ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কানাডার মন্ট্রিয়ালভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন গ্লোবাল অ্যালায়েন্স এগেইনস্ট অ্যাট্রোসিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স অন হিউম্যানিটি (GA3VH)।
সংগঠনটি বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেকোনো তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবশ্যই একাডেমিক স্বাধীনতা, আইনের শাসন, যথাযথ প্রক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
আজ ৪ঠা আগস্ট, মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি সমর্থন এবং ‘জুলাই চেতনার পরিপন্থী’ মনোভাবের অভিযোগে ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তদন্তের জন্য উপাচার্যের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হলেও, তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, তদন্তের প্রতি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আস্থা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা এবং নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। অন্যথায় তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
GA3VH-এর চেয়ারম্যান ইশরাত আলম বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি মতের বৈচিত্র্য ধারণ করার সক্ষমতার মধ্যেই নিহিত।
তার ভাষ্য, ভিন্নমতকে দমন নয়, বরং গবেষণা, যুক্তি এবং মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে মূল্যায়ন করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, যা ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং একাডেমিক স্বাধীনতার প্রতি তার ঐতিহাসিক অঙ্গীকারকে আরও সুদৃঢ় করবে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩ শিক্ষকদের একাডেমিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বিশ্বাস ধারণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সংগঠনটির মতে, ‘জুলাইয়ের চেতনার পরিপন্থী’—এ ধরনের অভিযোগের বর্তমান আইনি কাঠামোয় কোনো সুস্পষ্ট আইনগত সংজ্ঞা নেই। ফলে কেবল এ ধরনের অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ যথাযথ প্রক্রিয়া ও আইনি নিশ্চয়তার প্রশ্ন তুলতে পারে।
সংগঠনটি আরও দাবি করে, জনসমক্ষে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তালিকাভুক্ত অধিকাংশ শিক্ষকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ বা প্রমাণিত প্রাতিষ্ঠানিক অসদাচরণের তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।
ইশরাত আলম আরও বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে দীর্ঘসূত্রতা, অনিশ্চয়তা কিংবা অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায় রাখা তার ব্যক্তিগত মর্যাদা, পেশাগত জীবন এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, ন্যায্য প্রক্রিয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিবৃতির শেষাংশে GA3VH স্পষ্ট করে জানায়, তাদের অবস্থান কোনো রাজনৈতিক দল, সরকার বা মতাদর্শের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। বরং একাডেমিক স্বাধীনতা, ন্যায্য বিচার, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার মতো সর্বজনীন মানবাধিকার নীতির প্রতিই তাদের অঙ্গীকার।
সংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, যেকোনো তদন্ত ও শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম যেন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, গ্রহণযোগ্য প্রমাণ, স্বচ্ছ তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তচিন্তা, মতের বহুমাত্রিকতা এবং ন্যায্য প্রক্রিয়ার সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
