আফজাল হোসেন
ইফতেখার, ইফতেখারুল ইসলামের কোনো ডাক নাম ছিল না। দু একজন তখন বলেছে ছিল। বাড়িতে বা পাড়ার কেউ কেউ নাকি তাকে ইকবাল বলে ডাকতো। যার নাম ইফতেখার তার ডাক নাম ইকবাল কি করে হয়!
মানুষ অভ্যাসের দাস। লম্বা নাম ধরে ডাকাডাকিতে অসুবিধা হওয়ার কথা হয় না।
যে নামে আমাকে সবাই ডাকে, লিখতে গেলে চার চারটে অক্ষর লাগে। একটু লম্বাই। নিজের নাম ধরে নিজেকে ডাকতে হয় না। অন্যরা অভিযোগ করে না, তোমার নামটা বড়। ডাকতে ডাকতে অভ্যাস হয়ে গেছে। নিজেরও নাম বড় হওয়ার দুঃখ নেই তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, একটা ছোট নাম থাকতে পারতো।
ছোটবেলায় অনেকের অদ্ভুত নাম থাকে। সেগুলো নাম বলা যায় না। বেশি আদর প্রকাশ করার জন্য অনেকে অনেক বাচ্চাকে বিশেষ নামে ডাকেন। সে নামটা আর কেউ ব্যবহার করেন না, করেন শুধু পরিবারের একজনই। যেমন আমার নানী আমাকে খুব ছোটবেলায় মজনু বলে ডাকতেন। আমি সাড়াও দিতাম।
ভাগ্যিস নানীর মৃত্যুর পর নামটারও মৃত্যু হয়েছে। আমার কোন ডাক নাম না থাকুক সেও ভালো, ঐ মজনু নামে কেউ ডাকলে বলে দিতাম, নানী যে নামে ডাকতেন, সে নামে আর কেউ ডাকতে পারবে না। আসলে কিছু নাম কোনো কোনো মানুষের মুখে মানিয়ে যায়। সে ছাড়া অন্য কেউ একই নাম ধরে ডাকলে অস্বস্তি হয়।
যাই হোক ইফতেখার, আমার বা আবদুর রহমান, আমাদের কারো স্বল্পদৈর্ঘ্যের কোনো নাম ছিল না। দিদারুল আলম নামটা বড় কিন্তু দিদার বলে ডাকা হতো। ইমদাদুল হক মিলন অনেক লম্বা নাম। ফরিদুর রেজা সাগর নামটাও বেশ বড়। ওদেরকে ডাকা হতো মিলন ও সাগর বলে। তিন অক্ষরের ডাক নামে বিশেষ অসুবিধা হয় না।
সানাউল আরেফিন, নামটা লম্বা চওড়া হলেও ডাকার জন্য দুই অক্ষরের একটা নাম ছিল তার। সানা। ডাকার জন্য সুবিধাজনক একটা নাম।
আর একজন ছিল, যে আমাদের সবার চেয়ে উচ্চতায় বড়। লম্বা মানুষটার নামটাও বেশ লম্বা, আব্দুল মুক্তাদির। নাম বড়সড় হলেও ডাকার জন্য ছোট একটা নাম থাকাতে আমরা তাকে ডাকতে বিশেষ আরাম পেতাম। আমার চেয়ে দুই আড়াই ইন্চি লম্বা একটা মানুষকে ডাকার জন্য ছিল খুবই অল্প কষ্টে ডাকা যায় এমন একটা নাম- মিনু।
আমাদের আসরের ইফতেখার এবং এই মিনু বা আব্দুল মুকতাদির এ দুজনকে এখন তাদের নামের দৈর্ঘ্য দিয়ে বিচার করা যাবে না। দুজনেই হতে পেরেছে অনেক অনেক বড় দৈর্ঘ্যের মানুষ। ভাবতে ভালো লাগে, এ দুজন বন্ধু এখন দেশের অতি খ্যাতিমান সফল বিশেষনের ব্যক্তিত্ব।
আমাদের মধ্যকার সবচেয়ে লম্বা নামের মানুষ ছিলেন আলী ইমাম। তিনি খাবার দাবারে নিয়মিত আসতেন না। অনিয়মিত আসতেন তারপরও মনে হতো, তিনি আমাদের দলেরই।
বয়সে আমাদের চেয়ে বড় কিন্তু ছিলেন বন্ধুর মতোই।.বন্ধু আর বন্ধুর মতো, এই দুই সম্পর্কের মধ্যে পার্থক্য অনেক। পার্থক্যের কারণেই হয়তো আমাদের আড্ডা ভালো লাগা সত্বেও তিনি বিরতি দিয়ে মাঝে মাঝে আসতেন। তাঁকে সমীহের চোখে দেখা হতো বলে তাঁর উপস্থিতিতে আমাদের আড্ডা লাগাম দেয়া আড্ডায় পরিণত হয়, তিনি বুঝতেন।
সকলেই যখন আগ্রহ নিয়ে লেখালেখি করছি, সে সময়টায় আলী ইমাম অনেক পরিচিত, খুবই জনপ্রিয় লেখক। তাঁর বহু লেখা আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
আলী ইমামই ছিলেন সবচেয়ে লম্বা নামের মানুষ। যাঁর নাম ভাগ করেও কেউ কোনদিন ডাকেনি। ডাকতে শুনিনি। তাঁর বড় নামটার পিছনে ভাই জুড়ে দিয়ে আমরা আরো বড় করে ডাকতাম। ডাকতাম আলী ইমাম ভাই। এতো বড় নামে ডাকতে কখনো অস্বস্তিবোধ হয়নি কারো। হলে তাঁর একটা ডাক নাম ছিল, হেলাল। অবাক লাগে কম অক্ষরের এই নামটা ধরে কেউ ডাকতে আগ্রহী হয়নি কেনো?
খাবার দাবারকে কেন্দ্র করে যে আড্ডার আসর ছিল তা আয়তনে ছিল বেশ বড়ই। আমরা যারা নিয়মিত এবং যাদের অনিয়মিত আসা যাওয়া ছিল, প্রত্যেকেই জায়গাটাকে শুধু একটা আড্ডা দেবার জায়গা মনে করেছিলাম তা নয়। খাবার দাবারে উষ্ণতা ছিল। সেখানটায় ভান ভনিতা, মিথ্যা শঠতার আশ্রয় প্রশ্রয় ছিলই না।
ছোট আয়তনের জায়গায় ঠাসাঠাসি করে বসা আরামদায়ক ছিল না কিন্তু অসুবিধা বোধ হয়নি, আমরা সুখী সন্তুষ্ট ছিলাম। সেখানটায় যারা প্রায় নিত্যই আসা যাওয়া করতাম, প্রায়ই আসে না এমন মানুষও হঠাৎ করে এসে পড়েছে সেখানে। আড্ডায় মেতেছে।এমন হলে তা বিরক্তিকর নয়, হয়ে উঠেছে আনন্দের ।
সবারই পৃথক পৃথক আড্ডা দেবার জায়গা ছিল। থাকা সত্বেও খাবার দাবার সবাইকে টান মেরে নিয়ে আসতো। নিয়ে আসার অনেক কারণ ছিল। অনেক কারণের মধ্যে বিশেষ কারণ ছিল,
সাগর, ফরিদুর রেজা সাগর। সাগর সবার একসাথে হওয়া, একত্রে বন্ধুরা চমৎকার সময় কাটাচ্ছে, এটা উপভোগ করতো।
কম পরিচিত, অধিক পরিচিত মানুষদের সাথে মানুষ সাধারণত মেপেজুকে আচরণ করে থাকে। পরিচিত, ঘনিষ্ঠ বন্ধু দুই ধরণের মানুষ, একজনকে কাছে টানা, অন্যজনের সাথে সাদামাটা কথা বলে ভেদাভেদ টিকিয়ে রাখা সাগরের স্বভাবে ছিল না। বন্ধুত্ব, এই সম্পর্কের তার বিশেষ সম্মান সমীহ ছিল সবাই খাবার দাবার জায়গাটাকে আকর্ষণীয়, আপন জায়গা ভেবে নিতে পারতো।
আমরা সবাই ছিলাম অনেক রকমের। কেউ কারো মতো নয়। অবসর পেলে হয়তো এই বৈচিত্রের টানেও আমরা ছুটে আসতাম খাবার দাবারে। সবার বয়স কম। চোখে, বুকে সবারই রঙিন স্বপ্ন। বিচিত্র স্বপ্নদের নিয়ে স্বপ্নের মালিকেরা কোথাও নোঙর ফেলে মনের দরোজা জানালা খুলে দিয়ে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে চায়। খাবার দাবার ছিল সেই নোঙর ফেলে শ্বাস নেবার জায়গা।
শ্বাস নেবার প্রিয় জায়গাটাতে একদিন সুবর্ণা এলো। সুবর্ণা মুস্তাফা তখন টেলিভিশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী। তার অভিনয় ক্ষমতা, সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্বে দর্শক মুগ্ধ ছিলেন। মুগ্ধ ছিলাম আমরাও। তার বাবা গোলাম মুস্তাফা দেশের বিখ্যাত অভিনেতা। আমাদের সেই যৌবনকালে এই অভিনেতা, মানুষটা চলন বলনে, ভাবনায় চিন্তায় খুব ব্যতিক্রমী ছিলেন।
সময়টায় বিস্মিত হওয়া, বিস্ময় উপভোগ করার মন ছিল। গোলাম মুস্তাফার অভিনয় ক্ষমতা, ভাব ভাষায় ছিল আভিজাত্য। চমৎকার কবিতা আবৃত্তি করতেন। যে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বললে তা হা করে শোনার মতো হয়ে উঠতো।
এমন মানুষের কন্যা টেলিভিশনে অভিনয় করতে এসেই দর্শকের পছন্দের মানুষ হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে সুবর্ণা তখন একশোজনের মধ্যে বিশেষের শোভা নিয়ে জ্বলজ্বল করে থাকা এক তরুণী।
একসাথে মঞ্চে, টেলিভিশনে অভিনয় করি আমরা। আমি হৈচৈ প্রিয় নই। অজস্র কোলাহলের মধ্যে শান্ত, স্বাভাবিক থাকতে পারি। ফরীদি আমার একেবারেই উল্টো। সে শান্ত স্থানে হৈ হল্লা বাঁধিয়ে দিতে পছন্দ করে। অসম্ভব কৌতুকপ্রিয় সে। আমার পছন্দ চুপচাপ থাকা, ফরীদি ঝড়ের মতো। বিপরীত মেরুর আমরা কিন্ত কেমন কেমন করে যেনো ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম।
আমাদের বন্ধু হয়ে গেলো সুবর্ণাও। যখন অবসর থাকে আমি আর ফরীদি খাবার দাবারে চলে যাই। আমাদের সেখানকার আড্ডা নিয়ে অনেক কৌতুহল তার। আড্ডার গল্প বিস্তারিত শোনায় আগ্রহ দেখে মনে হয়, একদিন হয়তো সে বলে ফেলতে পারে, আমিও তোদের সাথে খাবার দাবারে যেতে চাই।
টেলিভিশনে ছোটদের অনুষ্ঠান করে সাগর। সাগরের সাথে অনেক আগে থেকেই সুবর্ণার জানা শোনা। টেলিভিশন কেন্দ্রটা ছিল যেনো আমাদের পারিবারিক জায়গা। চমৎকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল সেখানে। সবাই সবার চেনা ছিল। প্রায় সবারই সবার সাথে ছিল ঘনিষ্ঠতা। আমাদের কারো যখন টেলিভশনে রিহার্সাল থাকতো, আমরা সময়ের আগেই পৌঁছে যেতাম। সেখানকার স্বাদের আড্ডা দেবার জন্য।
ক্ষুধা লাগলে ক্যান্টিন আছে, খেতে গিয়ে সেখানে দেখা হয়ে যেতো কারো কারো সঙ্গে। তখন আমাদের আত্মার খাদ্য আড্ডাই। আড্ডা মানে, কয়েকজন ঘন হয়ে বসা। কথা বলা, আনন্দ করা। তখন প্রিয় কোনো মানুষের সাথে সময় কাটাতে পারাও ছিল আনন্দের।
মহড়া শেষ হয়ে গেলে অনেকসময় অনেকেই বাড়ির পথ না ধরে চলে যেতাম স্টুডিওগুলোর দিকে। ঘুরে দেখার ইচ্ছা, কোথায় কি হচ্ছে। মেকাপ রুমে ঢু দিয়ে দেখতাম সেখানে নিজেদের কাছের কেউ আছে কিনা। কেউ থাকলে মিলে যেতো অল্প এক দফা আড্ডা দেবার সুযোগ।
টেলিভিশনে ঢুকতে বের হতে যে বড় লবিটা পড়ে, একদিন সেখানে দেখি সাগর নতুন কুঁড়ির অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলছে। বের হওয়ার মুখে সাগরকে দেখে দাঁড়াই। জিজ্ঞাসা করবো, বের হবে কি না। জিজ্ঞাসা করতে হলো না। ঘুরে আমাকে দেখে ইশারায় প্রশ্ন করে বের হচ্ছি কি না?
দেখতে পাই সামনের দরোজা দিয়ে ঢুকছে সূবর্ণা। সাগরের কথা শেষ হয়েছে। সে এগিয়ে ইশারা করে, চলো। সামনে চলে এসেছে সুবর্ণা। আমাদের দেখে সে বুঝতে পারে, আমরা যাচ্ছি কোথায়। তার হাতে বই আর নাটকের স্ক্রীপ্ট। যাচ্ছে নতুন কোনো নাটকের রিহার্সালে।
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাত মেলায় আমাদের সঙ্গে। প্রশ্ন করে, খাবার দাবারে? আমরা একসাথে মাথা নাড়ি। বলে, যেতে চাই একদিন।
সাগর হাসে, একদিন না অজস্রদিন আসতে পারো।
