আফজাল হোসেন
খাবার দাবার আমাদের টানতো কেনো? আমার এবং অন্যান্যদের আরো অনেক আড্ডা দেয়ার জায়গা ছিল। বন্ধুরও অভাব ছিল না। বিশেষ করে নিজেরটা বলি, আমার ছিল অনেক গোত্র আর গোত্রে গোত্রে অনেকগুলো বন্ধু।
পড়ি আর্ট কলেজে। সেখানে একদল বন্ধু ছিল। ঢাকা থিয়েটারে অভিনয় করি, সেখানেও অনেক অনেক বন্ধু। চাঁদের হাটে যুক্ত হওয়ার পর অল্পদিনের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় সাহিত্য পাগল আর একদল বন্ধু।
খাবার দাবারকে কেন্দ্র করে সাগরের আশ্রয় প্রশ্রয়ে ধীরে যে আড্ডা, বন্ধু গোষ্ঠী তৈরি হলো তা একেবারে নতুন আর একটি বন্ধুদল নয়। এ গোত্র ও গোত্র থেকে এসে নতুন একটা জায়গায় মিলে নতুন বন্ধুত্ব সৃজনের আনন্দে যুক্ত হওয়া, মত্ত থাকা।
সেখানটায় সাগর আর শাইখ সিরাজের কিছু বন্ধু আসা যাওয়া করতো। খাবার দাবারে আমাদের বাড়তি পাওনা ছিল, ওদের বন্ধুদের কাউকে কাউকে নিজের, নিজেদের বন্ধু হিসাবে পাওয়া।
এতো সৌভাগ্য আমাদের, অনেক অনেক ভালো বন্ধু থাকা সত্বেও আরো কিছু ভালো বন্ধু কপালে জুটেছে।
যেমন তাহমিনা শাহাবুদ্দিন তখন টেলিভিশনের অতি জনপ্রিয় সংবাদ পাঠিকা। সেই তাহমিনা আসলে সাগরের বন্ধু। যার ডাক নাম ছন্দা। সাগরের বন্ধু বলে ছন্দা আমাদের কাছেও আর তারকা তাহমিনা শাহাবুদ্দিন থাকেনি, হয়ে গেলো ছন্দা।
এরকম আরো অনেকের উদাহরণ দেয়া যায়। এক বন্ধুর সূত্রে আর একজন বন্ধুকে পেয়ে যাওয়া, এভাবেই সম্পর্ক, বন্ধুত্ব বিস্তৃত হয়। জীবন সম্পূর্ণতা পেতে থাকে।
মানুষে মানুষে পরিচয় হলেই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে না। অনেকেই বেশ কাছের মানুষ হয়ে গেলো, তারা হয়ে যেতে পারে প্রিয় মানুষও কিন্তু সবাই বন্ধু হয়ে যায়, যাবে তেমন নয়। বন্ধুত্ব চেষ্টা করে হওয়ানোর বিষয় নয়। যার সঙ্গে হওয়ার এমনি এমনিই হয়ে যায়।
খাবার দাবার ছিল কয়েকটি নদীর মোহনার মতো। এক এক নদী বেয়ে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে আমরা এসে সেই প্রিয় মোহনায় মিলিত হয়েছি। ঢাকাতে যাদের থাকার জায়গা নেই, পরিবার নেই, হয়তো কখনো কখনো কারো পকেটও খালি, রাতের খাওয়া কোত্থেকে জুটবে
তা নিয়ে মাথাব্যথা হয়নি কারো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা আনন্দের টানে পৌঁছে যেতাম খাবার দাবারে।
কারো ভালো লাগার মতো সঙ্গের অভাব ছিল না। সবারই ছিল আলাদা আলাদা বন্ধুদল। অনেক রকমের, বিচিত্র আগ্রহের অনেক বন্ধু থাকা সত্বেও খাবার দাবার কেনো টান মেরে নিয়ে যেতো সেই পাঁচ ফিট বাই পাঁচ ফিটের একটা কেবিনে?
কেনো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে খুব ভালো লেগেছে। কেনো ছবি আঁকতে ভালো লাগে, কেনো লিখতে ভালো লাগে, কেনো নতুন নতুন বিষয়ে আকৃষ্ট হই, মন কেনো ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নতুন কোনো বিষয়ের দিকে দৌড়ে যেতে বলেছে! এখনো কেনো হাতের কাজ ফেলে রেখে ভাবনার জগতে ঘুরতে ভালো লাগে এসব প্রশ্ন কখনোই মনে জাগেনি, জাগে না। আমরা সময়ের মায়ায় জড়িয়ে দৌড়াই, থামি, ভালোবাসা খুঁজি। পাই। খুঁটে খুঁটে খেয়ে মন ভরাই, এরই নাম জীবন।
এক জীবনে হাজারটা প্রশ্ন থাকে। সে জীবনপুকুরে সব প্রশ্ন ধুপুর ধাপুর করে সাঁতরে বেড়ায় না। সে প্রশ্নেরা নিঃশব্দে পদ্ম পাতা ও ফুলের মতো ভেসে থাকে টলমল জলে। প্রশ্নেরা ছটফটে হলে আমাদের জীবন বোধহয় এতো সৌন্দর্যে পূর্ণ হতো না। প্রশ্নের মতো মানুষেরাও ছটফটে হতো। ছটফটে মানুষের মন পৃথিবী, জীবন, আলোর উদয় অস্ত নিয়ে ভাববার সময় পেতো কখন?
পড়তাম আর্ট কলেজে। ছবি ছোটবেলা থেকে আঁকি। একসময় খুব কবিতাপ্রেমিক হয়ে উঠি। কেনো, কিভাবে তা ভেবে দেখা হয়ে ওঠেনি। ভেবে দেখিনি কবিতা জীবন বদলে দিতে পারে। দিয়েছিল। এতদিন পর পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখতে পাই, একটু একটু করে আসলেই তা আমার জীবন বদলে দিয়েছিল।
কবিতা বলতে বুঝতাম “ছিপ খান তিন দাঁড় তিনজন মাল্লা” “তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে” বা “তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে”এইসব পড়ার বইয়ের কবিতা। আট ক্লাস পর্যন্ত কোনো কবিতার বই নেড়ে চেড়ে দেখার আগ্রহ হয়নি।
আমাদের স্কুলে একবার শিক্ষামন্ত্রী আসবেন বলে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। ক্লাস শুরুর আগে স্কুলে যে দলটা জাতীয় সংগীত গাওয়ায় নেতৃত্ব দিতো, আমি সেই দলের একজন ছিলাম। বোধহয় সে কারণেই স্কুলের হক স্যার হঠাৎ একদিন আমাকে ডেকে বললেন, হাতে সময় আছে তুমি বিদ্রোহী কবির একটা কবিতা প্রাকটিস করে আমাকে শোনাবে।
পড়ে গেলাম বিপদে। যে কখনো কবিতা পড়েনি তাকে অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, শিক্ষক, ছাত্রদের সামনে কবিতা পড়তে হবে। এ বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে মনে মনে ভাবি, আশা করতে থাকি একদিন শুনবো মন্ত্রীর স্কুল পরিদর্শন বাতিল হয়ে গেছে।
প্রতি বৃহস্পতিবার দিন শেষে স্কুলের হোস্টেল থেকে একদিনের ছুটিতে বাড়িতে যেতে পারতাম। দূরত্ব পাঁচ মাইল। বৃষ্টির দিনে বাস চলতো না। এক হাঁটু কাদা ভেঙে ফিরতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হতো না। মনে মহা আনন্দ নিয়েই ফিরতাম পারুলিয়ায়। একদিনের ছুটি কাটানোর সুযোগ। সেও ছিল মূল্যবান পাওয়া।
মধ্যদিন থেকে সারাক্ষণ পালা করে মাথায় ঘুরেছে, মন্ত্রীর আসা বাতিল হয়ে যাবে। এই বাতিল হওয়ার আশার সাথে আমাকে কবিতা পড়তে বলা হলো কেনো, এ প্রশ্নও মাথার ভিতর দৌড় ঝাঁপ করতে থাকে। হক স্যার আমাদেরকে যেভাবে পিটি প্যারেড করাতেন প্রায় তেমন ভাবেই আর এক ভাবনা মগজে লেফট রাইট লেফট রাইট বলে বলে প্যারেড করতে থাকে।
লেফট রাইট করা ভাবনাটা হচ্ছে, স্কুলের অনেকেই তো জেনে গেছে, আমাকে অনুষ্ঠানে কবিতা পড়তে বলা হয়েছে। অনুষ্ঠানের আগে হক স্যারকে কবিতা পড়ে শোনাতে হবে। শোনাতে গিয়ে যদি বাদ পড়ে যাই সেটা স্কুলের সবাই জেনে যাবে। এমন হলে সেটা হবে অতি লজ্জার। অপমানজনকও।
হেঁটে বাড়ি ফিরছি। অন্য সময় হাঁটার চেয়ে দ্রুত গতিতে মন ছুটতে থাকে। সেদিন মন খুব বিপদে। মন কবিতার ফাঁদে পড়ে ডানা ঝাপটাচ্ছে। সেই বিপদের মধ্যে একটুখানি আশা, মন্ত্রীর স্কুল পরিদর্শন যদি বাতিল হয়ে যায়। বার বার বলতেই থাকি, বাতিল হয়ে যাক, বাতিল হয়ে যাক।
রাতে খাওয়ার সময় আম্মাকে বললাম, আমাদের স্কুলে শিক্ষামন্রী আসবেন, সেই অনুষ্ঠানে হক স্যার আমাকে কবিতা পড়তে বলেছেন। বুঝতে পারি, শুনেই আম্মা খুব খুশি হলেন এবং এও বুঝতে পারি আনন্দের সাথে খানিকটা শঙ্কাও জাগে তাঁর মনে। প্রথমে বললেন,
– এটা খুবই ভালো খবর, খুশির খবর।
বলে থামেন। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন,
– পারবি তুই?
আম্মার সেই “পারবি তুই” আমার বুকে বল এনে দিয়েছিল। রাতে মশারির মধ্যে হাতপাখায় বাতাস খেতে খেতে মনে মনে বলেছিলাম, আমাকে পারতেই হবে। এই যে মনে পারতেই হবে এমন সাহস জেগে উঠেছিল, কেনো?
মন্ত্রীর স্কুল পরিদর্শন বাতিল হয়নি। অনুষ্ঠানসূচি থেকে গান ও কবিতা বাদ দেয়া হয়েছিল। বেঁচে গিয়েছিলাম। যাকে বলে, হাঁফ ছেড়ে বাঁচা। কবিতা পড়তে হয়নি কিন্তু কবিতার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
প্রেম এভাবেই হয়। হয়ে যায়। এভাবেই আচমকা অচেনার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একটা জায়গা, কোনো মানুষ, মানুষের লেখা, গাওয়া গান, আঁকা ছবি বা অতি চমৎকার একটা মুহূর্তের সাথে প্রেম হয়ে যায়। যে মুহূর্তের কথা মানুষ ভাবেইনি, তেমনই এক একটা মুহূর্ত সামনে আসে এবং হঠাৎ হাজির হয়ে যাওয়া মুহূর্তটা জীবনে হয়ে ওঠে বিশেষ।
খাবার দাবারে একদিন এক যুবক এসে হাজির। সাগর পরিচয় করিয়ে দেয়,
– এ হচ্ছে ইফতেখার, ফার্মেসী বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করছে। আমাদের গোত্রে এরকম একজন থাকলে ভালো।
সেদিন ফরীদি ছিল। আড্ডায় সে থাকলে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাওয়ার মতো একটার পর একটা জোক্স বলে যেতে পারে। সেদিনও একটার পর একটা কৌতুক শোনাচ্ছিল। আমরা তুমুল হাসি হুল্লোড়ের মধ্যে ছিলাম। তার মাঝখানে আড্ডাঘরের দরজাটা পুরো খুলে সাগর প্রবেশ করে। পিছনে মোটা গোঁফের শুকনো মতো এক যুবক। মুখ তার হাসি হাসি। সাগর নাম বলেছে। ইফতেখার।
নাম, পরিচয় জানিয়ে সাগর যে কথাটা বলেছে ফরীদি হুবহু সে কথাটা নিজের মুখে আওড়ায় “আমাদের গোত্রে এরকম একজন থাকলে ভালো” এতটুকু বলে থামে ফরীদি।
সাগর অনুমান করতে পারে তার বলা কথা নিয়ে ফরীদি স্বভাবসুলভ কিছু একটা রসিকতা করবে।
ফরীদির মুখে দুস্টুমির হাসি। সাগরের মুখেও সাগর স্টাইলের দুষ্টুমি।
– কি বলবে বলে ফেলো, অপেক্ষা করে আছে সবাই।
আমি সাগরের কাছে ইফতেখার সম্পর্কে আগে শুনেছিলাম। লেখালেখি করা অনেকেই খাবার দাবারে আসে শুনে ইফতেখার জানিয়েছিল, একদিন আসবে।
একদিন এসে মিলনের সঙ্গে লম্বা সময় ধরে আড্ডা দিয়ে গেছে ইফতেখার। সেদিন আমরা কেউ আসিনি। মিলন বলেছিল, ছেলেটা অনেক জানে। দীর্ঘ সময় সাহিত্য নিয়ে দুজনে আলাপ করেছিল।
সে আলাপের পর মিলনের মনে হয়েছে ওষুধ বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করলেও সাহিত্য সম্পর্কে তার অনেক জ্ঞান।
অর্ধেক কথা বলে চুপ হয়ে ছিল ফরীদি। বাকিটুকু বললো, তুমি কি খাবার দাবারকে চিড়িয়াখানা বানাতে চাচ্ছ সাগর? এক এক পদের, বিচিত্র নাম ও চেহারার মানুষ জড়ো করছো। ইফতেখার কি তোমার সংগ্রহশালায় নতুন সংযোজন ?
