আবু মকসুদ
আমি বিউটি রানী পালের নাচের অধিকারের পক্ষে, গানের অধিকারের পক্ষে।
শুধু বিউটি রানী নন, এই পৃথিবীর যে কোনো মানুষ যদি নাচতে চায়, তবে তার সেই অধিকারের পক্ষেও আমি দাঁড়াই। কারণ নাচ কোনো অপরাধ নয়। মানুষের শরীর যখন আনন্দে দুলে ওঠে, তখন সভ্যতার জন্মেরও বহু আগে সেই ছন্দ পৃথিবীতে ছিল। নদী যেমন বয়ে যায়, বৃষ্টি যেমন মাটির ওপর নেচে নামে, বাতাস যেমন ধানের শিষে অদৃশ্য নৃত্য রচনা করে, মানুষের নাচও তেমনি স্বাভাবিক অস্তিত্বেরই একটি ভাষা।
আমাদের সমাজ অদ্ভুত। মানুষ খুন করলে কখনো কখনো তাকে ক্ষমা করে, দুর্নীতি করলে যুক্তি খুঁজে পায়, মিথ্যা বললে দল খুঁজে পায়; কিন্তু একজন নারী যদি নিজের আনন্দে দুই পা নাড়ায়, তখন হঠাৎ অসংখ্য নীতির প্রহরী জেগে ওঠে। যেন পৃথিবীর সমস্ত নৈতিকতার ভার তাদের কাঁধেই।
আমি সেই পৃথিবীতে বাস করতে চাই না, যেখানে মানুষের হাসি, গান, নাচ কিংবা আনন্দের আগে অনুমতির সিলমোহর লাগে।
একজন শিক্ষকও মানুষ। তিনি শ্রেণিকক্ষে জ্ঞান দেবেন, আর ছুটির পরে যদি কোনো বিকেলে নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে একটি গানের তালে শরীর দোলান, তাতে শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো স্তম্ভ ভেঙে পড়ে না। বরং যিনি নিজের জীবনকে ভালোবাসতে জানেন, তিনি অন্যের জীবনেও আলোর কথা বলতে পারেন।
জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, মানুষ শেষ পর্যন্ত জীবনের কাছেই ফিরে আসে। সেই জীবন কেবল রুটি, বেতন আর দায়িত্বের নয়; সেখানে শিউলির গন্ধ আছে, নদীর জল আছে, জ্যোৎস্নার নিচে নিঃসঙ্গ হেঁটে যাওয়া আছে, আবার হঠাৎ কোনো অচেনা সুরে নিজেকে ভুলে যাওয়াও আছে। মানুষের আত্মা কেবল যুক্তিতে বাঁচে না, সৌন্দর্যেও বাঁচে।
আজ বিউটি রানী পালকে ঘিরে যে ঝড় উঠেছে, তা আসলে একটি নাচকে ঘিরে নয়। এটি মানুষের স্বাধীনতাকে কতখানি সংকুচিত করা যায়, তারই এক নীরব পরীক্ষা। আজ যদি নাচের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায়, কাল হয়তো গাওয়ার অধিকার, পরশু লেখার অধিকার, তারপর একদিন ভাবার অধিকারও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
আমি এমন এক বাংলার স্বপ্ন দেখি, যেখানে কেউ কবিতা লিখলে তাকে জেরা করা হবে না, কেউ গান গাইলে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে না, কেউ নাচলে তার চরিত্রের বিচার হবে না। কারণ স্বাধীনতা কখনো খণ্ডিত হয় না। যে স্বাধীনতা আমার জন্য চাই, সেটিই অন্যের জন্যও চাইতে হয়।
তাই আমি বিউটি রানী পালের নাচের অধিকারের পক্ষে। এবং সেই অচেনা মানুষটিরও পক্ষে, যিনি হয়তো আজও নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে নাচেন, কারণ বাইরের পৃথিবী এখনও তার আনন্দকে ক্ষমা করতে শেখেনি।
যে সমাজ মানুষের নাচকে ভয় পায়, সে সমাজ আসলে মানুষের স্বাধীন আত্মাকেই ভয় পায়। আর স্বাধীন আত্মা, নদীর মতোই, শেষ পর্যন্ত নিজের পথ খুঁজে নেয়।
