মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কণ্ঠসৈনিক আরতি ধর। সিলেটে জন্ম হলেও ছোটবেলা থেকেই গানের টানে পাড়ি জমান ভারতে। সেখানেই সংগীতচর্চার পাশাপাশি লেখাপড়া করেন। পরে দেশে ফিরে সংগ্রামী চেতনার গান গেয়ে লাখো বাঙালির মনে স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রেরণা জাগিয়ে তোলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত দেশাত্মবোধক গান স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত করেছিল অসংখ্য মানুষকে।
১৯৪৫ সালে সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন আরতি ধর। তাঁর পিতা বনবিহারী ধর এবং মাতা শুধারানী ধর। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। বাবা-মায়ের উৎসাহ ও সহযোগিতায় ভারতে গিয়ে বড়মাপের সংগীত গুরুর কাছে গান শেখার সুযোগ পান। একই সঙ্গে সেখানেই লেখাপড়া সম্পন্ন করেন। কলেজ জীবন শেষে দেশে ফিরে সংগ্রামী চেতনার গান পরিবেশনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে থাকেন। ১৯৬২ সাল থেকে তিনি বেতারের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে গান গাওয়া শুরু করেন। পরে ঢাকা থেকে টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হলে ১৯৬৬ সাল থেকে টেলিভিশনেও নিয়মিত গান পরিবেশন করেন। পাশাপাশি গণমুক্তি শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন।
এই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কারণেই ২৫ মার্চ পা/কিস্তানি হা/না/দার বাহিনীর গ/ণহ//ত্যা শুরু হওয়ার পর আরতি ধরও পা/ক সেনা ও তাদের দো/সরদের নজরে চলে আসেন। একাধিকবার তাঁর বাড়ির সামনে পা/ক সে/নাদের গাড়ি এসে থামে। পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা তাঁর খোঁজে বাড়িতেও যান। তবে কৌশলে তাঁদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রক্ষা পান তিনি। পরে সান্ধ্য আইন শিথিল হলে বৃদ্ধ বাবাকে সঙ্গে নিয়ে মণিপুরি পাড়ায় গিয়ে কিছুদিন আত্মগোপন করেন। এরপর করিমগঞ্জ হয়ে তাঁর পরিবার ভারতে চলে যায়।
ভারতে যাওয়ার পথেও বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। সে অভিজ্ঞতার কথা এক সাক্ষাৎকারে আরতি ধর বলেন,
‘‘পথের মধ্যে একদিন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাবা সাথে ছিলেন। একটা ভাঙা সেতুর নিচ দিয়ে পার হতে হবে। হঠাৎ শুনতে পেলাম পা/ক সে/নারা এদিকে আসছে। সেখানে আমরা প্রায় আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। তারপর কোন রকমে তাদের চোখে ফাঁকি দিয়ে পাশের একটা বাড়িতে আমরা বেশ কয়েকজন লুকিয়ে থাকলাম। সেখান থেকেই দেখতে পেলাম, পা/ক সে/নারা সেখান দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।’’
ভারতে পৌঁছে আবারও আগের শিল্পী গোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হন তিনি। এরপর চার নম্বর সেক্টরে ফরিদ গাজির নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। বিভিন্ন এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতেন আরতি ধর ও তাঁর সহকর্মীরা। সংগ্রহ করা সেই অর্থ মুক্তিযোদ্ধাদের শি/বিরে পৌঁছে দেওয়া হতো যু//দ্ধের প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবেশিত গানগুলোর প্রসঙ্গে আরতি ধর বলেন,
‘‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানগুলো গাইতাম আমরা। তখন তো সবার মুখে মুখে ছিল গানগুলো। যেমন স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে, জয় বাংলা বাংলার জয়, শোন এক মুজিবুরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মুজিবুরের কণ্ঠে, নোঙর তোল তোল, সময় যে হলো হলো – এই গানগুলিই করতাম বেশি।’’
সীমান্ত এলাকায় গান পরিবেশন করতে গিয়ে একদিন গভীর রাতে দলছুট হয়ে পড়েন আরতি ধর। সেদিন আর শি/বিরে ফেরা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাবাকে সঙ্গে নিয়ে একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে রাত কাটাতে হয়েছিল তাঁকে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারও বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন শুরু করেন আরতি ধর। বিশেষ করে সিলেটের আঞ্চলিক গান, বাবা শাহজালালকে নিয়ে ভক্তিমূলক গান এবং হাসন রাজার গান পরিবেশনের জন্য তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। লন্ডন, কাতার, আবুধাবি, দুবাই ও বাহরাইনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি হাসন রাজার গান পরিবেশন করেছেন।
২০১০ সালের ডিসেম্বরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২৮ জন শিল্পী ও শব্দসৈনিককে সম্মাননা জানানো হয়। সেই অনুষ্ঠানে তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা পদক গ্রহণ করেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কণ্ঠসৈনিক আরতি ধর।
তথ্য কৃতজ্ঞতা: ডয়েচে ভেলে
সৌজন্যে: বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র
