকে এভাবে চলতে দেয়া যায় না। ১,১৪৩ রাউন্ড গুলি হাতের বাইরে থাকা মানে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রকাশ্য উপহাস। আর পলাতক ৩৪৬ জন কয়েদি সমাজে মিশে থাকা মানে প্রতি রাতে যে কোনো প্রতিবেশী, সহকর্মী বা রাস্তার অচেনা মুখ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়া।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, হামলার সময় কারাগারের ভেতরে থাকা কম্বল, বালিশ, ওষুধ, ফ্যান, আসবাবপত্রও লুট হয়েছে। কারাগারের জেল সুপারের বাসভবনে হামলা চালিয়ে ব্যক্তিগত মালামাল লুট হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। একটি ধান্দাবাজ চক্র পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় একটি স্থাপনাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, এটা কোনো রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, এটা রাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। অথচ এই ঘটনার পর কেটে গেছে দুই বছর, কোনো চক্রান্তের মূল হোতা ধরা পড়েনি, কোনো মদতদাতার নাম প্রকাশ্যে আসেনি। তদন্ত এখনো ‘অব্যাহত’ আছে বলে যে কৌশলী বক্তব্য দেয়া হয়, তা আসলে দায়িত্ব এড়ানোর কূট কৌশল ছাড়া কিছু না।
একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে হবে, যতদিন না এই ১,১৪৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হবে, ততদিন বাংলাদেশের কোনো নাগরিক নিরাপদ নয়। কারণ এসব গুলি দিয়ে রাস্তার মোড়ে গুলি করে মানুষ খুন হতে পারে, হতে পারে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে হামলা, হতে পারে কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম। আর পলাতক ৩৪৬ জন কয়েদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামর্থ্য নিয়ে খোলামেলা বিদ্রুপ করছে। ৭৩০ দিন পার করে দিয়েও যখন রাষ্ট্র ৩৪৬ জন চিহ্নিত আসামিকে ধরতে পারে না, তখন নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের সংশয় হওয়া স্বাভাবিক, রাষ্ট্র আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে? জনগণের নাকি ওই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর?
