আসাদুজ্জামান আসাদ
বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ একটি সম্পূর্ণ অসুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাস করছেন । পুরুষরা এই দেশে নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানিয়ে রেখেছে। বিদ্যালয়কে পবিত্র স্থান ও মন্দিরের সাথে তুলনা করে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ উঠছে। যারা শিশু বলোতকার ও ধর্ষণের মতো অপরাধের পক্ষে সাফাই গায় তারা স্যোশাল মিডিয়ায় আমাদের শালীনতা ও গাম্ভীর্যের শিক্ষা দিতে এসেছেন। যাদের মধ্যে নেতিকতা শব্দের কোন অস্তিত্ব নেই , তারাই একজন নারী স্কুল শিক্ষকের হাঁটা ও গানের ভিডিও নিয়ে ট্রল করছেন।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ট্রল মানসিকতার মানসিক রোগী ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের পেশা আর ব্যাক্তিগত স্বাধীনতা এই দুটো বিষয় এক নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গান গেয়ে ভাইরাল হওয়া এক শিক্ষককে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। একজন শিক্ষক ক্লাসে এসে ছাত্রদের পড়াবেন এটা তার পেশাগত দায়িত্ব। এর বাইরে সেই শিক্ষক আপনার আমার মতোই মানুষ। তার হাসতে ইচ্ছা করে , গাইতে ইচ্ছে করে , নাচতে ইচ্ছে করে কবিতা আবৃত্তি করতে ইচ্ছে করলে এটা অবশ্যই অপরাধ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে এসব যেন বিশাল অপরাধ।তার উপর তিনি যদি একজন নারী শিক্ষিকা হন , তবে তার উপর মুহুর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ার উন্মাদের অভাব নেই বাংলাদেশে।এসব নিয়ে তারা রীতিমতো সাইবার বুলিং এর শিকার হন।
ফেঞ্চুগঞ্জের এক নারী স্কুল শিক্ষকের গান ও নাচের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।তার প্রথম অপরাধ তিনি শাড়ি পড়েছেন। তার দ্বিতীয় অপরাধ তিনি একজন হিন্দু নারী। তার তৃতীয় অপরাধ তিনি কেন রোবট নন?।
একজন নারী / পুরুষ শিক্ষককে মানুষ হিসেবে না দেখে আমরা রোবট ভাবতে শুরু করেছি কেন?
আমাদের সমাজের একদল মানুষ ভীমরতি ও জাজমেন্টাল মানসিকতা নিয়ে থাকেন। তাদের চিন্তার বাইরে কেউ অন্যরকম কিছু করলে তা তারা মেনে নিতে পারেন না। মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার উপর তাদের শ্রদ্ধাবোধের ভীষণ অভাব। শিক্ষক/ শিক্ষিকা মানেই তাদের কাছে একটা যন্ত্র।
দেশে একদল তৌহিদী জনতা ওরফে গুপ্ত শিবির আছে। নারী কপালে টিপ দিলে ওদের কাছে সমস্যা। নারীরা ঠোঁটে লিপস্টিক দিলে ওদের নু… পাকিস্তান জিন্দাবাদ করে উঠে। নারীরা শাড়ি ও খোলা চুলে হাঁটলে তারা সিডিউস হয়। এদের চোখ ও লিঙ্গের চিকিৎসা না করেই এরা সমাজ ও রাষ্ট্রের ঠিকাদারি নিয়ে বসে আছে।এরা মূলত মারাত্মক মানসিক বিকৃত পেডোফিলিয়া যৌনরোগী । এদের অন্ডকোষ ও মগজের সঠিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
নারী একটি সাজলে , একটু স্টাইল করে হাঁটলে , নিজের পছন্দের পোশাক পরলে আমাদের দেশের কিছু মানুষের মাথা নষ্ট হয়ে গেলো। ” জাত গেল” স্বভাবের এই মানুষগুলো আজ পর্যন্ত তারা বিহারী না বাঙালি এই প্রশ্নের সমাধান করতে পারলো না।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি পাল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের রিলস আকারে একটি ভিডিও আপলোড দিয়েছেন তার নিজের ফেসবুক একাউন্ট থেকে। এটি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা।এতেই দোষ খুঁজে ফিরছেন বিহারী পল্লীর কিছু মানুষ। তাদের কোমলমতি সন্তান নষ্ট হয়ে যাবে! এমন দোহাই তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন। ইতিমধ্যে এই ভিডিও নিয়ে বিউটি পালকে একজন স্থানীয় সাংবাদিক ব্লাকমেইল পর্যন্ত করতে চেয়েছেন। কতোটা অসভ্য একটা রাষ্ট্রে আমরা বসবাস করি তা কল্পনা করতে পারছেন?
বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারের দিকে তাকালে দেখবেন নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা বলে কিছুই নেই।এরা মানুষকে সম্মান দেয়ার শিক্ষা কোথায় পাবে বলুন তো?
শাড়ি হচ্ছে বাঙালি নারীদের অলংকার । স্কুলের উঠোন মসজিদ কিংবা মন্দির নয়। যদি তাই হতো , তবে এই স্কুল মাঠে মানুষ খেলাধুলা , নাচ , গান এসব কিছুই করতো না।
একজন স্কুল প্রধান শিক্ষিকা তিনিও আপনার আমার মতোই রক্তে মাংসে গড়া মানুষ।তার মধ্যে ইমোশন কাজ করে , হাসতে ইচ্ছা করে , কাঁদতে ইচ্ছে করে। আপনার আমার মতো তারও একটা নিজস্ব জগৎ আছে। আমার যেমন চিৎকার করে গাইতে ইচ্ছে করে , ঠিক তেমনি কেউ যদি তার রিলস ভিডিওতে বাংলাদেশের অন্যতম একটি বিখ্যাত গান
” আজ কেন মন উদাসী হয়ে / দূর অজানায় চায় হারাতে ” পোস্ট করে এটাও অপরাধ নয়।
বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ তরুণী সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস ও ভিডিও আপলোড করে। আমার অপরাধ না হলে ওই নারীর কেন অপরাধ হবে? আপনি ঘরে বসে খাবার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করলে পাপ হবে না , কিন্তু আরেকজন খোলা চুলে নাচের ভিডিও দিলেই আপনার জান্নাত নষ্ট হয়ে যাবে! এসব ভণ্ডামি রাখেন।
বিউটি রাণী পাল হওয়া বাংলাদেশে কোন অপরাধ হতে পারে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধান ও আইনের কোথাও উল্লেখ নেই ” একজন স্কুল শিক্ষক তার স্কুল প্রাঙ্গণে নাচতে , গাইতে ও হাসতে পারবে না। স্যোশাল মিডিয়ায় এমন কোন আইন নেই যে , নাচের ভিডিও পোস্ট দিলেই সোশ্যাল মিডিয়া কমিনিউটি গাইডলাইন ভঙ্গ হবে। স্কুলের প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক সমাবেশ করতে পারবেন , জুয়ার আসর বসাতে পারেন , খেলাধুলা করতে পারেন , কিন্তু নাচের ভিডিও দিলেই যত মাথাব্যথা ! বড়ই হাস্যকর এসব বিষয়। প্রশ্ন উঠতেই পারে , তাহলে এই ভিডিও নিয়ে কাদের মাথাব্যথা?
বাংলাদেশের একদল বিহারী জনগোষ্ঠী আছে। এদের কাছ বোরকা ছাড়া অন্য কোন পোশাক পরা হারাম। বর্তমান সময়ে পাকিস্তানের চেয়েও বাংলাদেশে ধর্মান্ধতা বেশী। ধর্মান্ধতা পৃথিবীর মানুষের জন্য একটা অভিশাপ।এই ধর্মান্ধ মানুষ তাদের নিজ চিন্তার বাইরে অন্য কিছু কল্পনা করতে পারেন না। এদের মগজ হাঁটুতে থাকে বিধায় কোনোকিছু দৃষ্টিকটু হলে সেটা তারা মানতে নারাজ।শালীনতার দোহাই দিয়ে বলবে , ” স্কুল প্রাঙ্গণে খোলা চুলে নাচা অপরাধ ” । কিন্তু এই বিহারীদের দেখবেন , ” মসজিদ ও মাদ্রাসার বলোতকার , ধর্ষণ ও শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা টুঁশব্দটিও পর্যন্ত করো না।”
কথায় আছে , ” যত দোষ নন্দ ঘোষ ” । নারীরা বিউটি রাণী পাল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এইভাবে নাচ ও গানের ভিডিও পোস্ট করতে থাকলে কিছু হুজুরের আকাম বন্ধ হয়ে যাবে। এদের চার বিয়া হারাম হয়ে যাবে। এজন্য একদল ভণ্ড চায় নারীরা ঘরের চার দেয়ালে বন্দী হয়ে থাকুক। নারীরা ঘরে যৌনদাসী হয়ে থাকলে ওদের লাভ। এজন্য এই ভণ্ডরা নারী স্বাধীনতাকে মানতে চায় না। ধর্মের অযুহাত, শালীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অযুহাতে শিক্ষকদের হেনস্থা করতে চায়।এরা নারীদের ঘরে ঢুকিয়ে দিতে চায়।পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক ও গোলাম করে রাখতে চায়। এদের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে কেউ কোন কাজ করলেই এরা “যত দোষ নন্দ ঘোষ ” এর মতো করে সব পাপ সেই ভুক্তভোগীদের ঘাড়ের উপর তুলে দিতে চায়।
২০২৩ সালে এক স্কুল শিক্ষিকাকে শাড়ি পড়ে একটি ভিডিও আপলোড করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করার অপরাধে ডাক্তার শামীমা মিতু নামে আরেক গুপ্ত শিবিরের সদস্য সেই নারীকে হেনস্থা করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। নারীদের প্রতি নারীদের এই সামাজিক বিরোধ ও দেয়াল তুলে দিয়েছে একদল মৌলবাদী। নারী সমাজ ও নারী শক্তিকে তারা হিন্দু , মুসলিম , বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান অসংখ্য ভাবে ভাগ করে ফেলেছে। মুসলিম পুরুষরা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন নারীদের নামে আইডি খুলে সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গত এক যুগ ধরে নারীদের হেনস্থা করছে। প্রথমে আপনার মনে হবে এরা নারী আইডি। কিন্তু যখনি অন্ডকোষে টিপ দিবেন তখন সেই নারী আবার পুরুষ হয়ে যায়। বাংলাদেশের নারীদের ঘরে বন্দী করার এটা গুপ্ত শিবিরের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। অসংখ্য নারী গুপ্ত শিবিরকে নারী ভেবে ভুল করেছে। আজ সেই ভুলের খেসারত সমগ্র বাংলাদেশ দিচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রাইমারি স্কুলের নারী শিক্ষিকাদের সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজারের মতো। সবাই মিলে ধর্ম ভেদাভেদ ভুলে স্কুল শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের পক্ষে একটা করে ফেসবুক পোস্ট দিলেও মৌলবাদীরা পাকিস্তানের করাচী ভেসে যায়। তাই দূর থেকে উহ আহ এসব না করে মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখুন। মৌলবাদ , ধর্মান্ধতা , কুসংস্কার , তৌহিদী যৌনতা এদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বয়কট শুরু করুন।।
নারী ইচ্ছে করলে মাইকেল জ্যাকসনের ” মুন ওয়াক ” এর তালে নাচবে।নারী একটা শক্তি। নারী মানে মাতৃত্ব , নারী মানে মা। তাদের সম্মান রক্ষা করা আপনার, আমার সবার দায়িত্ব।এটাই হচ্ছে আমাদের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
” নারীরাও মানুষ,ওরা কোন রোবট নয়।।”
আমি নৈতিক ও বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে বিউটি রাণী পাল সহ বাংলাদেশের সকল নারীর নারী অধিকার ও ব্যাক্তিগত স্বাধীনতার পক্ষে আছি।নারীরা স্বাধীনচেতা হলেই কেবল দেশের মুক্তি সম্ভব। বিউটি রাণী পাল নারী স্বাধীনতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক । আগামীদিনের বাংলাদেশের তরুণীদের জন্য তিনি সাহসিকতার অনন্য প্রতীক হয়ে থাকবেন ।
” স্যালুট, বিউটি রাণী পাল ।
