বর্তমান সময়ে শুধু সীমানা দিয়ে কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব নির্ধারণ হয় না; পররাষ্ট্রনীতি ও বাণিজ্যনীতিও এর অংশ। নিজের স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা জাতীয় সার্বভৌমত্বের অন্যতম ভিত্তি। জ্বালানি সার্বভৌমত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে পারলেই বাংলাদেশের টিকে থাকা ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে।গত তিন বছর ধরে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি তুলনা করতে আমরা ১৩ আগস্টকে মানদণ্ড ধরি। ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এই দিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি ব্যয়ের চিত্র দেখব।
২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট সন্ধ্যার পিক আওয়ারে মোট উৎপাদন ছিল ১৩,৯৮২ মেগাওয়াট। গ্যাস থেকে আসে ৫,৭৭৭ মেগাওয়াট (৪১.৩২%), কয়লা থেকে ৩,৬০১ মেগাওয়াট (২৫.৭৬%) এবং তেল থেকে ২,৭৬৬ মেগাওয়াট (১৯.৭৮%)। বাকি চাহিদা পূরণ হয় ভারত থেকে আমদানি ও দেশীয় নবায়নযোগ্য উৎসে।
২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট মোট উৎপাদন বেড়ে ১৪,৯৮০ মেগাওয়াট হয়। গ্যাস থেকে ৫,৬৪৪ (৩৭.৬৮%), কয়লা থেকে ৪,১৭৪ (২৭.৮৬%) ও তেল থেকে ২,০১৫ মেগাওয়াট (১৩.৪৫%) উৎপাদিত হয়। বাকি আসে আমদানি, সৌর ও জলবিদ্যুৎ থেকে।
২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ১৬,২৮০ মেগাওয়াটে। গ্যাস থেকে ৫,৯৩০ (৩৬.৪৩%), কয়লা থেকে ৫,১৯৪ (৩১.৯০%) ও তেল থেকে ২,১০২ মেগাওয়াট (১২.৯১%) আসে। বাকি আমদানি ও নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ হয়।
উৎপাদন খরচের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট গ্যাসে প্রতি ইউনিট খরচ ছিল ২.৯৯ টাকা, কয়লায় ৬.৯০ টাকা ও তেলে ১৮.২৫ টাকা। ২০২৫ সালে গ্যাসে খরচ বেড়ে ৩.৫৫ টাকা হয়, কয়লায় কমে ৫.৯৬ টাকা ও তেলে ১৮.৬২ টাকা। ২০২৬ সালে গ্যাসে ৩.৫৯ টাকা, কয়লায় ৬.৭৩ টাকা ও তেলে ১৮.৬২ টাকা খরচ হয়।
পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, গ্যাসে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে—এর কারণ আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা। তেলের ইউনিটপ্রতি ব্যয় বাড়েনি, বরং তেলের ব্যবহার কমেছে এবং কয়লার ব্যবহার বেড়েছে। অর্থাৎ জ্বালানি মিশ্রণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন নেই।
তাহলে সংকট কোথায়?
চলতি গ্রীষ্মে চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অথচ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রে উৎপাদন বেড়েছে এবং মোট উৎপাদনও বেড়েছে—তারপরও লোডশেডিং হচ্ছে। এর একটি কারণ চাহিদা বৃদ্ধি, যা প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ে। বাড়তি চাহিদার পুরোটা সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
চাহিদার চাপ সবচেয়ে বেশি সন্ধ্যার পিক আওয়ার ৬টা থেকে রাত ১২টা, যার প্রধান কারণ এসির ব্যাপক ব্যবহার। অনেকে অটোরিকশাকে দায়ী করেন, কিন্তু রাত ১২টার পর চাহিদা ১২ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। সন্ধ্যার প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বাড়তি লোডের বড় অংশ আসে এসি থেকে। অটোরিকশার চার্জ মূলত রাত ১২টার পর শুরু হয়, তাই পিক আওয়ারের লোডশেডিংয়ের জন্য অটোরিকশাকে সরাসরি দায়ী করা যায় না। বরং নন-ইনভার্টার নন-ব্র্যান্ড চীন থেকে আনা মানহীন এসি সমানে বিদ্যুৎ খাচ্ছে। এসব এসির লোড নিতে পারছে না আমাদের বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো। অতি সত্বর সরকারকে এসব নিম্নমানের নন-ইনভার্টার এসি আমদানি বন্ধ করতে হবে। নিম্নমানের চীনা এসি আমদানি বন্ধ করা গেলে জুন থেকে আগস্ট মাসে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গ্রীষ্মের যে লোড থাকে সেটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সঠিক নীতি প্রয়োজন—স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহের ওপর দেশের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
দেশে আসলে বড় কোনো জ্বালানি সংকট নেই। গত তিন বছরে গ্যাসের দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি প্রায় একই মাত্রায় রয়েছে। মূল বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে সাগরের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালকে ঘিরে। সরকারের দাবি, বৈরী আবহাওয়ায় সামিটের টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ সম্ভব নয় এবং এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনালে আগুন লাগায় সরবরাহ বন্ধ।
২০১৮ সালে সামিটকে একটি টার্মিনাল ইজারা দেওয়া হয়, তবে জাহাজটি সামিট মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের কাছ থেকে ভাড়া নেয় এবং পরিচালনার দায়িত্বও এক্সিলারেটকে দেওয়া হয়। অন্য টার্মিনালটিও এক্সিলারেট পরিচালনা করছে; ভাড়া দেয় পেট্রোবাংলা। সম্প্রতি একটি এলএনজি জাহাজ সামিটের টার্মিনাল ফিরিয়ে দিয়েছে, যদিও একই মডেলের জাহাজ আগে সেখানে এলএনজি খালাস করেছে। গ্রীষ্মের পিক আওয়ারে দুটি টার্মিনাল থেকেই সরবরাহ বন্ধ—যার পরিচালনায় যুক্ত মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এক্সিলারেটের কান্ট্রি হেড পিটার হাস, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পদত্যাগের চার দিন পর এক্সিলারেটে যোগ দেন। এতে মার্কিন ‘কুলিং-অফ’ আইন লঙ্ঘনের প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি গানভর ইউএসএ-র সঙ্গে ১৩ বছরের, প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের (৪৭ হাজার কোটি টাকা) এলএনজি চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা অর্থনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত মার্কিন নির্ভরতার দৃষ্টান্ত। বিদ্যমান জিটুজি সুযোগ থাকলেও বেসরকারি কোম্পানিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া এবং উন্মুক্ত দরপত্র এড়িয়ে চুক্তি স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
কাতার বা ওমানের স্থিতিশীল তেল-ভিত্তিক দরের বিপরীতে গানভরের দাম জেএকেএম সূচকের সাথে যুক্ত, যা অস্থির এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবর্তনে দাম দ্রুত বাড়াতে পারে। প্রতি ডলারে বড় মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আসতে ৪০-৪৫ দিন লাগে—পরিবহন ও বীমা ব্যয় বাড়ায়। ‘টেক অর পে’ ব্যবস্থায় বাজারদর কমলেও নির্ধারিত পরিমাণের মূল্য পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। সরবরাহ ও ক্রয়—দুই ক্ষেত্রেই একই বিদেশি স্বার্থের ওপর নির্ভরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাধীনতার পর খাদ্য আমদানিতেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরবরাহ সমস্যা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বিকল্প উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা জরুরি।
আমরা বিকল্প প্রস্তাব করছি পেট্রোবাংলা পাঁচ বছরের জন্য একটি পুরোনো এলএনজি জাহাজ ভাড়া নিতে পারে, যা মাতারবাড়ির কাছে সমুদ্রে রাখা যেতে পারে। জরুরি অবস্থায় এটি বিকল্প সরবরাহের উৎস হিসেবে কাজ করবে; স্বাভাবিক সময়ে ২৫-৩০% সক্ষমতায় ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এলএনজি জাহাজকে ভাসমান টার্মিনালে রূপান্তর করা হয়। এতে নির্দিষ্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমবে। বর্তমানে সামিট ও এক্সিলারেটকে বছরে ২,০০০-২,২০০ কোটি টাকা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে; এই অর্থে পুরোনো এলএনজি জাহাজ কেনার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তার মূল প্রশ্ন শুধু কত মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে, তা নয়—বরং জ্বালানির উৎস, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে দেশের নিয়ন্ত্রণ কতটুকু। দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে, একাধিক সরবরাহ উৎস রাখতে হবে, জরুরি বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আর্থিক ঝুঁকি কঠোরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
রূপপুরের সংকট ও সার্বভৌমত্ব
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১,২০০ মেগাওয়াট পাওয়ার কথা থাকলেও তা গ্রিডে আসতে সমস্যা হচ্ছে। এর বড় কারণ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা কঠোর হয়েছে, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেন বাধাগ্রস্ত—যার প্রভাব রূপপুরের রুশ ঋণ পরিশোধের ওপর পড়েছে।
ডলারে লেনদেনের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কম দামে পারমাণবিক বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা গ্রিডে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এটি শুধু জ্বালানি সংকট নয়, এটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন—একটি স্বাধীন দেশ হয়েও বৃহৎ পরাশক্তির নিষেধাজ্ঞার কারণে নিজের জ্বালানি স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বাংলাদেশ। রূপপুরের সংকট আমাদের শিক্ষা দেয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেই জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হয় না; অর্থ পরিশোধের পথ, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা—সবকিছুর ওপর কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাই প্রকৃত জ্বালানি সার্বভৌমত্বের ভিত্তি।
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা
দেশের ভূখণ্ডে ৩২-৪২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) অনাবিষ্কৃত গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। সিলেটের বিবিয়ানায় প্রায় পৌনে এক টিসিএফ ছাড়া বাকি গ্যাস শেভরন উত্তোলন করেছে; সম্প্রতি তাদের নতুন এলাকায় অনুসন্ধানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তিতাসে এখনো প্রায় ৫ টিসিএফ গ্যাস থাকতে পারে।
ফরাসি স্লামবার্জারের মতে, আধুনিক সংস্কারে এক বছরের মধ্যে দৈনিক ৬০ কোটি ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস পাওয়া সম্ভব। নরওয়ের ইকুইনর ও মিলিটারি ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, বন্ধ থাকা ৩০টি কূপে উল্লেখযোগ্য উত্তোলনযোগ্য গ্যাস রয়েছে—শুধু এসব কূপ থেকে দৈনিক অন্তত ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া সম্ভব। এগুলো স্বল্পমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি করে।
সুনেত্রে একটি কূপ খনন করে গ্যাস না পাওয়ায় সেখানে আর কূপ খনন করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুনেত্রে তো নিশ্চিতই গ্যাস আছে। এখানে কম করে হলেও ৯ থেকে ১০টি কূপ খনন করা দরকার। কুমিল্লার বাঙ্গুরাতে ৫টি কূপ খনন করা হয়েছে, এর মধ্যে একটি বন্ধ আছে বাকি চারটি থেকে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। এই একই স্তরে বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে ওএনজিসি গ্যাস উত্তোলন করছে; সেখানে তারা প্রায় ১০০ কূপ খনন করেছে।
আর বাংলাদেশ বাঙ্গুরাতে ৫টি কূপ খনন করেছিল, একটি বন্ধ আছে। বাকি চারটিতে গ্যাসের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। ভারত তার এই গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস দিয়ে পালটানা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, সেখান থেকে বাংলাদেশ ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে। আর বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনে সত্যিকার চেষ্টা নেই কোনো সরকারের। এখানে দ্রুত অন্তত ১০টি কূপ খনন করতে হবে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির কাচালং-এ গ্যাস প্রাপ্তির অনেক বড় সম্ভাবনা রয়েছে। সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলনে ইউনাইটেড মেরিডিয়ানকে দিয়ে একবার চেষ্টা করা হয়, তারা নিরাপত্তার সংকটে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ায় আর কোনো সরকার চেষ্টা করেনি। দেশের সমতল এলাকায় বেঙ্গল বেসিনে গ্যাসের বিপুল আধার রয়েছে। ভোলা থেকে শরীয়তপুর, খুলনা, পাবনা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত এই বেসিনের আওতাভুক্ত। বাপেক্স ত্রিমাত্রিক জরিপ শেষ করেছে; এখন কূপ খনন প্রয়োজন। মার্কিন ইউএসজিএসের মতে, পাবনা থেকে খুলনা পর্যন্ত ৬.৫ টিসিএফ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোলার প্রায় ৮ টিসিএফ গ্যাস ভোলা-খুলনা পাইপলাইনের মাধ্যমে কাজে লাগানো যেতে পারে; এতে খুলনায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও শিল্পকারখানা চালু করা সম্ভব। খুলনা-ভেড়ামারা সঞ্চালন লাইন ইতোমধ্যে রয়েছে, যা ভেড়ামারা ও সিরাজগঞ্জের বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরাসরি গ্যাস দিতে পারে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার ১০০টি কূপ খননের কর্মসূচি নিয়েছিল যার মধ্যে ছিল অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার, যা ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার বন্ধ করে দেয়, এটি পুনরায় চালু করলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হতে পারে। গত ৫০ বছরে দেশে মাত্র ১০৪টি কূপ খনন করা হয়েছে—অথচ আয়তনে ১০০ কিলোমিটারের ত্রিপুরায় ১৫০টির বেশি কূপ খনন করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে এখন পর্যন্ত কোনো অনুসন্ধান কূপ খনন হয়নি। কনোকোফিলিপস প্রায় ৫ টিসিএফ গ্যাসের মজুত পেলেও দাম নিয়ে (তাদের দাবি ৭ ডলার, অথচ চুক্তি ছিল ৪.২ ডলার) সমঝোতা না হওয়ায় তারা চলে যায়। অথচ পরে বাংলাদেশ ১২ ডলারের বেশি ও স্পট মার্কেটে ৩৭ ডলার পর্যন্ত এলএনজি কিনেছে। গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান শুরু না করলে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি হবে না।
‘সিস্টেম লস’-এর নামে গ্যাস চুরি ঠেকান তিতাসে ‘সিস্টেম লস’ ৭.৬৭%। এটা গ্যাস চুরি। এই চুরি বন্ধ করলে ৮০০ মেগাওয়াটের বেশি গ্যাসভিত্তিক একটি কেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব সারা বছর। আর সরকার আমেরিকার কোম্পানি গানভরের সঙ্গে যে জাপান কোরিয়া মার্কার বেঞ্চমার্কে কেনার চুক্তি করেছে সেই দর অনুযায়ী এ পরিমাণ এলএনজির দাম প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ চুরি সামাল দিতে পারলে হয় আপনার ১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে, না হয় এই গ্যাস দিয়ে ৮০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে পারবেন।
ছয় মাসে সৌরবিদ্যুতে সংকট সমাধান
২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সফর করেন। সে সময় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ২৭টি প্রকল্পের জন্য চীন প্রায় ২৪.৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ ও আর্থিক সহযোগিতার চুক্তি/সমঝোতা করে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে জিটুজির ভিত্তিতে ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের অনুমতি দেয় সরকার। এই প্রকল্পের সমান মালিকানা ছিল দুই দেশের। প্রকল্পে চীনের অর্থ ও প্রযুক্তি দেওয়ার চুক্তি হয়।
এ প্রকল্পে ইতোমধ্যে প্রায় ১৩০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে এই জিটুজি প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। এ প্রকল্পে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার কথা ছিল চীন সরকারের, সেটি থেমে যায়। সরকার চাইলেই এই চুক্তি বাতিলের চিঠি বাতিল করতে পারে। তাহলেই ৪ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটি চালু হয়ে যাবে।
কাপ্তাই লেকের ১,২০০ একর ভাসমান জায়গায় সৌর থেকে ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব; এটি কাপ্তাই লেকের মোট আয়তনের ১ শতাংশের কম। পায়রা বন্দরের অব্যবহৃত ১ হাজার একর থেকে ৫০০ মেগাওয়াট এবং পদ্মা সেতুর দুই পাড়ে আরও ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব। এসব প্রকল্পে গ্যাস বা এলএনজি প্রয়োজন হয় না, দিনের বেলায় উৎপাদন বাড়ালে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর চাপ কমে এবং পিক আওয়ারের জন্য গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে প্রস্তুত রাখা যায়।
গ্যাস পুনর্বণ্টন: ক্যাপটিভ থেকে কম্বাইন্ড সাইকেলে
গ্যাসের অভাবে প্রায় ৩,৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কম্বাইন্ড সাইকেল কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে, এসব কেন্দ্রের দক্ষতা ৫৫%। অথচ কম দক্ষ ক্যাপটিভ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, এসব কেন্দ্রের দক্ষতা ৩০%। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্যাপটিভ কেন্দ্রে যে পরিমাণ গ্যাস দেওয়া হয়েছে, তা কম্বাইন্ড সাইকেল কেন্দ্রে দিলে উৎপাদন প্রায় ৪০% বাড়ানো যেত।
ক্যাপটিভ কেন্দ্রগুলো বছরে সাড়ে চার লাখ টন এলএনজি সমপরিমাণ গ্যাস অপচয় করে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বা ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করে বেশি দক্ষ কেন্দ্রগুলোকে আগে গ্যাস দিতে হবে এবং কারখানাগুলোকে জাতীয় গ্রিড থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিয়ে তাদের গ্যাস কম্বাইন্ড সাইকেল কেন্দ্রে সরাতে হবে। এতে একই গ্যাসে বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে এবং ইউনিটপ্রতি ব্যয় ২ টাকার নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব।
নেপালের ৫০০ মেগাওয়াট চুক্তি ফেরত নেপালের আপার কার্নালি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনার জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চুক্তি হয়েছিল; এই বিদ্যুৎ কম দামে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে পারত। অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তিটি বাতিল করেছে; তা নবায়ন করা উচিত। গ্রীষ্মে নেপালের বিদ্যুৎ ব্যবহার ও শীতকালে বাংলাদেশের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেপালে সরবরাহ করা সম্ভব—দুই দেশের চাহিদার মৌসুম পরিপূরক। ভুটানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেও বিনিয়োগ করা জরুরি, যা আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাড়িয়ে জ্বালানি মিশ্রণ ও নিরাপত্তা শক্তিশালী করবে।
সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) চালু হোক দ্রুত
বর্তমানে বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে তেল স্থানান্তর করে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয়—যাতে ভাড়া, সময়, পরিচালন ব্যয় ও তেল চুরির ঝুঁকি বাড়ে। এসপিএম প্রকল্পের কাজ শেষ, মাদার ভেসেল থেকে সরাসরি সমুদ্রতলের পাইপলাইনে তেল মাতারবাড়ির স্টোরেজ ট্যাংকে, সেখান থেকে পাইপলাইনে রিফাইনারি ও ঢাকায় যাবে। ২০২৩ সালে পরীক্ষামূলক চালু হলেও বাণিজ্যিকভাবে এখনো চালু হয়নি। দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে চালু করলে তেল খালাসের ব্যয় কমবে, চুরির ঝুঁকি কমবে এবং সরবরাহব্যবস্থা কার্যকর হবে।
জ্বালানি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এসব পদক্ষেপ—গ্যাসের দক্ষ ব্যবহার, নেপাল-ভুটানের জলবিদ্যুৎ, এসপিএম, সৌরবিদ্যুৎ, গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান ও গ্যাস চুরি বন্ধ—সবগুলো একই কৌশলের অংশ। লক্ষ্য: কম খরচে বেশি জ্বালানি, বিদেশি নির্ভরতা কমানো, জরুরি বিকল্প রাখা এবং নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার। রূপপুরের বিদ্যুৎ গ্রিডে আনা থেকে শুরু করে প্রতিটি ঘনফুট গ্যাস ও প্রতিটি তেলের চালান পর্যন্ত প্রশ্ন হলো; বাংলাদেশ কি নিজের জ্বালানি ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারছে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে জ্বালানি সার্বভৌমত্বকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তব নীতি ও অবকাঠামোর ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
